মঙ্গলবার ● ৬ অক্টোবর ২০২৬
   
শিরোনাম:
● রূপগঞ্জে জনস্বাস্থ্য নিয়ে আতঙ্ক      ● জাকারিয়া হত্যার প্রতিবাদে শিক্ষার্থীদের মানববন্ধন      ● বস্তিবাসীর নিরাপদ ও জলবায়ু-সহনশীল আবাসনের দাবি      ● ফ্যামিলি কার্ডে দারিদ্র্য থেকে মুক্ত হতে পারে সাড়ে ২৮ লাখ মানুষ      ● ৪৯তম বিসিএস থেকে আরও ৪০ জন নিয়োগ      ● শেষ ম্যাচের আগে মেসির আবেগঘন বার্তা      ● বিশ্ব টেস্ট চ্যাম্পিয়নশিপে ফাইনালের স্বপ্ন বাংলাদেশের      ● সিইসির পদত্যাগের দাবিতে দিল্লিতে বিরোধীদের মিছিল      ● ড্রোন হামলার পর জাহাজে আগুন, পরে ডুবে যায়      ● প্রেমিকের মৃত্যুর পর প্রেমিকারও মৃত্যু      ● চাঁপাইনবাবগঞ্জে ডেঙ্গুতে ব্যবসায়ীর মৃত্যু      ● ৮৫ বছর বয়সে প্রথমবার বিরোধীদল জামায়াত: শেখ রবিউল      
রূপগঞ্জে জনস্বাস্থ্য নিয়ে আতঙ্ক
শাহেল মাহমুদ, রূপগঞ্জ
প্রকাশ: মঙ্গলবার, ৬ অক্টোবর, ২০২৬, ২:৪৭ পিএম আপডেট: ০৬.১০.২০২৬ ৩:০২ PM

নারায়ণগঞ্জের রূপগঞ্জ উপজেলার মুড়াপাড়া ইউনিয়নের মঙ্গলখালী এলাকায় ওয়াটা কেমিক্যালস লিমিটেডে ১৫০ দশমিক ৮৯ মেট্রিক টন মেয়াদোত্তীর্ণ ও ব্যবহার অনুপযোগী বিপজ্জনক রাসায়নিক ধ্বংসের জন্য আনা হয়েছে। এসব রাসায়নিকের মধ্যে রয়েছে সালফিউরিক অ্যাসিড, নাইট্রিক অ্যাসিড, মিথানল ও থিনার। এদিকে কারখানাটির বিষাক্ত গ্যাসে দীর্ঘদিন ধরে স্থানীয়রা স্বাস্থ্যঝুঁকিতে রয়েছেন বলে অভিযোগ থাকায় নতুন করে জনস্বাস্থ্য ও পরিবেশ নিয়ে আতঙ্ক তৈরি হয়েছে।

স্থানীয়দের অভিযোগ, ঘনবসতিপূর্ণ এলাকায় অবস্থিত ওয়াটা কেমিক্যালসের গ্যাসে মঙ্গলখালী, কাটাখালী, মোকিবনগর, পাবই, ঠাঁকুরবাড়ীরটেক ও বানিয়াদি এলাকার মানুষ বিভিন্ন সময় অসুস্থ হয়েছেন। একই সঙ্গে গবাদি পশু ও মাছ মারা যাওয়া এবং ফসলি জমি ও গাছপালার ক্ষতির অভিযোগও রয়েছে।

স্থানীয় বাসিন্দাদের দাবি, প্রায় দেড় দশক ধরে কারখানাটি থেকে বিভিন্ন সময় গ্যাস ও ধোঁয়া নির্গত হচ্ছে। এ নিয়ে এলাকাবাসী কারখানা সরিয়ে নেওয়ার দাবিতে মানববন্ধন, বিক্ষোভসহ বিভিন্ন কর্মসূচি পালন করেছেন এবং জনপ্রতিনিধি ও প্রশাসনের কাছে আবেদন জানিয়েছেন। তবে এখনো কারখানাটি সরানো হয়নি।

২০১৭ সালের ৫ জুলাই কারখানাটির গ্যাস লাইন ছিদ্র হয়ে নারী-শিশুসহ অর্ধশতাধিক মানুষ অসুস্থ হওয়ার ঘটনা ঘটে বলে স্থানীয়রা জানান। ২০১৯ সালের ৫ জুলাইও কারখানার বিষাক্ত গ্যাসে নারী, পুরুষ ও শিশুসহ অর্ধশতাধিক মানুষ অসুস্থ হওয়ার কথা জানা যায়। ২০২০ সালের ৭ জুলাই মঙ্গলখালী এলাকায় প্রায় অর্ধশতাধিক শিশু-কিশোর, নারী ও বৃদ্ধ অসুস্থ হওয়ার অভিযোগ ওঠে। এর প্রতিবাদে স্থানীয়রা বিক্ষোভ করেন। পরে ২০২২ সালের ৭ আগস্টও কারখানা থেকে নির্গত গ্যাসে নারী ও শিশুসহ অন্তত সাতজন অসুস্থ হওয়ার অভিযোগ পাওয়া যায়।

