বৃহস্পতিবার ২৪ সেপ্টেম্বর ২০২৬
   
শিরোনাম:
দেশকে অস্থিতিশীল করার সুযোগ দেয়া হবে না       নৈরাজ্য ও ষড়যন্ত্রের বিরুদ্ধে মোংলায় বিএনপির বিক্ষোভ       আওয়ামী লী‌গের তিন নেতা গ্রেপ্তার      সাতক্ষীরায় জলবায়ু ন্যায়বিচার প্রকল্পের সমাপনী      সন্ত্রাসের মাধ্যমে দেশকে অস্থিতিশীল করার প্রতিবাদে বিক্ষোভ       আইনশৃঙ্খলা সভায় হট্টগোল, তর্কে জড়ালেন এমপি হান্নান      লাতিন আমেরিকার দুই দলকে হারাল জাপান-কোরিয়া      কিশোর গ্যাংয়ের সঙ্গে সম্পৃক্ততার সন্দেহে ৫১ কিশোর আটক      প্রথম ১৪ ওয়ানডেতেই ইতিহাস গড়লেন ম্যাথু ব্রিটজকে      ২৫ সেপ্টেম্বরের মুর্তজা কিজিলবাশের কনসার্ট স্থগিত      অঙ্কন-নন্দিতার দ্বৈত কণ্ঠে আজ প্রকাশিত হচ্ছে ‘মথুরা’      ফোটন সার্ভিস সেন্টারের উদ্বোধন      
এম খালেদ : পথিকৃত ইসলামী ব্যাংকার (১ম পর্ব)
মো. খায়রুল হাসান মুন্না
প্রকাশ: শনিবার, ১৭ মে, ২০২৫, ৭:২২ পিএম আপডেট: ১৮.০৫.২০২৫ ১২:১২ এএম
এম খালেদ

এম খালেদ

বাংলাদেশে ইসলামী ব্যাংকিংয়ের ভিত্তি রচনা ও এর প্রসারে একেবারে প্রথম পর্যায়ে যারা ভূমিকা পালন করেন এম খালেদ তাদের অন্যতম। বাংলাদেশে ইসলামী ব্যাংক প্রতিষ্ঠার প্রায় চার বছর আগে তার নেতৃত্বে ১৯৭৯ সালে ঢাকায় ইসলামী ব্যাংকিং বিষয়ে ব্যাংকারদের প্রথম সংগঠন ‘ওয়ার্কিং গ্রুপ ফর ইসলামিক ব্যাংকিং ইন বাংলাদেশ’ গঠিত হয়। এই সংগঠনটি ১৯৮২ সালে ‘বাংলাদেশ ইসলামিক ব্যাংকার্স এসোসিয়েশন’ (বিবা) নামে পুনর্গঠিত হয়। বিবা বাংলাদেশের ব্যাংকারদের একটি উদ্যোগী অংশকে সাথে নিয়ে কাজ করে ইসলামী ব্যাংকিং-এর প্রথম পাটাতন গড়ে তোলে।

পূর্ব বাংলার কৃষিজীবী সম্প্রদায়ের বিশ্ববিদ্যালয়রূপে ১৯২১ সালে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠার  চার বছর পর এম খালেদ ১৯২৫ সালের ২৭ অক্টোবর চট্টগ্রামের রাউজানে জন্মগ্রহণ করেন। তাঁর পিতা বেদার বখত ছিলেন পূর্ব বাংলার তখনকার হাতেগোনা ক’জন মুসলমান পুলিশ কর্মকর্তার অন্যতম। সেই আর্থ-সামাজিক পটভূমিতে পিতার ধৈর্য ও উৎকর্ষ অর্জনের উদ্যম তাঁর জীবনে গভীর প্রভাব ফেলে। এম খালেদ ১৯৪৭ সালে কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে মুসলিম ছাত্রদের মধ্যে প্রথম স্থান অধিকার করে বাণিজ্যে গ্রাজুয়েশন লাভ করেন। এরপর তিনি চট্টগ্রাম সরকারি কমার্স কলেজের শিক্ষক হিসেবে কর্মজীবন শুরু করেন।     

