বৃহস্পতিবার ২৪ সেপ্টেম্বর ২০২৬
   
শিরোনাম:
দেশকে অস্থিতিশীল করার সুযোগ দেয়া হবে না       নৈরাজ্য ও ষড়যন্ত্রের বিরুদ্ধে মোংলায় বিএনপির বিক্ষোভ       আওয়ামী লী‌গের তিন নেতা গ্রেপ্তার      সাতক্ষীরায় জলবায়ু ন্যায়বিচার প্রকল্পের সমাপনী      সন্ত্রাসের মাধ্যমে দেশকে অস্থিতিশীল করার প্রতিবাদে বিক্ষোভ       আইনশৃঙ্খলা সভায় হট্টগোল, তর্কে জড়ালেন এমপি হান্নান      লাতিন আমেরিকার দুই দলকে হারাল জাপান-কোরিয়া      কিশোর গ্যাংয়ের সঙ্গে সম্পৃক্ততার সন্দেহে ৫১ কিশোর আটক      প্রথম ১৪ ওয়ানডেতেই ইতিহাস গড়লেন ম্যাথু ব্রিটজকে      ২৫ সেপ্টেম্বরের মুর্তজা কিজিলবাশের কনসার্ট স্থগিত      অঙ্কন-নন্দিতার দ্বৈত কণ্ঠে আজ প্রকাশিত হচ্ছে ‘মথুরা’      ফোটন সার্ভিস সেন্টারের উদ্বোধন      
বাকৃবি উদ্ভাবিত দেশের প্রথম পরিবেশবান্ধব ছত্রাকনাশক
বাকৃবি প্রতিনিধি
প্রকাশ: শনিবার, ২ আগস্ট, ২০২৫, ২:৪৫ পিএম আপডেট: ০২.০৮.২০২৫ ২:৫২ PM

বাংলাদেশে খাদ্য উৎপাদন বাড়লেও বালাইনাশকের অনিয়ন্ত্রিত ব্যবহারে স্বাস্থ্য ও পরিবেশের ওপর বিরূপ প্রভাব পড়েছে। এসব বিষাক্ত বালাইনাশক মানবদেহ, মাটি, পানি ও পরিবেশের মারাত্মক ক্ষতি করছে। দেশে ব্যবহৃত বালাইনাশকের মধ্যে ছত্রাকনাশকের ব্যবহার সর্বাধিক- প্রায় ৪৫ থেকে ৪৬ শতাংশ, এরপর কীটনাশক ৩৩ শতাংশ এবং আগাছানাশক ২০ থেকে ২১ শতাংশ। এদের বেশিরভাগই ছড়িয়ে পড়ে মাটি, পানি ও বাতাসে।

এই সমস্যা সমাধানে বাংলাদেশ কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ের (বাকৃবি) গবেষকদল দেশের প্রথম পরিবেশবান্ধব এবং স্থানীয়ভাবে উৎপাদিত ছত্রাকনাশক উদ্ভাবনের দাবি করেছেন। এটি মাটিতে যেমন প্রয়োগযোগ্য, তেমনি পানিতেও ব্যবহার করা নিরাপদ।

বাকৃবির উদ্ভিদ রোগতত্ত্ব বিভাগের অধ্যাপক ড. মোহাম্মদ শাহজাহান মঞ্জিলের নেতৃত্বে গবেষকদলটি ট্রাইকোডার্মা এস্পেরেলাম নামক ছত্রাক দিয়ে পি.জি. ট্রাইকোডার্মা নামের জৈব ছত্রাকনাশক তৈরি করেছেন। এই গবেষণায় অধ্যাপক মঞ্জিল ছত্রাকটি আইসোলেট এবং বায়োফর্মুলেশন উন্নয়ন করেন।

গবেষক দলের সদস্য অধ্যাপক ড. কে. এম. মহিউদ্দিন এর গুণগত মান ও কার্যকারিতা বৃদ্ধি করেন এবং অধ্যাপক ড. মো. আলী আশরাফ এর উৎপাদন ও পরিবেশগত মূল্যায়ন পরিচালনা করেন।

