
১৯৪৮ সালের মে মাসে, যখন ঘাদা আজিলের দাদি খাদিজা আম্মার বেইত দারাসে নিজের বাড়ি থেকে চিরতরে বেরিয়ে গেলেন, তখন তাঁর সঙ্গে হাজার হাজার ফিলিস্তিনিও ছিলেন, যাঁরা জায়নিস্ট মিলিশিয়াদের হামলা থেকে বাঁচতে আপন ভিটেমাটি ছেড়ে পালিয়ে যাচ্ছিলেন। কিন্তু তখন পৃথিবী তাঁদের দিকে তাকায়নি। সবার অভিজ্ঞতা ছিল গভীরভাবে একাকী।
পরে এই ঘটনা ‘নকবা’ (বিপর্যয়) নামে পরিচিত হয়। এটি ছিল ফিলিস্তিনিদের জন্য এক চরম ক্ষতি—যা দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পরপরই ঘটে যাওয়া ইহুদিদের হলোকাস্টের মতোই বেদনাদায়ক, যদিও তা ছিল ভিন্ন প্রকৃতির।
‘নকবা’ শেষ হয়নি, বরং রূপ নিয়েছে নতুন এক ধ্বংসযজ্ঞে৭৭ বছর পেরিয়ে যাওয়ার পরও আজ ফিলিস্তিনিরা নিজেদের জন্মভূমিতে বেঁচে থাকার অপরাধে খুন হচ্ছেন, শাস্তি পাচ্ছেন। এটাই ছিল নকবার ধারাবাহিকতা। কিন্তু এখন, ২০২৫ সালে, এটি আর শুধু পুরনো স্মৃতি নয়—এটি হয়ে উঠেছে সরাসরি সম্প্রচারিত এক গণহত্যা। সহিংসতা এখন আর আড়ালে নয়, বরং মোবাইল স্ক্রিনেই দৃশ্যমান।
এই বাস্তবতা বোঝাতে নতুন শব্দ প্রয়োজন। বহু শব্দের ব্যবহার হয়েছে—গাজাসাইড, স্কলারসাইড, ডেমোসাইড, কালচারিসাইড—তবে প্রতিটি শব্দই আংশিক চিত্র তুলে ধরে। যেমন ‘স্কলারসাইড’ বোঝায় গাজায় বিশ্ববিদ্যালয়, স্কুল, গ্রন্থাগার ধ্বংস ও শিক্ষকের হত্যা। আর ‘গাজাসাইড’ ফিলিস্তিনের গাজা ভূখণ্ডকে নিশানা করে শতাব্দীব্যাপী মুছে ফেলার প্রচেষ্টাকে।
কিন্তু এই শব্দগুলো আর যথেষ্ট নয়। কারণ এখন যা হচ্ছে, তা আর নিছক কোনো অংশ নয়—এটি সমগ্র ফিলিস্তিনকে ধ্বংস করার এক প্রক্রিয়া।
নতুন শব্দ: ‘আল-ইবাদাহ’ (ধ্বংস)তাই অধ্যাপক ঘাদা আজিল প্রস্তাব করেছেন নতুন একটি শব্দ—‘আল-ইবাদাহ’, যার অর্থ ‘সম্পূর্ণ ধ্বংস’। এটি আরবিতে ‘গণবিনাশ’-এর (Genocide) শিকড় থেকে নেওয়া শব্দ। এই শব্দটি শুধুমাত্র গাজা নয়, বরং সমগ্র ফিলিস্তিনে চলমান ধ্বংসযজ্ঞ, মানবিক সংকট, নিধন ও সাংস্কৃতিক নিশ্চিহ্নতাকে বোঝাতে সক্ষম।
এই ‘ধ্বংসে’ সাংবাদিক, চিকিৎসক, শিক্ষক, শিশু—কারোই রেহাই নেই। একেকটি পরিবার পুরোপুরি নিশ্চিহ্ন হয়ে যাচ্ছে। কেউ তাদের সন্তানদের মরদেহ বহন করছে ক্যামেরার সামনে, কেউ আবার ঘুমাতে ভয় পাচ্ছে—ভয়, ধ্বংসের নিচে চাপা পড়ে যাবে।
একজন গাজার শিশু জন্ম নিল, যেদিন বাবাকে হারাল২০২৫ সালের ৭ মে গাজা সিটির একটি রেস্টুরেন্ট ও বাজারে বিমান হামলায় নিহত হন বহু মানুষ। তাঁদেরই একজন সাংবাদিক ইয়াহিয়া সুবেইহ, যিনি ওইদিনই বাবা হয়েছিলেন। মেয়ের জন্মদিনেই তাঁর মৃত্যু হয়ে গেল—মেয়েটি প্রতিবার জন্মদিনে বাবার মৃত্যুকেও স্মরণ করবে।
এক রেস্টুরেন্ট কর্মী বলেন, দুটি মেয়ে পিৎজা খেতে এসেছিল। একজন বলেছিল, ‘এটা অনেক দামি।’ অন্যজন বলেছিল, ‘মরে যাওয়ার আগেই জীবনে একবার পিৎজা খেয়ে নিই।’ পিৎজা খাওয়ার সেই স্বপ্ন শেষ পর্যন্ত মৃত্যুর আগমুহূর্তেই ধরা দিয়েছিল।
আজকের নকবা, এক নতুন মোড় নিয়েছেঘাদা আজিল বলেন, এই নতুন রূপকে স্বীকৃতি দেওয়া দরকার। তিনি বলেন, “এই সময়কে আমরা যেন নাম দিই—‘আল-ইবাদাহ’—ধ্বংসের সময়। কারণ শব্দের মধ্যেও শক্তি আছে। একে নাম দিলে সেটি বাস্তব হয়ে ওঠে।”
ড. ঘাদা আজিল (রাজনৈতিক বিজ্ঞানের অধ্যাপক): আল জাজিরা অবলম্বনে
অনুবাদ: কামাল হোসাইন
স্বদেশ প্রতিদিন/এমএম