ব্যাংকিং পেশায় এম খালেদের যোগদানের প্রেক্ষাপট সম্পর্কে ধারণা পাওয়া যায় তার আত্মজীবনী থেকে। তিনি লিখেছেন: “বৃটিশ শাসনামলে ব্যাংকিং খাতে মুসলমানদের উপস্থিতি ছিল না বললেই চলে। হিন্দু ও পার্সি সম্প্রদায়ের লোকেরা এখানে প্রাধান্য বিস্তার করেছিল। ব্রিটিশদের হাত থেকে স্বাধীনতা লাভের সাথে সাথে মুসলিম অধ্যুষিত পাকিস্তান থেকে একসাথে অনেক হিন্দু প্রস্থান করায় দেশে একটি বড় শূন্যতা সৃষ্টি হয়। তখন অন্যান্য ক্ষেত্রের মত ব্যাংকিং ব্যবস্থাও একটি শক্তিশালী কাঠামোর ওপর দাঁড় করানোর প্রয়োজন দেখা দেয়। মুসলমানদের মধ্যে ব্যাংকিং বিষয়ক বাস্তব জ্ঞান ও অভিজ্ঞতা প্রায় অনুপস্থিত থাকায় এ কাজটি ছিল অত্যন্ত দুরূহ। অবশ্য কিছু লোক ব্যতিক্রমী ছিলেন যারা পাকিস্তানে ব্যাংকিং-এর পরিকাঠামো গঠনের প্রাথমিক বোঝা কাঁধে তুলে নেন। এদের মধ্যে হাবিব ব্যাংকের হাবিব ও পাকিস্তান ন্যাশনাল ব্যাংকের প্রথম ম্যানেজিং ডাইরেক্টর মুহাজিরের নাম তাদের নিরন্তর প্রচেষ্টার কারণে স্বর্ণাক্ষরে লেখা থাকবে। এ সঙ্কটময় মুহূর্তে শুন্যতা পূরণ করতে সদ্য পাশ করা গ্রাজুয়েটদেরকে ব্যাংকিংয়ে আসতে উদ্বুদ্ধ করা হয় এবং একসাথে বহুসংখ্যক তরুণকে নিয়োগ দেয়া হয়।”

এম খালেদ কলেজে অধ্যাপনা করার সময় ১৯৪৮ সালের শুরুর দিকে কলকাতা ইউনাইটেড কমার্শিয়াল ব্যাংকের একজন কর্মকর্তা চট্টগ্রাম সফর করেন। তিনি দেশের আর্থ-সামাজিক উন্নয়নে বাঙালী মুসলমানদের ব্যাংকিং পেশায় এগিয়ে আসার ওপর গুরুত্বারোপ করেন। মূলতঃ তার উৎসাহে এম খালেদ ব্যাংকিংয়ের প্রতি উদ্বুদ্ধ হন। সে বছরই এম খালেদ ইউনাইটেড কমার্শিয়াল ব্যাংকের কলকাতা  অফিসে অফিসার পদে যোগ দেন।

ইউনাইটেড কমার্শিয়াল ব্যাংকে কিছুদিন কাজ করার পর এম খালেদ ন্যাশনাল ব্যাংক অব পাকিস্তানে যোগ দেন। সেখানে তিনি প্রায় দশ বছর কর্মরত ছিলেন। এ সময় উচ্চতর একাউন্টেন্সিতে সম্মানসহ লন্ডন, ভারত ও পাকিস্তানের ইনস্টিটিউট অব ব্যাংকার্স-এর পরীক্ষাগুলোতে কৃতকার্য হন এবং লন্ডনের স্ট্যাটিস্টিক্যাল সোসাইটি, পাকিস্তান ইনস্টিটিউট অব ব্যাংকার্স ও ইন্টারন্যাশনাল ব্যাংকার্স এসোসিয়েশনের ফেলোশীপ লাভ করেন।

