
প্রতীকী ছবি
বিবাহ একটি পবিত্র বন্ধন যা আল্লাহ্ তায়ালার পক্ষ হতে মানবজাতির জন্য একটি রহমত স্বরূপ। সেই আদিকাল হতেই বিবাহ আল্লাহর বিধান নাজিলের মাধ্যমে বিবর্তিত হতে হতে আল্লাহর রাসূল (সাঃ) এর দ্বারা ইসলাম এর মাধ্যমে আজকের এই রূপে এসেছে। এখানে একজন মুসলিম নর-নারী একে অপরের সাথে পবিত্রতার বন্ধনে আবদ্ধ হয়। কুরআন এবং হাদিসের মতে চরিত্র রক্ষার জন্য বিয়ে একটি এমন বন্ধন যার দ্বারা স্বামী-স্ত্রী একে অপরের জন্য ঢাল হিসেবে কাজ করে। এর যথার্থতা পাওয়া যায় বিয়ের আরবি জাওয়াজ (زواج) এর প্রতিশব্দ হিসন(حصن) এ,যেখানে হিসন এর অর্থ হচ্ছে দুর্গ, অর্থাৎ বিয়ের বন্ধন একটি দম্পত্তি এর জন্য চরিত্র রক্ষার ক্ষেত্রে দুর্গ এর মতো কাজ করে যেখানে সব কিছু রক্ষিত থাকে।
ইসলাম পূর্ববর্তী যুগে প্রাচীন আরব এবং সমগ্র মধ্যপ্রাচ্যে মুতাহ্ বিবাহ নামে একটি বিবাহের প্রচলন ছিলো। ইসলাম এর আত্মপ্রকাশ এর পরে এটি রহিত করা হয় এবং নিষেধাজ্ঞা জারি করা হয় মহানবি রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর আদেশে। ইসলামের দ্বিতীয় খলিফা ওমর রাদিয়াল্লাহু আনহুম ও এই বিবাহকে শক্ত হাতে দমন করেছেন। ইসলামের বিধানে হারাম এই বিবাহ এখন শুধুমাত্র শিয়াদের ইতনা আশআ'রি মাযহাবের অনুসারীগন দ্বারা ই বৈধ বলে স্বীকৃত।
উৎপত্তি এবং ইতিহাস
মূলত মুতাহ্ বলতে আক্ষরিক অর্থে বোঝায় উপভোগ করা অর্থাৎ বলা যায় যে এই ধরনের বিবাহটি করাই হতো উপভোগ এর উদ্দেশ্যে। মূলত প্রাক ইসলামী যুগের আরবে যুদ্ধ বা ব্যবসাকে কেন্দ্র করে এই বিয়েগুলো করা হতো। তখনকার সময়ে এই বিয়ে গুলো আরবরা প্রায়ই করতো যখন যুদ্ধ বা ব্যবসার কাজে যেত, সেই সময়ের সমাজে এটি বৈধই ছিলো যা পরবর্তীতে ইসলামের আত্মপ্রকাশ এর পরে নিষিদ্ধ হয়।
কীভাবে এটি শরিয়তসম্মত বিয়ে হতে আলাদা
উপভোগের উদ্দেশ্যে এই বিয়ে করা হয় বিধায় এর গঠন ও শরিয়তসম্মত বিয়ে হতে অনেকটা ই ভিন্ন।
শরীয়তসম্মত বিয়ের উদ্দেশ্য থাকে চরিত্র হেফাজত এবং হালাল উপায়ে বংশবিস্তারের মাধ্যমে একটি সুখী পরিবার গঠন করা যা মৃত্যু পর্যন্ত স্থায়ী হয়, কিন্ত মুতাহ্ বিবাহে সাধারণত উদ্দেশ্যে থাকে যুদ্ধকালীন বা ব্যবসাকালীন সময়ে উপভোগের জন্য একটি সঙ্গিনীর সাহচর্য পাওয়া যার দ্বারা শুধু ওই সময়টুকু ই বিয়ে টা স্থায়ী হয়। তাই এখানে মূলত পরিবার গঠিত হয় অস্থায়ী ভাবে।
