বিঘাপ্রতি উৎপাদন খরচ ২৪ হাজার টাকা, ধান বিক্রি করে মিলছে ১৬-২১ হাজার; বাড়তি শ্রমিকের মজুরি ও কম বাজারদরে দিশেহারা চাষিরা

মাঠজুড়ে পাকা ধানের সোনালি আভা। কোথাও শুরু হয়েছে ধান কাটা, কোথাও চলছে ফসল ঘরে তোলার প্রস্তুতি। সারা বছরের পরিশ্রমের ফসল ঘরে তুলতে ব্যস্ত সময় পার করছেন সাতক্ষীরার কৃষকরা। কিন্তু ধানের সোনালি শিষে হাসি নেই কৃষকের মুখে। বরং উৎপাদন খরচ তুলতে না পারার শঙ্কায় দুশ্চিন্তায় দিন কাটছে তাদের। সার, কীটনাশক, সেচ, জ্বালানি ও শ্রমিকের মজুরি বেড়ে যাওয়ায় ধান উৎপাদনে খরচ বেড়েছে কয়েক গুণ। অথচ সেই তুলনায় বাড়েনি ধানের বাজারদর। ফলে ফসল ঘরে তোলার আগেই লোকসানের হিসাব কষছেন কৃষকরা।
কৃষকদের ভাষ্য, গত বছরের তুলনায় এবার ধান উৎপাদনের খরচ প্রায় দ্বিগুণ হয়েছে। প্রতি বিঘা জমিতে ধান উৎপাদনে খরচ হচ্ছে ২৩ থেকে ২৪ হাজার টাকা। অথচ এক বিঘা জমিতে গড়ে ১০ থেকে ১২ বস্তা ধান পাওয়া যাচ্ছে। প্রতিটি বস্তায় ৬০ কেজি হিসাবে মোট উৎপাদন হচ্ছে ৬০০ থেকে ৭২০ কেজি। বর্তমানে প্রতি ৬০ কেজির বস্তা ধান বিক্রি হচ্ছে ১ হাজার ৬০০ থেকে ১ হাজার ৮০০ টাকায়। এতে এক বিঘা জমির ধান বিক্রি করে আয় হচ্ছে প্রায় ১৬ হাজার থেকে ২১ হাজার টাকা। অর্থাৎ উৎপাদন খরচ বাদ দিলে অনেক কৃষকেরই লোকসানের আশঙ্কা রয়েছে।
সাতক্ষীরা সদর উপজেলার নারানজোল গ্রামের কৃষক আজারুল ইসলাম বলেন, প্রতি বিঘা জমিতে এবার ধান উৎপাদনে খরচ হচ্ছে প্রায় ২৪ হাজার টাকা। এক বিঘা জমিতে গড়ে ১০ থেকে ১২ বস্তা ধান পাওয়া যায়। প্রতিটি বস্তায় ৬০ কেজি ধান থাকে। বর্তমানে প্রতি বস্তা ধান বিক্রি হচ্ছে ১ হাজার ৬০০ থেকে ১ হাজার ৮০০ টাকায়। এ দামে ধান বিক্রি করে উৎপাদন খরচ তোলাই সম্ভব হচ্ছে না। এমনকি ধানের পাশাপাশি খড় (বিচালি) বিক্রি করেও খরচের টাকা ওঠানো কঠিন। তিনি আক্ষেপ করে বলেন, সারা বছর এত কষ্ট করে চাষাবাদ করি, অথচ ফসল বিক্রি করে খরচই তুলতে পারছি না। তাহলে সারা বছর খাব কী, সংসার চালাব কীভাবে? এভাবে চলতে থাকলে না খেয়ে দিন কাটাতে হবে। একসময় বাধ্য হয়ে চাষাবাদই বন্ধ করে দিতে হবে।
কৃষক পলাশ হোসেন বলেন, ধান কাটা ও ঘরে তোলার সময় শ্রমিকের পেছনে বড় অঙ্কের টাকা ব্যয় করতে হচ্ছে। এক বিঘা জমির ধান কেটে বেঁধে দিতে শ্রমিক খরচ হচ্ছে প্রায় ৩ হাজার টাকা। সকাল ৭টা থেকে দুপুর ১২টা পর্যন্ত পাঁচ ঘণ্টার কাজের জন্য একজন শ্রমিককে দিতে হচ্ছে ৫০০ টাকা। বিকেলের পালায় একই সময়ের কাজের জন্য মজুরি ৩০০ টাকা।