এম খালেদ কলম্বো প্ল্যানের অধীনে ব্যাংকিং-এ উচ্চতর প্রশিক্ষণ লাভের জন্য ১৯৫৩-৫৪ সালে লন্ডনের মিডল্যান্ড ব্যাংকে কাজ করেন। তিনি পশ্চিম জার্মানীর ডয়শে ব্যাংক এ. জি., লন্ডনের ওয়েস্ট মিনিস্টার ব্যাংক এবং নিউইয়র্কের আরভিং ট্রাস্ট কোম্পানীতেও বিশেষ প্রশিক্ষণ গ্রহণ করেন। 

১৯৫৯ সালে তিনি পূর্ব বাংলার বাঙালী মালিকানায় প্রথম পর্যায়ে প্রতিষ্ঠিত ইস্টার্ন মার্কেন্টাইল ব্যাংকে জেনারেল ম্যানেজার হিসেবে যোগদান করেন। এই ব্যাংকের মাধ্যমে তিনি পূর্ব পাকিস্তানের শিল্প ও বাণিজ্য উদ্যোক্তাদের জন্য ব্যাংকিং সুবিধা সম্প্রসারণের জন্য কাজ করেন।

বাংলাদেশের স্বাধীনতার পর ১৯৭২ সালে ইস্টার্ন মার্কেন্টাইল ব্যাংক রাষ্ট্রীয় মালিকানায় পূবালী ব্যাংক-এ রূপান্তরিত হয়। পূর্ব বাংলার সদ্য জাগ্রত মধ্যবিত্ত বাঙালী মুসলমান ব্যবসায়ী ও শিল্প উদ্যোক্তাদের এগিয়ে নেয়ার ক্ষেত্রে এম খালেদের সিকি শতাব্দীর অবদান মূল্যায়ন করে বাংলাদেশ সরকার তাকে পূবালী ব্যাংকের প্রথম চেয়ারম্যান ও ব্যবস্থাপনা পরিচালকের দায়িত্ব প্রদান করেন। এম খালেদ সদ্য স্বাধীন দেশের ব্যাংক ব্যবস্থার উন্নয়নে অন্যতম অগ্রণী ব্যক্তিত্বরূপে তার মেধা ও মননের স্বাক্ষর রাখেন।

বাংলাদেশের সার্বিক ব্যাংক ব্যবস্থাকে এগিয়ে নেয়ার জন্য ১৯৮১ সালের ১৬ নভেম্বর তাকে বাংলাদেশ ব্যাংকের ডেপুটি গভর্নরের দায়িত্ব দেয়া হয়। এ উপলক্ষে বাংলাদেশ ব্যাংকের ঘরোয়া ম্যাগাজিন ব্যাংক পরিক্রমায় বিস্তারিত প্রতিবেদন প্রকাশ করা হয়। এম খালেদের যোগদানের আগে বাংলাদেশ ব্যাংকে মাত্র একজন ডেপুটি গভর্ণর কর্মরত ছিলেন। তিনি মো. খালিদ খান। 

এম খালেদ দীর্ঘ ৩২ বছর প্রচলিত ব্যাংক ব্যবস্থায় কর্মরত ছিলেন। তবে তিনি তার ব্যাংকিং জীবনের শুরু থেকেই সুদভিত্তিক ব্যাংক ব্যবস্থার পরিবর্তে  ইসলামী পদ্ধতির ব্যাংক ব্যবস্থার ব্যাপারে আগ্রহী এবং আস্থাশীল ছিলেন বলে তার বিভিন্ন বক্তব্য ও রচনা থেকে ধারণা পাওয়া যায়। ইসলামী ব্যাংক ব্যবস্থা সম্পর্কে তাঁর মধ্যে চিন্তার উন্মেষ ঘটে সেই প্রথম থেকেই।

