
চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ে (চবি) সর্বশেষ কেন্দ্রীয় ছাত্রসংসদ (চাকসু) নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়েছিল ১৯৯০ সালের ৮ ফেব্রুয়ারি। এরপর দীর্ঘ ৩৫ বছর কেটে গেলেও আর কোনো নির্বাচন দেখেনি বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীরা। এই দীর্ঘ সময়ে দেশে ৮টি জাতীয় নির্বাচন সম্পন্ন হলেও এবং চবিতে পালাবদল হয়েছে ১২ জন উপাচার্যের, তবুও স্থবিরই রয়ে গেছে শিক্ষার্থীদের গণতান্ত্রিক অধিকার প্রতিষ্ঠার অন্যতম প্ল্যাটফর্মটি।
২০২৪ সালের জুলাইয়ের গণঅভ্যুত্থান-পরবর্তী প্রেক্ষাপটে বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়ে যখন কেন্দ্রীয় ছাত্র সংসদের নির্বাচন নিয়ে অগ্রগতি শুরু হয়, তখনই চবি শিক্ষার্থীরাও চাকসু পুনরায় চালুর দাবি তোলে। তাদের দাবির প্রেক্ষিতে দেশের অন্য বিশ্ববিদ্যালয়গুলো—ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় (ডাকসু), জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয় (জাকসু) ও রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয় (রাকসু)—তফসিল ঘোষণা করে। তবে চবি এখনও পিছিয়ে, যদিও দাবির সূচনা এখান থেকেই হয়েছিল।
চবি প্রশাসনের সূত্র অনুযায়ী, ১৯৬৬ সালে প্রতিষ্ঠার পর থেকে এখন পর্যন্ত মাত্র ৬ বার চাকসু নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়েছে। প্রথমবার হয় প্রতিষ্ঠার শুরুর দিকে, এরপর ১৯৭০ থেকে ১৯৭৩ সাল পর্যন্ত টানা তিনবার, এরপর ১৯৮০ ও ১৯৮১ সালে দুইবার এবং সর্বশেষ ১৯৯০ সালে। সেই নির্বাচনের প্রায় এক বছর পর ছাত্রনেতা ফারুকুজ্জামান হত্যার ঘটনায় চাকসু কার্যক্রম বন্ধ করে দেয় প্রশাসন। এরপর থেকে দীর্ঘদিন অকেজো অবস্থায় পড়ে রয়েছে এই প্রতিষ্ঠানটি, যা একসময় ছিল সাহিত্য, সংস্কৃতি ও খেলাধুলার প্রাণকেন্দ্র।
২০২৪ সালের ডিসেম্বরে একটি ছয় সদস্যবিশিষ্ট চাকসু নীতিমালা প্রণয়ন কমিটি গঠন করে বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ। এরপর বিভিন্ন ছাত্র সংগঠন দাবি ও সুপারিশ পেশ করে এবং প্রশাসনের সঙ্গে একাধিকবার মতবিনিময় করে। তবুও নীতিমালা চূড়ান্ত না হওয়ায় নির্বাচন অনিশ্চয়তায় রয়েছে।
এ বিষয়ে বিভিন্ন ছাত্রসংগঠনের নেতারা ক্ষোভ প্রকাশ করেছেন। চবি শাখা ছাত্রশিবিরের সভাপতি মোহাম্মদ আলী বলেন, “আমরা বারবার চাকসু নির্বাচনের দাবি জানিয়েছি। অন্য বিশ্ববিদ্যালয়ে তফসিল ঘোষণা হয়ে গেলেও চবিতে এখনও হয়নি। প্রশাসনের গাফিলতি ছাড়া একে আর কী বলা যায়?”
শাখা ছাত্রদলের সাধারণ সম্পাদক আব্দুল্লাহ আল নোমান বলেন, “আমরাও নির্বাচনের পক্ষেই। তবে যারা শিক্ষার্থীদের ওপর দমন-পীড়নের সাথে যুক্ত ছিল, তাদের বিচারের নিশ্চয়তা থাকতে হবে। নির্বাচন হতে হবে নিরপেক্ষ কমিশনের অধীনে।”
গণতান্ত্রিক ছাত্র কাউন্সিলের চট্টগ্রাম সভাপতি ধ্রুব বড়ুয়া বলেন, “এই প্রশাসনকে বিপ্লবী বলা যায় না। তারা অভ্যুত্থানের সুযোগ কাজে লাগিয়ে ছাত্র সমাজকে দূরে সরিয়ে রাখতে চাইছে। তফসিলের আগে নির্বাচনের গঠনগত দিকগুলো নিশ্চিত করতে হবে।”
বিপ্লবী ছাত্র ঐক্যের আহ্বায়ক তাহসান হাবীব বলেন, “আমরা বহু আগে থেকেই ৯ দফা দাবি নিয়ে আন্দোলনে ছিলাম। প্রশাসন আমাদের সঙ্গে কথা বললেও কার্যত কোনো অগ্রগতি দেখাচ্ছে না। আমাদের দাবি, সেপ্টেম্বরের মধ্যেই তফসিল ঘোষণা করতে হবে।”
‘জুলাই স্মৃতি সংরক্ষণ পরিষদ’-এর মুখপাত্র সৈয়ব আহমেদ সিয়াম বলেন, “চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীরা সবচেয়ে বেশি আন্দোলন করেছে। কিন্তু এখনও চাকসু নির্বাচনের কোনো নিশ্চয়তা নেই। এটা প্রশাসনের দুর্বলতা এবং অযোগ্যতার প্রমাণ।”
উপাচার্য অধ্যাপক ড. মুহাম্মদ ইয়াহ্ইয়া আখতার বলেন, “আমরাও চাকসু চাই। নীতিগতভাবে একমত হয়েই আমরা নীতিমালা তৈরির কাজ শুরু করেছি। ৪ তারিখে সিন্ডিকেট সভা রয়েছে, এরপর আমরা সিদ্ধান্ত নেব। সবকিছু ছাত্রদের ভালোর জন্যই হচ্ছে।”
উপ-উপাচার্য (প্রশাসন) অধ্যাপক ড. মো. কামাল উদ্দিন জানান, “চাকসু নীতিমালা সিন্ডিকেট সভায় উত্থাপনের পর দ্রুতই নির্বাচনের তফসিল ঘোষণা করা হবে।”
তবে সাধারণ শিক্ষার্থীদের অনেকেই জানেন না চাকসুর প্রকৃত কার্যক্রম কী। অনেকের ধারণা, এটা শুধু একটি বিল্ডিং যেখানে সস্তায় খাবার পাওয়া যায়। এই বাস্তবতা চাকসুর প্রাসঙ্গিকতা ও গুরুত্ব নতুনভাবে ভাবতে বাধ্য করছে প্রশাসন ও শিক্ষার্থীদের উভয়পক্ষকেই।
স্বদেশ প্রতিদিন/ আরএফ