
আন্তর্জাতিক খ্যাতিসম্পন্ন বিজ্ঞানী, সমাজসংস্কারক ও মানবদরদি আচার্য প্রফুল্ল চন্দ্র রায়, যিনি পিসি রায় নামে সমধিক পরিচিত, আজ তাঁর ১৬৪তম জন্মদিন। ১৮৬১ সালের ২ আগস্ট খুলনার পাইকগাছা উপজেলার রাড়ুলী গ্রামে কপোতাক্ষ নদীর তীরে সম্ভ্রান্ত এক হিন্দু পরিবারে জন্মগ্রহণ করেন তিনি। পিতা ছিলেন জমিদার হরিশ্চন্দ্র রায় এবং মাতা ভূবন মোহিনী দেবী।
পিসি রায়ের স্মৃতিকে ধরে রাখতে প্রতিবছর খুলনা জেলা প্রশাসনের উদ্যোগে ও পাইকগাছা উপজেলা প্রশাসন এবং রাড়ুলী ইউনিয়ন পরিষদের ব্যবস্থাপনায় জন্মবার্ষিকী পালিত হবে। এ উপলক্ষে বিজ্ঞানীর জীবন ও কর্ম নিয়ে তথ্যচিত্র প্রদর্শনী, আলোচনা সভা, রচনা ও কুইজ প্রতিযোগিতাসহ বিভিন্ন কর্মসূচি অনুষ্ঠিত হবে। অনুষ্ঠানটি সভাপতিত্ব করবেন পাইকগাছা উপজেলা নির্বাহী অফিসার মাহেরা নাজনীন। প্রধান অতিথি হিসেবে উপস্থিত থাকবেন প্রত্নতত্ত্ব অধিদপ্তর খুলনা বিভাগের আঞ্চলিক পরিচালক লাভলী ইয়াসমীন, বিশেষ অতিথি অতিরিক্ত জেলা প্রশাসক (রাজস্ব) মো. আকতার হোসেন।
প্রফুল্ল চন্দ্র রায়ের শিক্ষাজীবন শুরু হয় মাত্র পাঁচ বছর বয়সে। নিজ গ্রামের প্রাথমিক বিদ্যালয় থেকে শুরু করে হেয়ার স্কুল, অ্যালবার্ট স্কুল হয়ে তিনি কলকাতার প্রেসিডেন্সি কলেজে গণিতে অনার্সসহ স্নাতক শেষ করেন। ১৮৮২ সালে গিলক্রাইস্ট বৃত্তি নিয়ে যান স্কটল্যান্ডের এডিনবার্গ বিশ্ববিদ্যালয়ে, যেখানে থেকে তিনি বিএসসি, পরে পিএইচডি, ডিএসসি ডিগ্রি অর্জন করেন।
রসায়ন বিজ্ঞানে তিনি একটি মৌলিক যৌগ মারকিউরাস নাইট্রাইট উদ্ভাবন করে বৈজ্ঞানিক জগতে আলোড়ন সৃষ্টি করেন। এই আবিষ্কারের কারণে তিনি আন্তর্জাতিকভাবে স্বীকৃতি পান। তিনি দীর্ঘ ২০ বছর প্রেসিডেন্সি কলেজে রসায়ন বিভাগের সহকারী অধ্যাপক হিসেবে কর্মরত ছিলেন।
পিসি রায় শুধু একজন বিজ্ঞানীই ছিলেন না, ছিলেন উদ্যোক্তা, দার্শনিক ও সমাজসংস্কারকও। ১৮৯২ সালে কলকাতার মানিকতলায় মাত্র ৮০০ টাকা পুঁজি নিয়ে প্রতিষ্ঠা করেন বেঙ্গল কেমিক্যাল অ্যান্ড ফার্মাসিউটিক্যাল ওয়ার্কস, যা উপমহাদেশের প্রথম ওষুধ উৎপাদনকারী প্রতিষ্ঠান।
খুলনা, সাতক্ষীরা ও বাগেরহাট জেলায় তিনি একাধিক শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান, কাপড়ের মিল এবং সমবায় ব্যাংক প্রতিষ্ঠা করেন। ১৯০৯ সালে নিজ গ্রামে কো-অপারেটিভ ব্যাংক, ১৯০৩ সালে পিতার নামে আরকে হরিশ্চন্দ্র স্কুল এবং এর আগে ১৮৫০ সালে তাঁর পিতার হাতে প্রতিষ্ঠিত ভূবন মোহিনী বালিকা বিদ্যালয় ছিল নারী শিক্ষার প্রবর্তক উদাহরণ।
১৯১৬ সালে কলকাতায় মহাত্মা গান্ধীর প্রথম জনসভার আয়োজন করেন পিসি রায়। ১৯৩১ সালে খুলনার নিউ মার্কেটের পাশে প্রতিষ্ঠা করেন এপিসি কটন মিল, যা এখন খুলনা টেক্সটাইল পল্লী নামে পরিচিত। তিনি বাগেরহাটে পিসি কলেজ প্রতিষ্ঠা করেন, যা এখনো শিক্ষা বিস্তারে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখছে।
পিসি রায়ের কর্ম ও অবদানের স্বীকৃতিস্বরূপ ভারতবর্ষের বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয় তাঁকে সম্মানসূচক ডক্টরেট ডিগ্রি প্রদান করে। তিনি ১৯১১ সালে সিআইই উপাধি ও পরবর্তীতে ফাদার অব নাইট্রাইট খেতাব লাভ করেন। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়সহ মহীশূর ও বেনারস বিশ্ববিদ্যালয়ও তাঁকে সম্মানসূচক ডিগ্রি দেয়।
১৯৪৪ সালের ১৬ জুন মৃত্যুর আগ পর্যন্ত তিনি সম্পূর্ণ নির্মোহভাবে মানবকল্যাণে কাজ করে গেছেন এবং নিজের অর্জিত সম্পদ সমাজের কল্যাণে উৎসর্গ করেছেন। ব্যক্তিজীবনে অবিবাহিত পিসি রায় ছিলেন নিঃস্বার্থ কর্মী ও বিদ্যাব্রতী।
আজও পাইকগাছায় তাঁর স্মৃতিবিজড়িত বসতভিটা ও প্রতিষ্ঠিত প্রতিষ্ঠানগুলো যথাযথ সংরক্ষণে অবহেলার শিকার। স্যার পিসি রায় স্মৃতি সংসদ এবং এলাকাবাসীর দাবি—রাড়ুলীতে তাঁর স্মরণে পর্যটন কেন্দ্র, পিসি রায় বিশ্ববিদ্যালয়, অর্থনৈতিক অঞ্চল এবং পিসি রায় সেতু প্রতিষ্ঠা ও নামকরণ করা হোক।
স্বদেশ প্রতিদিন/ আরএফ