ব্যাংকিং অভিজ্ঞতা বৃদ্ধির সাথে সাথে তিনি উপলব্ধি করেন যে, প্রচলিত ধারার ব্যাংকের বিনিয়োগে সমাজের উপর তলার কিছু লোকের কাছে সম্পদ জমা হচ্ছে। পাকিস্তান আমলের বাইশ পরিবারের পরিবর্তে বাংলাদেশে কিছু ধনী পরিবার সৃষ্টি হয়েছে। তার বিপরীতে সাধারণ মানুষের দুঃখ, বঞ্চনা ও শোষণ কমেনি, বরং উত্তরোত্তর বেড়েছে। সেই অনুশোচনা ও উপলব্ধি থেকেই তিনি অংশ নেন সুদমুক্ত ইসলামী ব্যাংক চালু করার কাজে।

চৌদ্দশ’ হিজরীর পহেলা মুহররম (২২ নভেম্বর ১৯৭৯ সালে) তার নেতৃত্বে প্রতিষ্ঠিত হয় ‘ওয়ার্কিং গ্রুপ ফর ইসলামিক ব্যাংকিং ইন বাংলাদেশ’। সোনালী ব্যাংক স্টাফ কলেজের তৎকালীন প্রিন্সিপ্যাল এম আযীযুল হক ছিলেন এ সংগঠনের আহ্বায়ক। এ সংগঠনে তখন অন্যান্যের মধ্যে ছিলেন বাংলাদেশ ব্যাংকের রিসার্চ এন্ড প্ল্যানিং বিভাগের ডাইরেক্টর এ এস এম ফখরুল আহসান ও সিনিয়র ডেপুটি চিফ অফিসার মো. শাহাদাতউল্লাহ, বাংলাদেশ ইনস্টিটিউট অব ব্যাংক ম্যানেজমেন্ট (বিআইবিএম)-এর ফ্যাকাল্টি মেম্বার এইচ এ সুফি, সোনালী ব্যাংকের এসিসট্যান্ট জেনারেল ম্যানেজার এ এইচ এম লুৎফর রহমান, পূবালী ব্যাংকের এসিসট্যান্ট জেনারেল ম্যানেজার জিল্লুর রহমান চৌধুরী, পূবালী ব্যাংক ট্রেনিং ইনস্টিটিউটের প্রিন্সিপ্যাল ফজলুল করিম খান, উত্তরা ব্যাংকের ইন্টারন্যাশনাল ডিভিশনের ম্যানেজার হুমায়ুন কবির, জনতা ব্যাংকের ইন্টারন্যাশনাল ডিভিশনের অফিসার আব্দুর রাজ্জাক, রূপালী ব্যাংকের ডেপুটি জেনারেল ম্যানেজার শাহ মোহাম্মদ আফানুর, রূপালী ব্যাংক ট্রেনিং ইনস্টিটিউটের প্রিন্সিপ্যাল মুস্তাফিদুল হুদা এবং অগ্রণী ব্যাংকের রিসার্চ এন্ড প্ল্যানিং ডাইরেক্টর খন্দকার ইবরাহীম খালেদ ও রিসার্চ অফিসার আব্দুল মালেক চৌধুরী। বাংলাদেশে ইসলামী ব্যাংকিং প্রতিষ্ঠায় ব্যাংকারদের মাঝে তারা ছিলেন অগ্রণী ব্যক্তিত্ব এবং ব্যাংকিং সেক্টরে এই পুরোধা ব্যক্তিদের নেতৃত্বে চলতে থাকে ইসলামী ব্যাংকিংয়ের প্রস্তুতি। 