মুতাহ্ বিবাহে বর এবং কনে উভয় ই চুক্তিবদ্ধ হয় যে বিবাহ টি একটি নির্দিষ্ট সময় পর্যন্ত স্থায়ী করতে। বিশেষত ব্যবসা বা সামরিক উদ্দেশ্য যতটুকু সময় অবস্থান করা হয় ততক্ষণ পর্যন্ত বিয়ে টির জন্য উভয় ই চুক্তিবদ্ধ হয়। যে মুহূর্তে চুক্তির সময় বা মেয়াদ শেষ হয়ে যা সেই মূহুর্ত হতে ই বিয়ে টা বাতিল হয়ে যায় কোন ধরনের তালাক ছাড়া।
এখানে আরো আমলে নেওয়া জরুরি যে মুতাহ্ বিবাহের সাথে শরীয়ত সম্মত বিয়ের একটি গুরুতর পার্থক্য আছে সেটা হলো শরীয়ত সম্মত বিয়ে করলে সেটা জনসম্মুখে প্রকাশ করে বিয়ে করতে হয় আত্মপ্রকাশ ছাড়া বিয়ে , কিন্ত মুতাহ্ বিবাহ তে সেটা করার বাধ্যবাধকতা নেই। যার কারণে মুতাহ্ বিয়েকে পতিতাবৃত্তি এর বৈধতা হিসেবে বিবেচনা করা হয়। যার ফলে রাসুলুল্লাহ মুহাম্মদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এই বিয়েটিকে হারাম ঘোষণা করেছেন কিয়ামত পর্যন্ত।
মুতাহ্ বিবাহ কার্যকরী করার প্রক্রিয়া
মুতাহ্ বিবাহ বন্ধনে আবদ্ধ হওয়ার প্রক্রিয়া শরীয়ত সম্মত বিয়ের মত ই এখানে প্রস্তাব দেওয়া হয় প্রস্তাব এ রাজি হওয়া ও হয়, তবে ভিন্নতা টা এখানে অন্য জায়গাতে। একজন শিয়া ইতনা আশআ'রী মাযহাবের অনুসারী পুরুষ যেকোনো ধর্মের নারী এর সাথে মুতাহ্ বিবাহ বন্ধনে আবদ্ধ হতে পারেন এবং যত ইচ্ছা তত বিবাহ করতে পারবেন একই সাথে। তবে একজন শিয়া নারী যিনি অবশ্যই একজন ইতনা আশআ'রী মাযহাব এর অনুসারী তিনি শিয়াদের ইতনা আশআ'রী এর অনুসারী পুরুষ (তাদের মতে মুসলিম) ব্যতীত অন্য কোন পুরুষকে বিয়ে করতে পারবেন না এবং একটির বেশী বিবাহ একই সাথে করতে পারবেন না। মুতাহ্ বিবাহ বন্ধনে আবদ্ধ হতে ইচ্ছুক দম্পত্তিদের বিবাহকালে কোন সাক্ষীর প্রয়োজন হয় না। এই বিয়েতে সাক্ষ্য ছাড়া ই আবদ্ধ হওয়া যায়।
মোহর,সম্পত্তি এবং উত্তরাধিকার
মুতাহ বিবাহতে সাধারণত হয় মোহর এর বিনিময়েই। যদি স্বামী স্ত্রী এর একত্রে বসবাস হয় তবে মোহর দেওয়া বাধ্যতামূলক, যদি না হয়ে থাকে তাহলে অর্ধেক দিতে হবে। এই বিবাহ বন্ধনে আবদ্ধ স্বামী-স্ত্রী এর ঔরশে যদি কোন সন্তান জন্ম নেয় তবে সে বৈধ সন্তান হিসেবে গণ্য হবে। সেই সন্তান তার পিতার সম্পত্তির অংশ এর উত্তরাধিকার হতে পারবে। প্রশ্ন উত্থাপিত হতে পারে যে মুতাহ্ বিবাহের সন্তান বৈধ হয় কী উপায়ে যেখানে বিবাহ টি ই হারাম, এখানে একটি বিষয় বিবেচনা করা উচিত তা হলো যে পিতা-মাতার অবৈধ সম্পর্কের শাস্তি সেটা হোক হুদুদ (দৃষ্টান্তমূলক নির্ধারিত শাস্তি) বা তাজির (ভীতি প্রদর্শনের জন্য উপযুক্ত নবসৃষ্ট শাস্তি) কেন সেটার দায়ভার সন্তান বহন করবে?
