
‘অত নাটক করো না তো!”, “একদম হিস্টেরিক আচরণ!’- নারীর চোখের জল বা আবেগ যখন হাস্যরসের বিষয় হয়ে ওঠে, তখন প্রশ্ন জাগে—এই ‘হিস্টেরিয়া’ আসলে কী? এটি কি শুধুই একটি মানসিক রোগ, নাকি শতাব্দীর পর শতাব্দী ধরে নারীর কণ্ঠরোধের এক কৌশল?
হিস্টেরিয়ার উৎপত্তি‘হিস্টেরিয়া’ শব্দটি এসেছে প্রাচীন গ্রিক শব্দ hystera থেকে, যার অর্থ ‘জরায়ু’। হিপোক্রেটিস ও প্লেটোর মতো দার্শনিকরা বিশ্বাস করতেন, নারীর জরায়ু যদি ‘অপর্যাপ্ত যৌনতা’, ‘বিয়ের অনুপস্থিতি’ বা ‘সন্তান না হওয়া’র কারণে অসন্তুষ্ট হয়, তবে সেটি দেহের ভেতরে ঘুরে বেড়ায় এবং মানসিক ও শারীরিক অস্থিরতার জন্ম দেয়।
এই ধারণা থেকেই হিস্টেরিয়া “নারীদের রোগ” হিসেবে পরিচিতি পায়। নারীর আবেগ, কান্না, অজ্ঞান হয়ে যাওয়া কিংবা অস্বাভাবিক আচরণ—সবকিছুকে “জরায়ুর গোলযোগ” হিসেবে ব্যাখ্যা করা হতো।
চিকিৎসার নামে নিপীড়নমধ্যযুগে নারীর যেকোনো ‘অস্বাভাবিক’ আচরণকে মন্দ বা অশুভ শক্তির উপস্থিতি হিসেবে দেখা হতো। যদি কোনো নারী রাগ, বিষণ্নতা বা হতাশা প্রকাশ করতেন, তবে তাকে ‘ডাইনি’ আখ্যা দিয়ে পুড়িয়ে মারা হতো।
১৮ ও ১৯ শতকে, ফ্রয়েড হিস্টেরিয়ার মূল কারণ হিসেবে নারীর অবদমিত যৌনতা বা শৈশবের ট্রমাকে দায়ী করেন। তার মতে, ‘যৌনতা দমন’-এর ফলে নারীরা মানসিকভাবে বিপর্যস্ত হয়ে পড়েন এবং তাতে তাদের মধ্যে নানাবিধ শারীরিক ও মানসিক সমস্যা দেখা দেয়। তবে সমস্যার শিকড় ছিল আরও গভীরে—নারীর যেকোনো কষ্ট, প্রতিবাদ, আত্মবিশ্বাস বা স্বাধীন চিন্তাকে ‘রোগ’ আখ্যা দিয়ে তাকে চুপ করিয়ে দেওয়া হতো।
ফ্রয়েডের মনোসমীক্ষায় হিস্টেরিয়া ছিল একটি জটিল সাইকো-সামাজিক অবস্থা। তিনি বলেছিলেন, নারীরা যখন অবদমিত স্মৃতি ও অভিজ্ঞতা প্রকাশ করতে পারেন না, তখন তা হিস্টেরিয়ায় রূপ নেয়।
চিকিৎসার নামে চালানো নির্মম পদ্ধতি১৮ ও ১৯ শতকে নারীদের ‘হিস্টেরিয়া’ রোগের চিকিৎসার নামে নানারকম অত্যাচার করা হতো, যেমন:
ঠান্ডা পানির ঝাঁপটা (হাইড্রোথেরাপি): নারীদের ঠান্ডা পানিতে ডুবিয়ে ‘শান্ত’ করার চেষ্টা করা হতো।
জোর করে চিৎকার করানো: ‘অতিরিক্ত আবেগ’ দূর করতে।
হিপনোসিস: অবদমিত স্মৃতি মুক্ত করার জন্য।
জরায়ু অপসারণ: কিছু ক্ষেত্রে হিস্টেরিয়া কমাতে চিকিৎসকেরা নারীদের জরায়ু কেটে ফেলার সিদ্ধান্ত নিতেন—এটি ছিল ভয়াবহ ও ঝুঁকিপূর্ণ একটি পদ্ধতি।