ব্যাংকার এবং সাধারণ মানুষের মধ্যে ইসলামী ব্যাংকিংয়ের ধারণা প্রচারের জন্য প্রাথমিক অবস্থায় এই পুরোধা ব্যক্তিদের নেতৃত্বে বিভিন্ন স্থানে ইসলামী ব্যাংকিং বিষয়ক সেমিনার অনুষ্ঠিত হয়। এসব সেমিনারে এম খালেদ ইসলামী ব্যাংক প্রতিষ্ঠার স্বপ্ন ব্যক্ত করেন। ১৯৮০ সালের ১৫ ও ১৭ ডিসেম্বর ঢাকা টিচার্স ট্রেনিং কলেজ মিলনায়তনে ইসলামিক ইকনোমিকস্ রিসার্চ ব্যুরো আয়োজিত আন্তর্জাতিক ইসলামিক ব্যাংকিং সেমিনারের উদ্বোধনী অধিবেশনে তিনি সভাপতিত্ব করেন। বাংলাদেশ ব্যাংকের গভর্নর জনাব নূরুল ইসলাম প্রধান অতিথি হিসেবে এ সেমিনার উদ্বোধন করেন। গভর্নর তার ভাষণে বাংলাদেশে ইসলামী ব্যাংকিং প্রতিষ্ঠায় ইতিবাচক অগ্রগতির কথা ঘোষণা করেন। এ সেমিনারে সভাপতির ভাষণে এম খালেদ বলেন : “৩২ বছর আগে ব্যাংকিং ক্যারিয়ারের শুরুতে আমার স্বপ্ন ছিল আমার দেশ ইসলামী ব্যাংকিং প্রতিষ্ঠা করছে। জীবনের শেষ প্রান্তে এসে দেখছি এজন্য জোরালো পদক্ষেপ নেয়া হচ্ছে”।

বাংলাদেশ সরকারের অর্থ মন্ত্রণালয়ের ব্যাংকিং এন্ড ইনভেস্টমেন্ট ডিভিশনের ১৯৮১ সালের ৪ এপ্রিল তারিখের এক চিঠিতে কেন্দ্রীয় ব্যাংককে পরীক্ষামূলকভাবে সকল জেলায় সবগুলো বাণিজ্যিক  ব্যাংকের সব শাখায় একটি করে ইসলামী ব্যাংকিং কাউন্টার খুলতে এবং আলাদা হিসাব রাখতে নির্দেশ দেয়া হয়। এই পটভূমিতে ১৯৮১ সালের ১৩ এপ্রিল বাংলাদেশ ব্যাংকের গভর্নর এম নূরুল ইসলামের সভাপতিত্বে তখনকার ছয়টি সরকারি ও দুটি বিশেষায়িত ব্যাংকের প্রতিনিধিদের সমন্বয়ে কেন্দ্রীয় ব্যাংকের ব্যাংকার সভায় সিদ্ধান্ত হয় যে, দেশের মহানগর ও জেলা পর্যায়ের শাখাগুলিতে পরীক্ষামূলকভাবে ইসলামী ব্যাংকিং চালু হবে। এরপর পর্যায়ক্রমে সব শাখা  ইসলামীকরণ করা হবে। এম খালেদ তখনো পূবালী ব্যাংকের প্রধান নির্বাহী এবং ওয়ার্কিং গ্রুপ ফর ইসলামিক ব্যাংকিং ইন বাংলাদেশের প্রধান হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন।

অর্থ মন্ত্রণালয়ের চিঠি এবং বাংলাদেশ ব্যাংকের ব্যাংকার সভার সিদ্ধান্তের পটভূমিতে ইসলামী ব্যাংকিং বিষয়ে ব্যাংকারদের ওরিয়েন্টেশনের জন্য ওয়ার্কিং গ্রুপ ফর ইসলামিক ব্যাংকিং ইন বাংলাদেশের উদ্যোগে ইসলামী ব্যাংকিং এর উপর প্রথম প্রশিক্ষণ কোর্স অনুষ্ঠিত হয়।