গবেষণাটি বাকৃবির মাইক্রোবায়োলজি ও বায়োকন্ট্রোল ল্যাব-এ ২০০১ সাল থেকে ধারাবাহিকভাবে পরিচালিত হচ্ছে। বিভিন্ন সরকারি ও আন্তর্জাতিক সংস্থা যেমন বিশ্ববিদ্যালয় মঞ্জুরি কমিশন, শিক্ষা মন্ত্রণালয় এবং তথ্য ও যোগাযোগ প্রযুক্তি মন্ত্রণালয়ের সহযোগিতায় গবেষণার তহবিল সরবরাহ করা হয়েছে। সম্প্রতি বিশ্ব ব্যাংক ও বাংলাদেশ কম্পিউটার কাউন্সিল গবেষণা সম্প্রসারণে আর্থিক সহায়তা দেয়।


এই ছত্রাকনাশক শুধুমাত্র রোগ দমন করে না, বরং জৈব সার হিসেবেও কাজ করে। এটি উদ্ভিদ বৃদ্ধিতে সহায়ক এনজাইম, উদ্বায়ী যৌগ ও সেকেন্ডারি মেটাবোলাইট উৎপাদন করে, যা উদ্ভিদের রোগ প্রতিরোধশক্তি বাড়ায়, শিকড়ে পুষ্টি গ্রহণ উন্নত করে এবং তাপ, লবণাক্ততা ও অম্লতা সহ্য করতে সহায়তা করে।

দেশীয় উৎস থেকে সংগৃহীত অণুজীবের মাধ্যমে উদ্ভাবিত হওয়ায় এটি আমদানিকৃত ছত্রাকনাশকের চেয়ে বেশি কার্যকর ও পরিবেশবান্ধব। উল্লেখযোগ্য বিষয় হলো, এই ছত্রাকটির জিন সিকোয়েন্সিং সফলভাবে সম্পন্ন করে NCBI Gene Bank-এ সংরক্ষিত হয়েছে।

পি.জি. ট্রাইকোডার্মা ব্যবহারে ফসল উৎপাদন বৃদ্ধি সম্পর্কে অধ্যাপক শাহজাহান মঞ্জিল বলেন, ‘ছত্রাকনাশকটির প্রয়োগে আমরা ছত্রাকজনিত রোগ প্রতিরোধের পাশাপাশি বিভিন্ন ফসলের উল্লেখযোগ্য ফলন বৃদ্ধি লক্ষ্য করেছি। টমেটো, আলু ও বেগুনে ফলন বৃদ্ধি পেয়েছে প্রায় ২০-২৫ শতাংশ, পালং ও পুঁইশাকে ফলন বেড়েছে ৪০-৫০শতাংশ, পানে ফলন বেড়েছে প্রায় ৪৫-৫০ শতাংশ, চা গাছে ফলন বৃদ্ধি পেয়েছে ৮০-১০০ শতাংশ, ঢেঁড়স, মরিচ ও শসায় ফলন বেড়েছে ১৫-২০ শতাংশ। ডাল, ধান ও ফলগাছে রোগ দমন ও গাছের স্বাস্থ্য ভালো থাকায় ফলন স্থিতিশীল বা ধীরে ধীরে বৃদ্ধির ধারা দেখা যাচ্ছে। অধ্যাপক মঞ্জিল আরও বলেন, পি.জি.ট্রাইকোডার্মা গোড়াপচা, কান্ডপচা, পাতাপচা ও ব্লাইট দমনে কার্যকর, শিকড়ের বৃদ্ধি ও পুষ্টি গ্রহণ বাড়িয়ে ফসলের উৎপাদন ২০ থেকে ৫০ শতাংশ পর্যন্ত বাড়ায়। এটি ছাদ কৃষি ও মৎস্য চাষেও উপযোগী যা কৃষকের আয় বৃদ্ধিতে সহায়ক।’

এছাড়া রাসায়নিক সারের ব্যবহার ২০ থেকে ২৫% হ্রাস পেয়েছে। এটি ফসফেট দ্রবণযোগ্যতা বাড়ায়, নাইট্রোজেন ব্যবহারে দক্ষতা আনে এবং ভারী ধাতু দূষণযুক্ত মাটিতেও নিরাপদ ফসল উৎপাদনে কার্যকর।

এই ছত্রাকনাশক জলজ প্রাণীর জন্যও নিরাপদ। এর প্রয়োগে মাছ, ব্যাঙ, শামুক প্রভৃতির উপর কোনো বিরূপ প্রতিক্রিয়া দেখা যায়নি। তেলাপিয়া মাছের ওপর পরীক্ষায় এটি ফিড সাপ্লিমেন্ট হিসেবেও কার্যকর প্রমাণিত হয়েছে- ফলাফল: মাছের বৃদ্ধি, পানির গুণগত মান উন্নয়ন ও প্যাথোজেন হ্রাস।

