
চাঁদপুরের মতলব উত্তর উপজেলার ধনাগোদা নদীতে দীর্ঘদিন যাবৎ অবৈধ ভাবে বালি উত্তোলনের কারনে ষাটনল, কালিপুর থেকে কালির বাজার পর্যন্ত দীর্ঘ ৫ কিলোমিটার অঞ্চল হুমকির মুখে পরেছে।
অবৈধ এই বালি উত্তোলনের কারণে কয়েকটি এলাকায় ও ধনাগোদা নদীর তীরবর্তী অঞ্চলে ব্যাপক ভাঙ্গন দেখা দিয়েছে। এতে হুমকির মুখে পরেছে দেশের দ্বিতীয় বৃহৎ মেঘনা ধনাগোদা সেচ প্রকল্পসহ গুরুত্বপূর্ন বিভিন্ন স্থাপনা। এ অবস্থায় স্থানীয় লোকজন আতঙ্কে দিন কাটাচ্ছে।
এছাড়াও ষাটনল সংলগ্ন মেঘনা নদী থেকে ধনাগোদা নদীর প্রবেশমূখের চরকালিপুরা ও ষোলআনী এলাকা মুন্সিগঞ্জ জেলা প্রশাসনের মাধ্যমে বালিউত্তোলনের জন্য ইজারা দিচ্ছে। যা মতলবের সীমানা ঘেষা হওয়ায় ষাটনল, কালিপুর, বেলতলীসহ বেশ কিছু অঞ্চলে নদী ভাঙ্গনের ক্ষেত্রে আরো বেশী হুমকির কারন হয়ে দাড়াতে পারে বলে জানান স্থানীয় ওই অঞ্চলের জনপ্রতিনিধিসহ বিভিন্ন পেশার মানুষ।
এই ধনাগোদা নদী অঞ্চলে অবৈধ বালি উত্তোলনকারীদের বিরুদ্ধে গত ডিসেম্বর থেকে মার্চ পর্যন্ত ৪ মাসের ৪টি অভিযানে ১৭টি ড্রেজার, ১১টি বাল্কহেড, ২টি স্পিডবোট, ২টি ইঞ্জিন চালিত নৌকাসহ ৪০ জনকে আটক করা হয়।
এছাড়াও উপজেলার ষাটনল অঞ্চল দিয়ে ভয়াবহ মেঘনা নদী থেকে শাখা নদী ধনাগোদা নদীটি মতলব উত্তর ও গজারিয়া উপজেলার মধ্যখান দিয়ে প্রবাহিত। কম প্রশস্ততার এই ধনাগোদা নদীর ষাটনল, কালিপুর, চান্দ্রাকান্দি, বেলতলী, কালির বাজার, নবীপুর, হাপানিয়ার বেশ কয়েকটি স্পটে নদীর ভাঙ্গন দেখা গেছে।
স্থানীয় বিভিন্ন শ্রেণী পেশার মানুষের সাথে কথা বলে জানা যায়, ভাঙ্গন কবলিত এই ৫ কিলোমিটার অঞ্চলে দীর্ঘদিন যাবৎ ৩০ থেকে ৩৫টি ড্রেজার দিয়ে দিনে রাতে অবৈধভাবে বালি উত্তোলন হয়ে আসছে। প্রশাসনিক তৎপরতা থাকলে দিনের বেলায় কখনো কখনো বালি উত্তোলন বন্ধ থাকলোও রাতের বেলা সশস্ত্র পাহারায় এই নদী থাকে প্রভাবশালী বালি উত্তোলনকারীদের দখলে। এই প্রভাবশালী বালি উত্তোলনকারীদের বিরুদ্ধে প্রতিবাদ করা তো দূরের কথা এ অঞ্চলের মানুষরা তাদের বিষয়ে কথা বলতে পর্যন্ত ভয় পায়।
অবৈধ বালিকাটার প্রতিবাদে মতলব উত্তর থানার সামনে গত ২৯ ডিসেম্বর সকালে একটি মানববন্ধনের ডাকদিলে অদৃশ্য প্রভাবে সেই মানববন্ধন হওয়ার আগের রাতে মানববন্ধন স্থগিত করা হয়। তবে দুটি সংগঠন সেই ডাকে সারা না দিয়ে সাহস করে থানার সামনে এসে মানববন্ধনের প্রস্তুতি নিলে স্থানীয় প্রভাবশালী কিছু লোকের আক্রমণে মানববন্ধনে আগতরা আত্মরক্ষায় পালিয়ে যেতে বাধ্য হয়। এসময় ভিপি নূরের গন অধিকার পরিষদের ছাত্র সংগঠন ছাত্র অধিকার পরিষদ কেন্দ্রীয় কমিটির সহ-সভাপতি ইসমাঈল হোসেন ও চাঁদপুর জেলা ছাত্র অধিকার পরিষদের সভাপতি জিএম মানিকসহ বেশ কয়েকজন আহত হয়।
