
টাঙ্গাইলে যাত্রী ছাউনি যেন হয়ে উঠেছে ব্যবসার কেন্দ্র। হাজার টাকার ভাড়ায় সেখানে চলছে রমরমা ফল ও মোবাইল সার্ভিসিংয়ের ব্যবসা।
তিন কক্ষবিশিষ্ট যাত্রী ছাউনির প্রত্যেকটি কক্ষই যেন এখন ব্যবসার কেন্দ্র। মাঝের কক্ষটি যাত্রী বসার জন্য নির্ধারিত। ওই কক্ষে চলছে চা-পান বিক্রি। বাকি দুটি কক্ষের একটিতে ফলের দোকান, অন্যটিতে মোবাইল সার্ভিসিং ব্যবসা। দুই দোকান থেকেই নেওয়া হয়েছে জামানত। ফলের দোকানে দুই লাখ ৫০ হাজার এবং মোবাইল সার্ভিসিং দোকানে দুই লাখ ৭৫ হাজার টাকা। প্রতিটি দোকানে মাসিক ভাড়া তিন হাজার টাকা। অথচ লীজসংক্রান্ত নিয়ম অনুযায়ী এ ধরনের জামানত বা বাণিজ্যিক ব্যবহার অনুমোদিত নয়। নীতিমালা রয়েছে বাস্তবায়ন নেই।
যাত্রী বসার কক্ষের জন্য জামানত নেওয়া হয়নি। তবে সেটি নিয়ন্ত্রণ করছে হাট-বাজার ইজারা কমিটি। ফলে ছাউনিটিতে প্রকৃতপক্ষে যাত্রী বসার সুবিধা নেই। বাধ্য হয়ে নারী-শিশু-বৃদ্ধসহ যাত্রীরা রোদ-বৃষ্টি উপেক্ষা করে বাসের জন্য অপেক্ষা করে সড়কে দাঁড়িয়ে।
এটি টাঙ্গাইলের সখীপুর উপজেলার বড়চওনা বাজারের যাত্রী ছাউনির বর্তমান চিত্র। এই ছাউনির লীজগ্রহীতা বড়চওনা ইউনিয়নের নিষিদ্ধ ঘোষিত আওয়ামী লীগের যুগ্ম-আহ্বায়ক আল আমিন।
যাত্রী ছাউনি স্থাপন সংক্রান্ত নীতিমালায় বলা হয়েছে দুটি কক্ষের একটিতে যাত্রী বসার ব্যবস্থা এবং অন্যটিতে ফাস্টফুড জাতীয় হালকা খাবার বিক্রির অনুমোদন রয়েছে। এ বিষয়ে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের পর্যাপ্ত তদারকি নেই।
জানা গেছে, ২০১৩-১৪ অর্থবছরে জেলা পরিষদের অর্থায়নে সখীপুর-ঢাকা সড়কে পাঁচটি যাত্রী ছাউনি নির্মাণ করা হয়। নিম্নমানের উপকরণে নির্মিত হওয়ায় ৫-৬ বছরের মধ্যেই সবকটি ছাউনির ছাদ চুইয়ে পানি ভেতরে পড়ে। ওই পাঁচটি যাত্রী ছাউনিতেই দোকান কক্ষ চালু রয়েছে। তিনটি ছাউনিতে যাত্রী দাঁড়াবার ঠাঁই নেই। তবে দুটি ছাউনিতে আংশিক সেবার সুবিধা পাচ্ছেন যাত্রীরা। সরেজমিনে এমন চিত্র দেখা যায়।
বেলতলী বাজার যাত্রী ছাউনিটি কেউ লীজ গ্রহণ করেননি। অব্যবহারযোগ্য ছাউনির এক কক্ষে মুদির দোকান, চালাচ্ছেন হযরত আলী নামে এক ব্যক্তি। তিনি যাত্রী কক্ষটিতে বসার ব্যবস্থা করে দিয়েছেন। তিনি জানান, তার কক্ষের জন্য কাউকে ভাড়া দিতে হয় না।
কুতুবপুর বাজারের যাত্রী ছাউনিটির দোকান কক্ষটি সচল, যাত্রী বসার কক্ষটি সম্পূর্ণ অকার্যকর। এটিও ভাড়ায় চলছে।
কচুয়া বাজারের ছাউনিটির একটি কক্ষে রয়েছে ওষুধের দোকান, জামানত ও মাসিক ভাড়ায় পরিচালিত হচ্ছে। অন্য কক্ষটি আংশিক যাত্রীসেবায় ব্যবহৃত হচ্ছে।
সখীপুর পৌর শহরে থানার পাশে অবস্থিত একটি গুরুত্বপূর্ণ যাত্রী ছাউনি, যা দুই কক্ষবিশিষ্ট। অবহেলা ও অযত্নে ছাউনিটির বেহাল দশা। একটি কক্ষে চা-বিস্কুটের দোকান, অন্যটিতে বাসের 'টিকিট কাউন্টার'। ছাউনির চারপাশে রয়েছে ময়লা-আবর্জনা, ডাস্টবিন ও দুর্গন্ধময় পরিবেশ।
এটা পৌর শহরের প্রাণকেন্দ্রে অবস্থিত হওয়ায় বাস যাত্রীদের দাবি ‘এ যাত্রী ছাউনিটি ভেঙে—গণশৌচাগারসহ অত্যাধুনিক মডেলে একটি নতুন ভবন নির্মাণ ও রক্ষণাবেক্ষণে পৌর কর্তৃপক্ষের সক্রিয় ভূমিকা প্রয়োজন।’
বাসযাত্রী এক কলেজছাত্রী শিল্পী রাজর্ষী বলেন, ‘রোদ হোক বা বৃষ্টি দাঁড়াতে হয় রাস্তায়। ছাউনিতে বসা তো দূরের কথা দাঁড়ানোর জায়গাও নেই। এটা কি সত্যিই আমাদের জন্য বানানো?’
জানতে চাইলে মোবাইল সার্ভিসিং ব্যবসায়ী সজীব হোসেন দোকানের জামানতের টাকা দেওয়ার কথা স্বীকার করে স্বদেশ প্রতিদিনকে বলেন, ‘মাসে তিন হাজার টাকা ভাড়া দিচ্ছি।’
লীজগ্রহীতা আল আমিনের ভাষ্য, নিয়ম মেনেই চলছে সব কিছু। তিনি জামানত ও ভাড়ার টাকা গ্রহণের সত্যতা স্বীকার করেন।
ইউএনও আবদুল্লাহ আল রনী স্বদেশ প্রতিদিনকে কে বলেন, যাত্রী ছাউনিগুলো জেলা পরিষদের নিয়ন্ত্রণাধীন। লীজের সিদ্ধান্ত ও তদারকি করে জেলা পরিষদ। তবে জনদুর্ভোগের বিষয়ে প্রয়োজনীয় সহযোগিতা করা হবে।
জেলা পরিষদ সচিব শামসুন্নাহার স্বপ্না বলেন, জেলা পরিষদ এবং সড়ক ও জনপদ বিভাগ আলোচনা করে চুক্তিসাপেক্ষে সমন্বিত উদ্যোগে যাত্রী ছাউনিগুলো সংস্কারের উদ্যোগ নেওয়া হবে। তবে ২০১৩-১৪ অর্থবছরে জেলা পরিষদ থেকে কিছু যাত্রী ছাউনির লিজ দেওয়া হয়েছিল। সম্ভবত সেগুলোর মেয়াদ শেষ। তদন্ত করে দ্রুত ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
স্বদেশ প্রতিদিন/কেআইকে