১৯৮১ সালের ২৬ অক্টোবর থেকে ২৪ নভেম্বর পর্যন্ত সোনালী ব্যাংক স্টাফ কলেজে অনুষ্ঠিত সম্পূর্ণ আবাসিক এই প্রশিক্ষণ কর্মসূচি ছিল বাংলাদেশে ইসলামী ব্যাংকিং-এর এক ঐতিহাসিক মাইলফলক। পূবালী ব্যাংকের ম্যানেজিং ডাইরেক্টর এবং ওয়ার্কিং গ্রুপ ফর ইসলামিক ব্যাংকিং ইন বাংলাদেশের সভাপতি এম খালেদ এ ঐতিহাসিক প্রশিক্ষণ কার্যক্রমের উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে সভাপতিত্ব করেন।
এই প্রশিক্ষণ কোর্স চলাকালীন সময়েই এম খালেদ ১৬ নভেম্বর বাংলাদেশ ব্যাংকের ডেপুটি গভর্নর হিসেবে যোগদান করেন। এরপর তিনি কোর্সটির সমাপনী দিবসে বিশেষ অতিথি হিসেবে প্রশিক্ষণার্থীদের মাঝে সনদ বিতরণ করেন। অনষ্ঠানে বিশেষ অতিথির ভাষণে তিনি বলেন : “ইসলামী ব্যাংক ব্যবস্থা প্রচলিত ব্যবস্থার চেয়ে অনেক বেশি বাস্তবসম্মত। ইসলামী ব্যাংকিংয়ের সফলতার জন্য সবাইকে একসাথে কাজ করতে হবে”।

১৯৮২ সালের ১লা মার্চ ওয়ার্কিং গ্রুপ ফর ইসলামিক ব্যাংকিং ইন বাংলাদেশ নতুন নামে পুনর্গঠিত হয়। এম খালেদকে সভাপতি এবং এম আযীযুল হককে সেক্রেটারি করে গঠিত হয় বাংলাদেশ ইসলামিক ব্যাংকার্স এসোসিয়েশন (বিবা)। বিবা’র নির্বাহী কমিটিতে ছিলেন ভাইস প্রেসিডেন্ট এ এস এম ফখরুল আহসান, কোষাধ্যক্ষ মো. শহীদুল্লাহ, সদস্য এস এ হান্নান, এ এইচ এম লুৎফর রহমান, সিরাজুল ইসলাম আকন্দ, এম আব্দুর রহমান, মো. মোজাফফর, আব্দুল হাই, মোহাম্মদ হোসেন হাওলাদার, তাজুল ইসলাম, আতাহার উদ্দিন আহমেদ, জিয়াউদ্দিন আহমেদ ও শেখ বোরহান আলী। এ সংগঠনের শ্লোগান ঠিক করা হয় ‘বিবা টু ফাইট রিবা’। অর্থাৎ রিবা’র বিরুদ্ধে বিবা’র লড়াই। দেশের প্রথিতযশা ও উদ্যমি ব্যাংকারগণ এর সাথে যুক্ত হন। বিবার উদ্দেশ্য ছিল ব্যাংকিং খাত থেকে সুদের বিলোপ সাধন এবং  বাংলাদেশে ইসলামী ব্যাংকিং ব্যবস্থার নীতি ও পদ্ধতি প্রণয়ন এবং এ উদ্দেশ্য বাস্তবায়নে ব্যাংকার, গবেষক, প্রশিক্ষক, শিক্ষাবিদ, সংবাদকর্মী, বুদ্ধিজীবী ও উদ্যোক্তা তৈরি করা।  

