
এসএসসি পরীক্ষায় ফল প্রকাশের পর প্রত্যাশিত ফলাফল না পাওয়ার পর সারা দেশে ৫ জন শিক্ষার্থী আত্মহত্যা করেছে বলে তথ্য পাওয়া গেছে। বৃহস্পতিবার (১০ জুলাই) এসএসসি ও সমমানের পরীক্ষার ফলাফল প্রকাশের পর বিভিন্ন জেলা থেকে তাদের মরদেহ উদ্ধার করা হয়।
বৃহস্পতিবার (১০ জুলাই) বিকেলে হবিগঞ্জের মাধবপুর উপজেলার নজরপুর গ্রামে নিজ বাড়ি থেকে ফারজানা আক্তার (১৬) নামের এক ছাত্রীর ঝুলন্ত লাশ উদ্ধার করে পুলিশ। সে ওই গ্রামের বীর মুক্তিযোদ্ধা আবুল কাশেমের মেয়ে এবং স্থানীয় গোবিন্দপুর সরকারি উচ্চবিদ্যালয়ের বিজ্ঞান বিভাগের এসএসসি পরীক্ষার্থী ছিলেন।
স্বজনেরা জানান, আজ দুপুরে এসএসসি পরীক্ষার ফলাফল ঘোষণার পর ফারজানা জানতে পারে, সে উত্তীর্ণ হতে পারেনি। এরপর মানসিকভাবে ভেঙে পড়ে। বিকেলে বারান্দায় গলায় ফাঁস দিয়ে সে ‘আত্মহত্যা’ করে।
এ বিষয়ে মাধবপুর থানার পরিদর্শক (তদন্ত) কবির হোসেন প্রথম আলোকে বলেন, ‘পুলিশ ঘটনাস্থলে গিয়ে মরদেহ উদ্ধার করে ময়নাতদন্তের জন্য হবিগঞ্জের ২৫০ শয্যাবিশিষ্ট জেলা সদর হাসপাতালে পাঠিয়েছে। এ ঘটনায় একটি অপমৃত্যুর মামলা করার প্রস্তুতি চলছে।’
এদিকে বগুড়ার শেরপুরে সুমাইয়া আক্তার (১৭) নামের এক এসএসসি পরীক্ষার্থীর মরদেহ উদ্ধার করেছে পুলিশ। প্রত্যাশিত ফল না পেয়ে বৃহস্পতিবার বিকেলে বাড়ির সবার অগোচরে শোবার ঘরের সিলিং ফ্যানের সঙ্গে গলায় ওড়না পেঁচিয়ে ‘আত্মহত্যা’ করে এই শিক্ষার্থী। তিনি সুমাইয়া শেরপুরের পল্লী উন্নয়ন একাডেমির ল্যাবরেটরি স্কুল অ্যান্ড কলেজের বিজ্ঞান বিভাগের এসএসসি পরীক্ষার্থী ছিল। তাদের বাড়ি উপজেলার গাড়িদহ ইউনিয়নের মাদ্রাসাপাড়া গ্রামে।
স্বজনদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, ফল প্রকাশের পর সুমাইয়া কাঁদতে কাঁদতে মাকে জানায়- সে গণিতে এ প্লাস পায়নি। এ কারণে পরীক্ষার ফলাফলে এ গ্রেড পেয়েছে। এরপর সে নিজের ঘরে চলে যায়। কিছুক্ষণ পর মা দুপুরের খাবারের জন্য ডাকতে গিয়ে ঘরের সিলিং ফ্যানে তাকে ঝুলতে দেখেন। দ্রুত তাকে উদ্ধার করে উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে নিয়ে গেলে চিকিৎসক মৃত ঘোষণা করেন। পরে পুলিশ হাসপাতাল থেকে লাশ উদ্ধার করে থানায় নিয়ে যায়।
এ বিষয়ে শেরপুর থানার উপপরিদর্শক (এসআই) আনোয়ার হোসেন বলেন, প্রাথমিকভাবে ‘আত্মহত্যা’ বলে ধারণা করা হচ্ছে। আইনি প্রক্রিয়া শেষে মরদেহ স্বজনদের কাছে হস্তান্তর করা হবে।
একই দিন কুমিল্লার বুড়িচং উপজেলার ষোলনল ইউনিয়নের ইছাপুরা গ্রামে এক এসএসসি পরীক্ষার্থীর মরদেহ উদ্ধার করা হয়েছে। সে উপজেলার ভরাসার বহুমুখী উচ্চবিদ্যালয় থেকে এবার এসএসসি পরীক্ষায় অংশ নেয়।
স্বজনেরা জানান, বৃহস্পতিবার দুপুরে ফলাফল প্রকাশের পর মেয়েটি জানতে পারে, সে দুই বিষয়ে অকৃতকার্য হয়েছে। এতে সে মানসিকভাবে ভেঙে পড়ে। পরে সে ঘরের সিলিং ফ্যানের সঙ্গে ফাঁস দিয়ে ‘আত্মহত্যা’ করে।
নিহত শিক্ষার্থীর দাদা বলেন, ‘আমার ছেলে প্রবাসে থাকে। পরীক্ষায় ফেল করার খবর শুনে আমার নাতনি আত্মহত্যা করেছে। আমার ছেলে তার মেয়ের এমন মৃত্যুর খবর শুনে প্রবাস থেকে দেশে ফেরার প্রস্তুতি নিয়েছে।’