তিনি আরও বলেন, ধানের পুরো মৌসুমে একজন পুরুষ শ্রমিককে সকাল-বিকেল দুই বেলা মোট আট ঘণ্টা কাজের জন্য দৈনিক ৮০০ টাকা দিতে হচ্ছে। অন্যদিকে একজন নারী শ্রমিক সাত ঘণ্টা কাজের জন্য পাচ্ছেন ৭০০ টাকা। শ্রমিকের মজুরি বেড়ে যাওয়ায় কৃষকের উৎপাদন খরচ আরও বাড়ছে।
কলারোয়া উপজেলার কৃষক আতাউর রহমান বলেন, গত বছরের তুলনায় উৎপাদন খরচ প্রায় দ্বিগুণ হলেও ধানের বাজারমূল্য বেড়েছে মাত্র ১০০ টাকা। এভাবে উৎপাদন ব্যয় বাড়তে থাকলে কৃষিকাজ করে সংসার চালানো কঠিন হয়ে পড়বে। অনেক কৃষক ঋণ নিয়ে চাষাবাদ করেন। ধান কাটার পর ঋণ পরিশোধ ও সংসারের প্রয়োজন মেটাতে বাধ্য হয়ে প্রচলিত বাজারদরেই ফসল বিক্রি করতে হয়। এতে ন্যায্য দাম পাওয়ার অপেক্ষা করার সুযোগ থাকে না।
ধান ব্যবসায়ী আরিজুল ইসলাম বলেন, চাতালে ধানের চাহিদা কম। যে দামে বিক্রি করতে পারব, সে হিসাবেই ধান কিনতে হবে। চাহিদা না থাকায় ধান কিনে কী করব, সেটাই ভাবছি। ব্যবসায়ীদের গোডাউনেও এখনো প্রচুর ধান মজুত রয়েছে। ফলে বাজারে ধানের চাহিদা ও দাম—দুটিই কম।
কৃষকদের দাবি, উৎপাদন খরচ বিবেচনায় ধানের ন্যায্যমূল্য নিশ্চিত করতে সরকারিভাবে ধান সংগ্রহ কার্যক্রম জোরদার করতে হবে। পাশাপাশি প্রকৃত কৃষকের কাছ থেকে সরাসরি ধান কেনার ব্যবস্থা করতে হবে। তা না হলে উৎপাদন বাড়লেও কৃষকের আর্থিক সংকট কাটবে না।
সাতক্ষীরা কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের উপপরিচালক (ভারপ্রাপ্ত) কৃষিবিদ ইকবাল আহমেদ বলেন, এবার সাতক্ষীরা জেলায় ৯৯ হাজার ১৬০ হেক্টর জমিতে আমন ধানের আবাদ হয়েছে, যা লক্ষ্যমাত্রার চেয়ে ১০ হেক্টর বেশি। অনুকূল বৃষ্টিপাতের কারণে কৃষকদের সেচ খরচ কমেছে। তবে প্রতি বিঘায় ধান উৎপাদনে খরচ হয়েছে ২৩ থেকে ২৪ হাজার টাকা।
তিনি বলেন, এবার প্রতি হেক্টরে গড়ে ৪ দশমিক ৪৭ টন ধান উৎপাদনের লক্ষ্যমাত্রা রয়েছে। সব মিলিয়ে প্রায় ৪ লাখ ৩ হাজার টন ধান উৎপাদনের আশা করছে কৃষি বিভাগ। কৃষকের উৎপাদন খরচ বিবেচনায় প্রতি কেজি ধান ৩৫ টাকায় বিক্রি করতে না পারলে তারা লাভবান হতে পারবেন না। এর কম দামে বিক্রি করলে লোকসানে পড়ার আশঙ্কা রয়েছে। তবে ধানের পাশাপাশি খড় বিক্রি করে কিছুটা ক্ষতি পুষিয়ে নেওয়ার সুযোগ রয়েছে।