নারী বলেই হিস্টেরিক?এক সময় পর্যন্ত চিকিৎসাবিজ্ঞান হিস্টেরিয়াকে শুধুই নারীর রোগ বলে মনে করত। ১৯৮০ সালের আগ পর্যন্ত DSM (Diagnostic and Statistical Manual of Mental Disorders)-এ হিস্টেরিয়াকে একটি স্বীকৃত মানসিক রোগ হিসেবে তালিকাভুক্ত করা ছিল, এবং সেটিকে নারীপ্রধান রোগ হিসেবে বিবেচনা করা হতো।
এই দৃষ্টিভঙ্গি আজও সমাজে প্রতিফলিত হয়। একজন নারী যদি প্রতিবাদ করেন, তাকে বলা হয় “ও তো হিস্টেরিক!” অথচ একই আচরণ পুরুষের ক্ষেত্রে হলে বলা হয়, “চাপে আছে” বা “টেনশনে আছে”।
আধুনিক যুগে হিস্টেরিয়ার রূপান্তরচিকিৎসাবিজ্ঞানের ভাষায় ‘হিস্টেরিয়া’ শব্দটি এখন আর ব্যবহার করা হয় না। চিকিৎসকেরা এখন এ ধরনের উপসর্গ বোঝাতে ব্যবহার করেন ‘Conversion Disorder’, ‘Somatization Disorder’, ‘Panic Disorder’, কিংবা ‘Histrionic Personality Disorder (HPD)’—যেগুলো বৈজ্ঞানিকভাবে নিরীক্ষিত ও শ্রেণিবদ্ধ মানসিক স্বাস্থ্য সমস্যা।
তবে শব্দটি বিলুপ্ত হলেও, নারীর প্রতি সমাজের দৃষ্টিভঙ্গিতে এর ছায়া এখনো রয়ে গেছে। নারীর কান্না ‘অতিরিক্ত আবেগ’, প্রতিবাদ ‘উগ্রতা’, আর চুপ থাকা মানেই ‘বিষণ্নতা’—এমন ধারণা এখনো প্রচলিত।
এ বাস্তবতায় প্রয়োজন সহানুভূতি, মনোযোগ ও মানসিক চিকিৎসা—যৌন ব্যাখ্যা বা উপহাস নয়।
বাংলাদেশের প্রেক্ষাপট: ধর্ম, সংস্কার ও নীরবতাবাংলাদেশের গ্রামীণ সমাজে এখনো হিস্টেরিয়াকে ‘জ্বিনে ধরা’, ‘আছর’ বা ‘বদ নজর’ হিসেবে দেখা হয়। মেয়েদের মানসিক অস্থিরতা দেখলে তাবিজ-কবচে চিকিৎসা করা হয়।
শহুরে আধুনিক সমাজেও এই মানসিকতার তেমন পরিবর্তন হয়নি। কোনো নারী যদি হতাশায় ভোগেন, কেউ না কেউ বলেই ফেলেন—“তুমি তো খুব সেনসিটিভ!” এই ধরনের মন্তব্য মানসিক স্বাস্থ্যের গুরুত্বকে ছোট করে তোলে।
“নারী মানেই আবেগপ্রবণ”—এই ধারণাটি চিকিৎসা, ধর্ম, সমাজ ও পরিবার—সব জায়গা থেকেই নারীর উপর চাপিয়ে দেওয়া হয়েছে। ‘হিস্টেরিয়া’ ছিল সেই পুরনো, বৈষম্যমূলক এবং ভুল দৃষ্টিভঙ্গির প্রতীক।
এখন সময় এসেছে এই ট্যাগ ছুঁড়ে ফেলে, নারীর মানসিক স্বাস্থ্য নিয়ে মানবিক আলোচনার দরজা খোলার। নারীর কান্না, চিৎকার কিংবা নিঃশব্দে চুপ থাকা—এসব কোনো অসুস্থতার প্রতীক নয়, বরং তার অনুভূতি, অস্তিত্ব ও প্রতিবাদের ভাষা। যা বোঝার জন্য প্রয়োজন—সহানুভূতিশীল ও মানবিক দৃষ্টিভঙ্গি।
স্বদেশ প্রতিদিন/এনআর