ব্যাংকারদের সংগঠিত করা, প্রশিক্ষণদান ও প্রচারের জন্য বিবার কর্মীগণ নিজেদেরকে চারটি গ্রুপে ভাগ করেন। চারটি গ্রুপের নামকরণ করা হয় আবু বকর (রা.), ওমর (রা.), ওসমান (রা.) ও আলী (রা.)-এর নামে। আবু বকর ইউনিটের ২৯ জনের সদস্য তালিকার শীর্ষে ছিল এম খালেদের নাম। এই গ্রুপগুলোতে মোট ১১৪ জন সদস্য ছিলেন। ইসলামী ব্যাংকিংয়ে প্রথম পাটাতন নির্মাণের কর্মী হিসেবে তাদের অবদান আমরা কৃতজ্ঞতার সাথে স্মরণ করি। 

এম খালেদ ১৯৮২ সালের ৭ আগস্ট কেন্দ্রীয় ব্যাংক থেকে অবসর নিয়ে তাঁর পুরো সময় ইসলামী ব্যাংকিং বাস্তবায়নের কাজে নিয়োজিত করেন। ইসলামী ব্যাংকের ভিত্তি তৈরি করতে তিনি সরকারী বেসরকারী বিভিন্ন পর্যায়ে সংযোগ রক্ষা করেন এবং সকলকে এ কাজে উদ্বুদ্ধ ও উৎসাহিত করেন। 

এই সময়গুলোতে বাংলাদেশে ইসলামী ব্যাংকিংব্যবস্থা একটি গ্রহণযোগ্য পদ্ধতিরূপে পেশ করতে তার নেতৃত্বে বিবা’র কর্মীগণ স্বেচ্ছাকর্মীরূপে অত্যন্ত সক্রিয় ও সংগঠিত ভূমিকা পালন করেন।  এম খালেদ বিবা’র কর্মীদেরকে এবং  সর্বস্তরের লোকদের উদ্বুদ্ধ করতে প্রায়শ বলতেন : ‘আমি চৌত্রিশ বছর সুদভিত্তিক ব্যাংকিং-এ সম্পৃক্ত থেকে মানুষের জন্য কোন বড় কল্যাণ সৃষ্টি করতে পারিনি। ইসলামী ব্যাংক প্রতিষ্ঠার মাধ্যমেই জনগণকে ব্যাংকিংয়ের প্রকৃত সুফল দেয়া সম্ভব।’ তিনি সকলকে ইসলামী ব্যাংকিং-এর আবেদন ঘরে ঘরে ছড়িয়ে দেয়ার আহবান জানান। (চলবে ...)

দ্বিতীয় পর্ব পড়তে এখানে ক্লিক করুন।

লেখক: ব্যাংকার








Loading...
Loading...
এই ক্যাটেগরির আরো সংবাদ  
অনুসরণ করুন
     
সম্পাদক ও প্রকাশক : মোঃ মজিবুর রহমান চৌধুরী
স্বদেশ গ্লোবাল মিডিয়া লিমিটেড -এর পক্ষে প্রকাশক কর্তৃক সিটি পাবলিশিং লি, আর কে মিশন রোড, ঢাকা-১২০৩ থেকে মুদ্রিত ও ১০, তাহের টাওয়ার, গুলশান সার্কেল-২ থেকে প্রকাশিত।
ফোন: ৯৮৫১৬২০, ৮৮৩২৬৪-৬, ফ্যাক্স: ৮৮০-২-৯৮৯৩২৯৫। ই-মেইল : [email protected], [email protected]
🔝
close
অনুসরণ করুন
     
সম্পাদক ও প্রকাশক : মোঃ মজিবুর রহমান চৌধুরী
স্বদেশ গ্লোবাল মিডিয়া লিমিটেড -এর পক্ষে প্রকাশক কর্তৃক সিটি পাবলিশিং লি, আর কে মিশন রোড, ঢাকা-১২০৩ থেকে মুদ্রিত ও ১০, তাহের টাওয়ার, গুলশান সার্কেল-২ থেকে প্রকাশিত।
ফোন: ৯৮৫১৬২০, ৮৮৩২৬৪-৬, ফ্যাক্স: ৮৮০-২-৯৮৯৩২৯৫। ই-মেইল : [email protected], [email protected]
🔝
close