এ বিষয়ে বুড়িচং থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) মো. আজিজুল হক বলেন, ‘খবর পেয়ে ঘটনাস্থলে পুলিশ পাঠানো হয়েছে। পরীক্ষায় অকৃতকার্য হওয়ায় মেয়েটি আত্মহত্যা করেছে বলে প্রাথমিকভাবে বলা যাচ্ছে। পুলিশ বিষয়টি খতিয়ে দেখছে। এ ঘটনায় প্রয়োজনীয় আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া হবে ‘
বৃহস্পতিবার (১০ জুলাই) দুপুরে ঠাকুরগাঁওয়ের বালিয়াডাঙ্গী উপজেলায় মিতু আকতার নামের এক শিক্ষার্থীর ‘ঝুলন্ত লাশ’ উদ্ধার করেছে পুলিশ। তার বাড়ি উপজেলার চাড়োল ইউনিয়নের দোগাছি ক্ষিরাপুকুর গ্রামে। মিতু আকতার বালিয়াডাঙ্গী সরকারি বালিকা উচ্চবিদ্যালয় থেকে বিজ্ঞান বিভাগে পরীক্ষা দিয়েছিল। গণিত, উচ্চতর গণিত ও রসায়ন বিষয়ে সে অকৃতকার্য হয়।
স্বজনেরা জানান, আজ দুপুরে এসএসসি পরীক্ষার ফল প্রকাশের সময় বাড়িতে একা ছিল মিতু। নিজের মোবাইলে ফল দেখার পর শোবার ঘরে গিয়ে গলায় ফাঁস দেয় সে। মিতুর ছোট ভাই ঘরের দরজা বন্ধ দেখে দৌড়ে খেতে গিয়ে মা-বাবাকে খবর দেয়। পরে ঘরের দরজা ভেঙে মিতুকে উদ্ধার করে বালিয়াডাঙ্গী উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে নিয়ে গেলে কর্তব্যরত চিকিৎসক তাকে মৃত ঘোষণা করেন।
নিহতের বাবা রুহুল আমিন বলেন, ‘ফল প্রকাশের আগের দিন মেয়েকে বুঝিয়েছিলাম। মেয়ে নিজেই বলল, কোনো সমস্যা নেই। আমরা সবাই খেতে কাজ করছিলাম। নিজেই ফলাফল দেখে এমন কাজ করবে, আমরা ভাবতেই পারিনি।’
বৃহস্পতিবার (১০ জুলাই) ফলাফল প্রকাশের দিন সন্ধায় দিনাজপুরের নবাবগঞ্জে রিতা মণি (১৬) নামের এক কিশোরীর লাশ উদ্ধার করেছে পুলিশ। ঘটনাটি ঘটে উপজেলার ৭ নম্বর দাউদপুর ইউনিয়নের আখিরা গ্রামে। রিতা মণি উপজেলার দাউদপুর বালিকা উচ্চবিদ্যালয় ও কলেজ থেকে বিজ্ঞান বিভাগে এসএসসি পরীক্ষায় অংশ নিয়েছিল। সে এক বিষয়ে অকৃতকার্য হয়েছে বলে জানিয়েছে পরিবার।
পুলিশ জানায়, পরীক্ষায় অকৃতকার্য হওয়ার পর বেলা সাড়ে ৩ টার দিকে বাড়িতে কীটনাশক পান করে। পরে পরিবারের লোকজন তাকে উদ্ধার করে উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে নিয়ে যায়। সেখানে চিকিৎসাধীন অবস্থায় সন্ধ্যা সাড়ে ৭ টার দিকে রিতা মণির মৃত্যু হয়।
এ বিষয়ে নবাবগঞ্জ থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা মোহাম্মদ আবদুল মতিন প্রথম আলোকে বলেন, ‘এ ঘটনায় অপমৃত্যুর মামলা হয়েছে।’
ফলাফল প্রকাশের দিন বেশির ভাগ শিক্ষার্থী ও অভিভাবকরা প্রতিবেসীদের মিষ্টি খাওয়ান এবং সবাইকে তার সন্তানের ভালো ফলাফলের কথা বলেন। অন্যদিকে কেউ পরীক্ষায় প্রত্যাশিত ফলাফল বা অকৃতকার্য হয়ে মুখে নেনে বিষ কিংবা গলায় নেন ফাঁস। সেই সাথে কাঁদিয়ে জান মা- বাবাকে। যা মানুষকে শোকাহত করে তোলে।
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, ‘এই বিষয়টি সত্যি খুবি দঃখ্যজনক। তাদের মতে, জীবনে সফলতাকে অর্জন করতে হলে চেষ্টা চালিয়ে যেতে হবে। বার বার চেষ্ট করার মাধ্যমে সফলতাকে অর্জন করতে হবে। আত্মহত্যা কোনো কিছুর সমাধান নয়।
স্বদেশ প্রতিদিন/এমএম