ধনাগোদা নদী পাড়ের স্থানীয় বিভিন্ন শ্রেণী পেশার মানুষের সাথে কথা বলে জানা যায়, এই নদীতে অবৈধ বালি উত্তোলনের আধিপত্যকে কেন্দ্র করে গত বছরের ২২ অক্টোবর মঙ্গলবার সকালে অবৈধ বালি উত্তোলনকারী ও নৌ ডাকাত সরদার বাবলা বাহিনীর প্রধান বাবলা (৪২)কে ফিল্মি স্টাইলে খুন করা হয়। ফলে এখন এই অঞ্চলের অবৈধ বালি উত্তোলন গুয়াগাছিয়া অঞ্চলের নয়ন ও রিপন বাহিনীর শতভাগ নিয়ন্ত্রণে। আর বাবলা বাহিনীর প্রধান বাবলাকে হত্যা মামলায় এই নয়ন ও রিপনকে আসামী করা হয়েছে।
ষাটনল ইউপি চেয়ারম্যান ফেরদাউস আলম সরকার জানায়, এই ধনাগোদা নদীতে অবৈধ বালি উত্তোলনের কারণে ষাটনল ইউনিয়নের ষাটনল, কালিপুর সহ কয়েকটি অঞ্চল ব্যাপক ভাঙ্গন দেখা দিয়েছে। তাই অবৈধ বালি উত্তোলন বন্ধসহ পাশ্ববর্তী এলাকায় বালি মহলের নামে ইজারা দেয়া যা মতলবের জন্য খুবই হুমকির ও আতংকের।
কথা হলে খাগুরিয়া গ্রামের বাসিন্দা ও উপজেলা বিএনপির সাংগঠনিক সম্পাদক মিয়া মঞ্জুর আমীন স্বপন জানায়, ধনাগোদা নদীর ভাঙ্গনে খাগুরিয়া, হাপানিয়া ও নবীপুর এলাকার অনেক পরিবার ইতিমধ্যে জমি হারিয়ে পথে বসেছে। এমনকি মেঘনা ধনাগাদা বেড়ী বাঁধটিও ঝুঁকিতে রয়েছে।
এ বিষয়ে মেঘনা ধনাগোদা পানি ফেডারেশনের সভাপতি রাসেল ফয়েজ আহমেদ চৌধুরী শহীন জানান, এই ধনাগোদা নদীদে অবৈধ বালি উত্তোলনের কারনে দেশের দিত্বীয় বৃহৎ ধনাগোদা সেচ প্রকল্প আজ হুমকির মুখে। ধনাগোদা সেচ প্রকল্প ধনাগোদা নদীর তীরবর্তী কয়েকটি অঞ্চলে বাড়ী ঘর ও ফসলী জমি নদী ভাঙ্গনে বিলীন হচ্ছে।
মেঘনা-ধনাগোদা সেচ প্রকল্পের নির্বাহী প্রকৌশলীর মো. সেলিম শাহেদ বলেন, ‘ধনাগোদা নদীর কালিপুর, খাগুরিয়া, হাপানিয়া, নবীপুরসহ কয়েকটি অঞ্চলে ভাঙ্গন দেখা দিলে আমরা তাৎক্ষণিক প্রতিরক্ষামূলক ব্যবস্থা নেই। তবে নদীর তীর ও সেচ প্রকল্প বাঁধ রক্ষায় ধনাগোদা নদীতে অবৈধ বালি উত্তোলন বন্ধের বিষয়ে আমরা লিখিত অভিযোগ জানাবো।
এ বিষয়ে মতলব উত্তর উপজেলা নির্বাহী অফিসার মাহমুদা কুলসুম মনি বলেন, ‘ধনাগোদা নদীতে অবৈধ বালি কাটার বিরুদ্ধে আমরা অভিযান করছি। ধনাগোদা সেচ প্রকল্প ও এর তীর রক্ষায় এই নদীতে অবৈধ বালি কাটার বিরুদ্ধে আমাদের অভিযান অভ্যহত থাকবে।’
স্বদেশ প্রতিদিন/এমএম