
ফেসবুক স্ক্রল করার সময় হঠাৎ শ্বাস বন্ধ হয়ে এলো তাঁর। মায়ের সাবেক প্রেমিকের ছবি দেওয়া একটি পোস্টে চোখ আটকে গেল। ক্যাপশনে লেখা—একজন নারীকে নারী হওয়ার কারণে হত্যা করা হয়েছে; এটি একটি ফেমিসাইড।
তখন জেনিফার রামিরেজের বয়স ছিল মাত্র ১৭। তিন ভাইবোনের মধ্যে সে সবচেয়ে বড়, তখনো স্কুলে পড়ে। সেদিন সে অপেক্ষা করছিল মামার বাড়িতে—সেখানে মা, ৩৩ বছর বয়সী লেইডি নাভারেতে আসার কথা ছিল।
তারিখ ছিল ২০২২ সালের ২৩ ডিসেম্বর। বড়দিনের উৎসবের ঠিক দুই দিন আগে।
কিন্তু ফেসবুক পোস্টটি পড়েই সব শেষ। মায়ের আর আসা হবে না—পোস্টে যে নিহত নারীর কথা বলা হচ্ছে, সে-ই তাঁর মা। সেই সকালে, দক্ষিণ বোগোতার নিজ অ্যাপার্টমেন্ট থেকে কাজে যাওয়ার প্রস্তুতি নেওয়ার সময়, মায়ের সাবেক প্রেমিক আন্দ্রেস কাস্ত্রো জোর করে ভেতরে ঢুকে তাঁকে শ্বাসরোধে হত্যা করে।
বেদনাবিধুর এই খবর পেয়ে জেনিফার শ্বাস নিতে পারছিল না। শোকে অজ্ঞান হয়ে পড়ে যায়।
এখন ১৯ বছর বয়সী রামিরেজ বললেন, 'এক মুহূর্তেই সব বদলে গেল। আমরা চারজন সব সময় একসঙ্গে ছিলাম—আমার মা আর আমরা তিন ভাইবোন।'
রামিরেজ, তাঁর ভাই এবং ছোট বোন লুনা—এরা সবাই ফেমিসাইডের ‘অদৃশ্য শিকার’, বলে মনে করেন পারিবারিক সহিংসতা প্রতিরোধে কাজ করা কর্মীরা।
এই হত্যাকাণ্ডগুলো অনেক সময় শিশুদের একেবারে অনাথ করে ফেলে—যখন হত্যাকারী বাবা কিংবা অভিভাবক হন, তখন তো আর বাকি কিছু থাকে না।
তবে সম্প্রতি কলম্বিয়ার কংগ্রেসে পাস হওয়া একটি আইন এসব শিশুদের জন্য রাষ্ট্রীয় সহায়তা নিশ্চিত করতে যাচ্ছে।
এই বিলটি লাতিন আমেরিকার একটি ক্রমবর্ধমান আইনি প্রবণতার অংশ—যার লক্ষ্য, লিঙ্গ-ভিত্তিক সহিংসতায় ক্ষতিগ্রস্ত শিশুদের মানসিক স্বাস্থ্য সহায়তা ও ক্ষতিপূরণ দেওয়া।
“এই আইন স্বীকার করে যে, একজন নারী যখন ফেমিসাইডের শিকার হন, তখন তিনি একা নন—আরো ‘পরোক্ষ’ শিকার থাকে,” বললেন কংগ্রেস সদস্য ক্যারোলিনা গিরালদো, যিনি বিলটির খসড়া প্রণয়ন করেছেন।
জাতিসংঘের তথ্য অনুযায়ী, আর্জেন্টিনা, চিলি, ব্রাজিল ও ইকুয়েডরসহ আটটি লাতিন আমেরিকান দেশ ফেমিসাইডে নিহতদের শিশুদের সহায়তায় এমন আইন ইতোমধ্যে চালু করেছে।
প্রয়োজনটাও বিশাল। জাতিসংঘের ২০২৩ সালের এক প্রতিবেদনে বলা হয়, লাতিন আমেরিকা ও ক্যারিবীয় অঞ্চলে প্রতিদিন গড়ে ১১ জন নারীকে শুধুমাত্র নারী হওয়ার কারণে হত্যা করা হয়।
কলম্বিয়াতেই ২০১৯ থেকে ২০২৪ সাল পর্যন্ত অন্তত ১,৭৪৬ শিশু এইভাবে অনাথ হয়েছে—এ তথ্য দিয়েছে স্বাধীন গবেষণা প্রতিষ্ঠান ‘কলম্বিয়ান অবজারভেটরি অব ফেমিসাইডস’।
রামিরেজ বলেন, মাকে হারানোর পর তাঁর জীবন অর্থহীন মনে হয়।
“মা আমাকে সব বোঝাতেন, পথ দেখাতেন। এখন সব কিছু বিশৃঙ্খল। আমার জীবনে কোনো স্থিরতা নেই, কোনো লক্ষ্য নেই।”
পূর্বের মতো আর জন্মদিন বা উৎসব পালনের অনুভূতি থাকে না। বড়দিন কিংবা মায়ের দিবস—সবই যেন শূন্যতায় ডুবে থাকে।
চিকিৎসা নিতে চাইলেও মানসিক স্বাস্থ্য সেবা নেওয়ার সামর্থ্য নেই—জানান রামিরেজ। তাঁর বাবা একটি সিমেন্ট মিক্সার চালান, আর একেকটি থেরাপি সেশনের খরচ ৪৪ থেকে ৯৬ ডলার পর্যন্ত।
