
ঠাকুরগাঁওয়ে প্রশাসনের কঠোর হুঁশিয়ারি ও আইন-কানুনকে উপেক্ষা করে টাঙ্গন নদীতে চলছে অবৈধভাবে বালু উত্তোলনের মহোৎসব। জেলার রুহিয়া এলাকার ঢোলারহাট ও রাজাগাঁও ইউনিয়নসংলগ্ন নদী থেকে দিন-রাত সমানতালে বালু তোলার অভিযোগ উঠেছে স্থানীয় একটি প্রভাবশালী মহলের বিরুদ্ধে। এতে একদিকে নদীর স্বাভাবিক গতিপ্রকৃতি ও পরিবেশ হুমকির মুখে পড়ছে, অন্যদিকে ভাঙনের আশঙ্কায় উদ্বিগ্ন হয়ে পড়েছেন নদীতীরবর্তী এলাকার বাসিন্দা ও কৃষকেরা।
স্থানীয়দের অভিযোগ, প্রভাবশালী একটি মহলের ছত্রছায়ায় দীর্ঘদিন ধরে এই অবৈধ বালু উত্তোলন চলছে। প্রশাসনের সংশ্লিষ্ট দপ্তর ও থানার কাছাকাছি এলাকায় এমন কর্মকাণ্ড চললেও কার্যকর পদক্ষেপের দৃশ্যমানতা নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন তাঁরা।
স্থানীয় সূত্রে জানা গেছে, টাঙ্গন নদীর যেসব স্থান থেকে অবৈধভাবে বালু উত্তোলনের অভিযোগ উঠেছে, সেসব স্থানের কাছেই রয়েছে থানা ও উপজেলা প্রশাসনের কার্যালয়। বিষয়টি সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষকে জানানো হয়েছে বলেও দাবি স্থানীয়দের। তবে তাঁদের অভিযোগ, এরপরও বালু উত্তোলন বন্ধে দৃশ্যমান কার্যকর উদ্যোগ চোখে পড়ছে না।
এলাকাবাসীর প্রশ্ন, প্রশাসনের কঠোর অবস্থানের ঘোষণা থাকা সত্ত্বেও কীভাবে প্রকাশ্যে নদী থেকে বালু উত্তোলন চলছে? কারা এই কর্মকাণ্ডের সঙ্গে জড়িত এবং তাঁদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিতে বিলম্বের কারণ কী—তা খতিয়ে দেখার দাবি জানিয়েছেন তাঁরা।
৫ আগস্ট-পরবর্তী রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের সুযোগে স্থানীয় একটি প্রভাবশালী গোষ্ঠী অবৈধ বালু উত্তোলনের নিয়ন্ত্রণ নিয়েছে বলে অভিযোগ উঠেছে। রাজনৈতিক পরিচয় ও প্রভাব খাটিয়ে বালু ব্যবসার নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা এবং সাধারণ মানুষকে ভয়ভীতি দেখানোর অভিযোগও করেছেন স্থানীয়রা। তবে এসব অভিযোগের স্বাধীন সত্যতা যাচাই করা সম্ভব হয়নি। নাম প্রকাশ না করার শর্তে একাধিক বালু ব্যবসায়ী দাবি করেন, বালুঘাট পরিচালনার জন্য তাঁরা প্রভাবশালী নেতাদের কয়েক লাখ টাকা দিয়েছেন। কেন টাকা দিয়েছেন, এমন প্রশ্নের জবাবে তাঁরা বলেন, টাকা না দিলে হামলা-মামলার হুমকি দেওয়া হয়।
অবৈধভাবে বালু উত্তোলনের ফলে নদীর স্বাভাবিক প্রবাহ ও তীরের স্থিতিশীলতা ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে। স্থানীয়দের দাবি, ইতোমধ্যে নদীভাঙনে বহু কৃষিজমি ও গাছপালা নদীগর্ভে বিলীন হয়েছে। বর্ষা মৌসুমে ভাঙন আরও বাড়তে পারে—এমন আশঙ্কায় দিন কাটাচ্ছেন নদীতীরবর্তী বাসিন্দারা। এ ছাড়া অতিরিক্ত বালুবাহী ট্রাক্টর চলাচলের কারণে গ্রামীণ সড়ক ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে বলে অভিযোগ রয়েছে। রাস্তায় ছড়িয়ে পড়া বালু ও ধুলাবালুর কারণে স্থানীয় বাসিন্দাদের, বিশেষ করে শিশু ও বয়স্কদের, স্বাস্থ্যঝুঁকিও বাড়ছে।
স্থানীয়দের আশঙ্কা, দ্রুত অবৈধ বালু উত্তোলন বন্ধ করা না হলে নদীর পরিবেশ, কৃষিজমি, বসতবাড়ি ও যোগাযোগব্যবস্থার ক্ষতি আরও বাড়তে পারে।
এলাকাবাসী অবিলম্বে টাঙ্গন নদী থেকে অবৈধভাবে বালু উত্তোলন বন্ধ, অভিযোগের নিরপেক্ষ তদন্ত এবং জড়িত ব্যক্তিদের আইনের আওতায় আনার দাবি জানিয়েছেন। একই সঙ্গে নদী ও নদীতীরের ক্ষয়ক্ষতি নিরূপণ করে প্রয়োজনীয় প্রতিরোধমূলক ব্যবস্থা নেওয়ার আহ্বান জানিয়েছেন তাঁরা। তাঁদের দাবি, শুধু আশ্বাস নয়, নিয়মিত নজরদারি ও কার্যকর অভিযান পরিচালনার মাধ্যমে নদী রক্ষা করতে হবে। অন্যথায় তাঁরা বৃহত্তর আন্দোলনে যাওয়ার হুঁশিয়ারি দিয়েছেন।
এ বিষয়ে রুহিয়া উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) আলাউদ্দিন বলেন, “অবৈধ বালু উত্তোলনের বিষয়ে আমাদের অবস্থান জিরো টলারেন্স। সুনির্দিষ্ট অভিযোগ পেলে এবং প্রমাণ সাপেক্ষে দ্রুত আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া হবে।”
তবে স্থানীয় বাসিন্দাদের অভিযোগ, প্রশাসনের এমন আশ্বাসের পরও তাঁরা এখন পর্যন্ত প্রত্যাশিত কার্যকর পদক্ষেপ দেখতে পাচ্ছেন না। টাঙ্গন নদীকে অবৈধ বালু উত্তোলনের ক্ষতি থেকে রক্ষা করতে প্রশাসন দ্রুত কার্যকর ব্যবস্থা নেয় কি না, এখন সেটিই দেখার বিষয়।
স্বদেশ প্রতিদিন/এফএইচ