প্রকাশ: রবিবার, ১৮ মে, ২০২৫, ২:২৯ পিএম

প্রায় পাঁচ দশক ধরে মানুষের শেষ বিদায়ের পথে ছিলেন নীরব সঙ্গী। কবর খুঁড়ে দিতেন নিঃস্বার্থভাবে-কোনো অর্থ না নিয়ে। সেই মানুষটি, কিশোরগঞ্জের ইটনা উপজেলার ৬৭ বছর বয়সী মনু মিয়া এখন মৃত্যুর সাথে লড়ছেন হাসপাতালে। আর এই সংকটকালে দুর্বৃত্তদের নির্মমতার শিকার হল তার একমাত্র সঙ্গী, জীবিকা আর যাতায়াতের ভরসা-তার প্রিয় ঘোড়াটি।
১৪ মে থেকে রাজধানীর একটি বেসরকারি হাসপাতালে ভর্তি আছেন মনু মিয়া। দীর্ঘ রোগভোগে চলতে থাকা জীবন সংগ্রামে তিনিই ছিলেন নিজের ভরসা। মৃত্যুর সংবাদ পেলেই কাঁধে কোদাল-ছেনা নিয়ে ছুটে যেতেন কবরস্থানে। ৪৯ বছরে খুঁড়েছেন ৩ হাজার ৫৭টি কবর- একবারও কারো কাছ থেকে কোনো অর্থ, উপহার কিংবা পারিশ্রমিক নেননি।
কবর খোঁড়ার কাজে দূরবর্তী স্থানে পৌঁছাতে নিজের ধানিজমি বিক্রি করে কয়েক বছর আগে একটি ঘোড়া কেনেন মনু মিয়া। সেই ঘোড়াই তার একমাত্র বাহন, একমাত্র সহচর। কিন্তু হাসপাতালে শয্যাশায়ী থাকার সুযোগে দুর্বৃত্তরা ঘোড়াটিকে হত্যা করে ফেলে রাখে পার্শ্ববর্তী মিঠামইন উপজেলার হাশিমপুর ছত্রিশ গ্রামের একটি জলাভূমিতে।
গ্রামবাসীরা জানান, শুক্রবার সকালে ঘোড়াটির মরদেহ পানিতে ভেসে থাকতে দেখা যায়। বুকে ছিল ধারালো অস্ত্রের গভীর আঘাত। তিন দিন ধরে ঘোড়াটি নিখোঁজ ছিল।
মনু মিয়ার স্ত্রী রহিমা বেগম বলেন, ‘উনার অবস্থা ভালো না। আল্লাহর রহমতেই উনি বাঁচবেন। উনি কোনোদিন কারো ক্ষতি করেননি। এমন ভালো একটা মানুষকে কেউ ঘোড়াটার মতো কষ্ট দিতে পারে- ভাবতেই পারি না। আমরা তাকে এখনো বলিনি... উনি এই খবর জানলে সহ্য করতে পারবেন না।’
বিষয়টি সম্পর্কে জানতে চাইলে কিশোরগঞ্জ জেলা পুলিশের অতিরিক্ত পুলিশ সুপার (প্রশাসন ও অর্থ) মুকিত সরকার জানান, ঘটনাটি গুরুত্ব দিয়ে দেখা হচ্ছে। আইনগত ব্যবস্থা গ্রহণের জন্য আমরা নির্দেশনা দিচ্ছি।
মনু মিয়া তার সেবামূলক জীবনে অগণিত মৃত ব্যক্তিকে শেষ বিদায় দিয়েছেন নিঃস্বার্থভাবে। আজ যখন তিনিই হাসপাতালে মৃত্যুর সঙ্গে লড়ছেন, তখন সমাজ, রাষ্ট্র এবং মানবতার পক্ষ থেকে তার পাশে দাঁড়ানোর সময়।
তিনি হয়তো আর বহু কবর খুঁড়বেন না, কিন্তু ইতিহাসে তার নাম লেখা থাকবে-একজন নীরব মানবসেবীর প্রতীক হয়ে।
স্বদেশ প্রতিদিন/এমএম