“আমার দুই ভাইবোন না থাকলে আমি হয়তো বেঁচে থাকতাম না,” বলেন রামিরেজ।
তবে নিজের চেয়েও ছোট বোন লুনার ব্যাপারে বেশি চিন্তিত তিনি।
মা মারা যাওয়ার পর রামিরেজ ও তাঁর ভাই ফাবিয়ান বাবার কাছে চলে যান, আর তখন ছয় বছর বয়সী লুনাকে ঠাঁই দেওয়া হয় দাদির কাছে।
লুনার বাবা বর্তমানে মায়ের হত্যার দায়ে ৩১ বছরের কারাদণ্ড ভোগ করছেন। খুনের সময় ছোট্ট লুনা বাসাতেই ছিল।
আজও সে সেই ভয়ানক দৃশ্য মনে করতে পারে। কোনো দিন দাদি বললেন, লুনা কাঁদতে কাঁদতে মাকে মিস করে। কোনো দিন রাগে ফেটে পড়ে বলে—সে বাবাকে ঘৃণা করে।
বিদ্যালয় থেকে মাত্র দুইবার থেরাপি দেওয়া হয়েছিল লুনাকে। পরে কলম্বিয়ার স্বাস্থ্যসেবায় আবার থেরাপি শুরু হয়, কিন্তু সীমিত সুযোগের কারণে সেখানেও মাত্র তিনবার সেশন হয়।
এই অবস্থার কারণে নতুন আইনটি নিয়ে সবচেয়ে আশাবাদী লুনার দাদি, জ্যাকলিন প্লাতা।
“অর্থ সাহায্যের চেয়েও বেশি আমরা সন্তুষ্ট মানসিক সহায়তা পাব বলে,” বলেন প্লাতা।
এই পরিবারসহ আরও কয়েকজনের সাক্ষ্য শুনেই আইন প্রণয়ন করেন এমপি গিরালদো।
তিনি জানান, ‘অরফানস অব ফেমিসাইড কলম্বিয়া’ নামে একটি সংগঠনের মাধ্যমে আটটি পরিবারের অভিজ্ঞতা শুনে তৈরি হয়েছে আইনটির খসড়া।
“এই আইন তাদের কথা মাথায় রেখেই তৈরি হয়েছে, যাদের জীবন মুহূর্তে মুহূর্তে বদলে গেছে,” বলেন তিনি।
এইসব শিশুর প্রয়োজন অনেক ধরনের।
মানবাধিকার সংগঠন ‘ফুন্দাসিওন আলদিয়া’র পরিচালক জেরালদিনা গুয়েরা বলেন, “ফেমিসাইডের প্রভাব শুধু এক জায়গায় পড়ে না—জীবনের প্রতিটি ক্ষেত্রে তার ছায়া পড়ে।”
২০১৯ সালে চিলির দিয়েগো পোর্তালেস বিশ্ববিদ্যালয়ের এক গবেষণায় দেখা গেছে, ফেমিসাইড-অন্তর্গত শিশুদের ৯০ শতাংশই বিষণ্নতায় ভোগে।
২০২৪ সালে ইউনিসেফ ও ফুন্দাসিওন আলদিয়ার আরেক গবেষণায় উঠে আসে, ইকুয়েডরে এমন ৭২ শতাংশ পরিবার বাচ্চাদের মৌলিক চাহিদা মেটাতেই হিমশিম খায়।
সমালোচকদের কেউ কেউ বলেছিলেন, শুধু ফেমিসাইড নয়—সব হত্যাকাণ্ডে পিতামাতাকে হারানো শিশুদের এই সহায়তা দেওয়া উচিত। কিন্তু শেষ পর্যন্ত কংগ্রেসের পাস হওয়া বিলটিতে শুধুই ফেমিসাইডের শিকার সন্তানদের অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে।
আইনটি অনুযায়ী, নিহতদের সন্তানরা ১৮ বছর বয়স পর্যন্ত সহায়তা পাবে। কেউ উচ্চশিক্ষায় গেলে কিংবা কোনো প্রতিবন্ধিতা থাকলে এই সহায়তা ২৫ বছর পর্যন্ত বহাল থাকবে। তাছাড়া, দাফন খরচ ও মানসিক সেবাও বিনামূল্যে প্রদান করা হবে।
এখন বিলটি প্রেসিডেন্ট গুস্তাভো পেত্রোর স্বাক্ষরের অপেক্ষায়, এবং অনুমান করা হচ্ছে—তিনি এটিতে সই করবেন।
আইন কার্যকর হলে রামিরেজ পর্যটন বিষয়ে বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি হওয়ার পরিকল্পনা করছেন।
“আমার মা যেন আমাকে তাঁর ছায়া করে গড়ে তুলেছিলেন,” বলেন রামিরেজ। “আমি তাঁর কাছ থেকে অনেক কিছু শিখেছি—যা এখন অন্যদের কাজে লাগাতে পারি।”
স্বদেশ প্রতিদিন/কেএইচ