পিতা মাতার কৃতকর্ম সন্তানদের উপর অবৈধ হওয়ার শাস্তি হিসেবে আবির্ভূত হলে দেখা যাবে যে সন্তান তার পিতার হতে প্রাপ্য সম্পত্তির অধিকার হতে বঞ্চিত হবে
যেখানে তার কোন প্রকারের দোষ ই নেই। অর্থাৎ সন্তান এর যেহেতু এখানে কোন হাত ই নেই তাকে তার প্রাপ্য সম্পত্তির অধিকার নিশ্চিত করতে এখানে সন্তানের বৈধতা দেওয়া হয়েছে।
আরো উল্লেখ্য বিষয় হচ্ছে যে স্ত্রী তার স্বামীর কোন ধরনের সম্পত্তির অংশ পাবে না, ভরনপোষনের খরচ বাবদ কোন কিছু দাবি ও করতে পারবে না।
তবে শরীয়তসম্মত বিবাহ-বিচ্ছেদ এখানে হয় না, এই ক্ষেত্রে চুক্তির মেয়াদ শেষ হলে ই বিয়ে বাতিল বা শেষ হয়ে যায় অথবা দম্পতির কেউ মারা গেলে ও বিয়ে শেষ হয়ে যায়। চুক্তির মেয়াদের আগে যদি স্বামী বিবাহ হতে আগে ই সরে দাঁড়াতে চান চুক্তির মেয়াদ শেষ হওয়ার আগে ই তবে তাকে তার স্ত্রীকে কিছু উপঢৌকন প্রদান করতে হবে। এই প্রক্রিয়া কে বলা হয় হেবা-এ-মুদ্দাত। মুতাহ্ বিয়ে শেষ হয়ে যাবার পরে নারীদের দুই মাসের ঈদ্দত পালন করতে হয়।
কীভাবে মুতাহ্ বিবাহ শরীয়ত এর বিরোধী?
মূলত ইসলামের আত্মপ্রকাশ এর প্রথম দিকে এই বিয়ে বৈধ থাকলে ও একটা সময় আল্লাহর রাসুল(সাঃ) এই বিয়েকে এক সময় নিষিদ্ধ ঘোষণা করেন কিয়ামত পর্যন্ত।
যা সহীহ মুসলিম এর ৩২৮৭ নং হাদীসে স্পষ্টভাবে উঠে এসেছে:
"রাসূল(সাঃ)বলেন, কারো নিকট মোত'আহ্ বিবাহের সূত্রে কোনো স্ত্রী থাকলে, সে যেন তাঁকে পরিত্যাগ করে।"
আরো এসেছে,
সহিহ মুসলিম, হাদিস নং ৩৩২০ এ যেখানে উল্লেখ আছে:
"ইবনু আবূ আমর রা. বলেন, ইসলামের প্রাথমিক যুগে নিরুপায় অবস্থায় তার (মুতা বিয়ের) অনুমতি ছিল। (যেমন নিরুপায় অবস্থায়) মৃত জীব, রক্ত ও শূকরের (গোশ্ত ভক্ষণের) ন্যায়। অতঃপর আল্লাহ তার দীনকে শক্তিশালী ও সুদৃঢ় করলেন এবং তা নিষিদ্ধ করলেন। ইবনু শিহাব রহ. বলেন, রাবী’ ইবনু সাবরাহ আল জুহানী আমাকে জানিয়েছেন যে, তাঁর পিতা বলেছেন, নবি করিম সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম এর যুগে আমি দুটি লাল চাদরের বিনিময়ে আমির গোত্রের একটি স্ত্রীলোকের সাথে মুতা করেছিলাম। অতঃপর রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম আমাদের মুতা করতে নিষেধ করেন। "
জামে তিরমিজি, হাদিস নং ১১২১ এ এসেছে:
"আলী ইবনু আবূ তালিব রা. থেকে বর্ণিত, খাইবারের যুদ্ধের দিন নারীদের সাথে মুতা বিয়ে করতে ও গৃহপালিত গাধার গোশত খেতে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম নিষিদ্ধ ঘোষণা করেছেন।"
সহিহ মুসলিম, হাদিস নং ৩৩২১ এ এসেছে:
"রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম মুতা বিয়ে নিষিদ্ধ করেছেন ও বলেছেন, সাবধান! আজকের এ দিন থেকে কিয়ামাত পর্যন্ত মুতা বিয়ে হারাম। যে কেউ (ইতোপূর্বে) মুতা বাবদ যা কিছু দিয়েছে, সে যেন তা ফেরত না দেন।"
উক্ত সহিহ হাদীস সমূহ দ্বারা পুরো বিষয়টা একদম পরিস্কার যে মুতাহ্ বিবাহ কোনভাবে ই শরীয়ত সম্মত না। আরো একটি বিষয় হলো খুলাফায়ে রাশেদুন এর যুগে উমর রাদিআল্লাহু আনহুম খলিফা থাকাকালীন এই বিয়েকে কঠোর হস্তে দমন করেছিলেন। অর্থাৎ সাহাবীদের মতে ও এই বিয়েটি বৈধ ছিলো না।
তথ্যসুত্র: A Text Book on Muslim Personal Law by M. Jashim Ali Chowdhury(6th edition,August 2024,SUFI PROKASHONI),Wikipedia,সহীহ মুসলিম,সহীহ জামে-আত-তিরমিজি।
লেখক: শিক্ষার্থী, আইন বিভাগ, ইস্ট-ওয়েস্ট বিশ্ববিদ্যালয়, ঢাকা।
স্বদেশ প্রতিদিন/এনআর