মৌলভীবাজারের ফুলতলা টি এস্টেটের এসিস্ট্যান্ট ম্যানেজার শিহাব উদ্দিন চৌধুরী বলেন, ‘আমি আমার চা বাগানে পিজি ট্রাইকোডার্মা ব্যবহার করে পূর্বের চেয়ে দ্বিগুণেরও বেশি ফলন পেয়েছি। আগে যেসব রাসায়নিক ছত্রাকনাশক ও মাইক্রোনিউট্রিয়েন্ট ব্যবহার করতাম সেগুলোর ব্যবহার অনেকটাই কমিয়ে দিয়েছি। ট্রাইকোডার্মা একদিকে যেমন ছত্রাকনাশক হিসেবে কাজ করে, অন্যদিকে গাছের শুটিং বিহেভিয়ারও (নতুন কুঁড়ি আসার প্রবণতা) বাড়িয়ে দেয়। আমি সাধারণত প্রতি লিটারে ৩ গ্রাম ব্যবহার করি, তবে ৫ গ্রাম দিলে ফল আরও ভালো হয়। এছাড়া এটি তুলনামূলকভাবে সস্তা।’

নরসিংদীর পান চাষি কৃষিবিদ শফিকুল ইসলাম বলেন, ‘পান চাষে গোড়া পচা মারাত্মক একটি রোগ। এর আক্রমণে গাছ মারা যায়। এই সমস্যা সমাধানে বিভিন্ন রাসায়নিক বালাইনাশক ব্যবহার করতাম। তবে এই ছত্রাকনাশক ব্যবহারের পরে গাছ আর ওই রোগে মারা যায় নি বিধায় ব্যাপক লাভবান হয়েছি। প্রায় অর্ধেক খরচ সাশ্রয় করে ফলন অনেক বেড়েছে।’

ময়মনসিংহ বিভাগীয় কৃষি অফিসের অতিরিক্ত পরিচালক ড. সালমা লাইজু বলেন, ‘পরিবেশবান্ধব ছত্রাকনাশক উদ্ভাবিত হলে তা মানুষের স্বাস্থ্য, পরিবেশ, গবাদিপশু সকলকিছুর জন্যই উপকারী হবে। এটি দেশের জন্য বিশাল এক সম্ভাবনা হতে পারে। যদি অধ্যাপক ড. মোহাম্মদ শাহজাহান মঞ্জিলের উদ্ভাবিত ছত্রাকনাশকটি সাশ্রয়ীমূল্যে পাওয়া গেলে আমাদের কৃষি অফিস থেকে সেটি কিনে সাধারণ কৃষকদের সাহায্য করতে পারবো।’

স্বদেশ প্রতিদিন/এমএম

আরও সংবাদ   বিষয়:  কৃষি   পরিবেশবান্ধব ছত্রাকনাশক  






Loading...
Loading...
এই ক্যাটেগরির আরো সংবাদ  
অনুসরণ করুন
     
সম্পাদক ও প্রকাশক : মোঃ মজিবুর রহমান চৌধুরী
স্বদেশ গ্লোবাল মিডিয়া লিমিটেড -এর পক্ষে প্রকাশক কর্তৃক সিটি পাবলিশিং লি, আর কে মিশন রোড, ঢাকা-১২০৩ থেকে মুদ্রিত ও ১০, তাহের টাওয়ার, গুলশান সার্কেল-২ থেকে প্রকাশিত।
ফোন: ৯৮৫১৬২০, ৮৮৩২৬৪-৬, ফ্যাক্স: ৮৮০-২-৯৮৯৩২৯৫। ই-মেইল : [email protected], [email protected]
🔝
close
অনুসরণ করুন
     
সম্পাদক ও প্রকাশক : মোঃ মজিবুর রহমান চৌধুরী
স্বদেশ গ্লোবাল মিডিয়া লিমিটেড -এর পক্ষে প্রকাশক কর্তৃক সিটি পাবলিশিং লি, আর কে মিশন রোড, ঢাকা-১২০৩ থেকে মুদ্রিত ও ১০, তাহের টাওয়ার, গুলশান সার্কেল-২ থেকে প্রকাশিত।
ফোন: ৯৮৫১৬২০, ৮৮৩২৬৪-৬, ফ্যাক্স: ৮৮০-২-৯৮৯৩২৯৫। ই-মেইল : [email protected], [email protected]
🔝
close