মঙ্গলখালীর বাসিন্দা জামান মিয়া বলেন, ‘প্রায়ই কারখানাটি থেকে গ্যাস ছাড়ার পর বুক জ্বালাপোড়া করে, মাথাব্যথা ও শ্বাসকষ্ট হয়। গ্যাসের কারণে আশপাশের পরিবেশেরও মারাত্মক ক্ষতি হচ্ছে।’

স্থানীয় বাসিন্দা সুলতানা বেগম বলেন, ‘ওয়াটা কেমিক্যালের গ্যাসে প্রায়ই এলাকাবাসী অসুস্থ হয়ে পড়ে। জমির ফসলসহ গাছপালা মরে যায়। প্রতিবাদ করলে মালিকপক্ষের লোকজন নানা ভাবে হুমকি দেয়।’

নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক এক বাসিন্দার অভিযোগ, বিষাক্ত গ্যাসের বিষয়ে প্রতিবাদ করায় কয়েক বছর আগে তাকে ও আরও পাঁচজনের বিরুদ্ধে দুই কোটি টাকার চাঁদাবাজি মামলা করে কারখানা কর্তৃপক্ষ। এ কারণে এখন তারা প্রতিবাদ করতে সাহস পান না।

এদিকে এসব অভিযোগের মধ্যেই চট্টগ্রাম বন্দরে দীর্ঘ প্রায় দুই যুগ ধরে পড়ে থাকা ১৫০ দশমিক ৮৯ মেট্রিক টন বিপজ্জনক ও মেয়াদোত্তীর্ণ রাসায়নিক ধ্বংসের জন্য রূপগঞ্জের ওয়াটা কেমিক্যালসে পাঠানো হয়েছে।



চট্টগ্রাম কাস্টমস হাউস সূত্র জানায়, নয়টি কনটেইনারে ২৫ দশমিক ৫৫ টন সালফিউরিক অ্যাসিড, ৫০০ কেজি নাইট্রিক অ্যাসিড, ৯২ দশমিক ৫৪ টন মিথানল এবং ৩২ দশমিক ৩০ টন থিনার রয়েছে। বন্দরের নিরাপত্তা জোরদার এবং দীর্ঘদিন ধরে পড়ে থাকা কনটেইনারের কারণে সৃষ্ট জট কমাতে গত ৩ অক্টোবর সকাল ১০টা থেকে এসব কনটেইনার সরানোর কার্যক্রম শুরু হয়।

চট্টগ্রাম কাস্টমস হাউসের সহকারী কমিশনার মোহাম্মদ রাসেল আহমেদ বলেন, বাংলাদেশ ন্যাশনাল অথরিটি ফর কেমিক্যাল উইপনস কনভেনশনের (BNACWC) সুপারিশের ভিত্তিতে নিরাপদে ধ্বংস করার জন্য এসব বিপজ্জনক রাসায়নিক সরিয়ে নেওয়া হয়েছে।

তিনি বলেন, ‘নয়টি কনটেইনারে থাকা বিপজ্জনক রাসায়নিক ধ্বংসের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে চট্টগ্রাম বন্দরের নিরাপত্তা নিশ্চিত এবং কনটেইনার জট কমানোর লক্ষ্যে। কাস্টমসের ধ্বংস কমিটির সদস্যদের উপস্থিতিতে পুলিশি পাহারায় কনটেইনারগুলো চট্টগ্রাম বন্দর থেকে নারায়ণগঞ্জের উদ্দেশে পাঠানো হয়।’

রাসেল আহমেদ আরও বলেন, রূপগঞ্জের মুরাপাড়ায় ওয়াটা কেমিক্যালস লিমিটেড পরিবেশবান্ধব ও আইনসম্মত প্রক্রিয়ায় এসব রাসায়নিক ধ্বংস করবে। এ কার্যক্রমে চট্টগ্রাম বন্দর কর্তৃপক্ষ, চট্টগ্রাম মেট্রোপলিটন পুলিশ, চট্টগ্রাম জেলা প্রশাসন, ফায়ার সার্ভিস ও সিভিল ডিফেন্স, বিজিবি, বিসিএসআইআর, বিস্ফোরক অধিদপ্তর, পরিবেশ অধিদপ্তর এবং আনসার ব্যাটালিয়ন সহযোগিতা করছে।

বন্দর সূত্র জানায়, দীর্ঘদিন ধরে মোট ২৯টি রাসায়নিকবাহী কনটেইনার চট্টগ্রাম বন্দরে আটকে রয়েছে। বিপজ্জনক এসব রাসায়নিক দীর্ঘদিন বন্দরে পড়ে থাকায় বন্দর নিরাপত্তা নিয়ে উদ্বেগ তৈরি হয়। এরই অংশ হিসেবে প্রথম দফায় নয়টি কনটেইনার বন্দর থেকে সরিয়ে নেওয়া হয়েছে।

তবে নারায়ণগঞ্জে নেওয়ার পথেও একটি দুর্ঘটনা ঘটেছে। গত ৪ অক্টোবর সকালে বিপজ্জনক রাসায়নিক বহনকারী একটি কাভার্ডভ্যানে আগুন লাগে। পরে আগুন নিয়ন্ত্রণে আনা হয়। গাড়িতে থাকা রাসায়নিকের ড্রামগুলো ক্ষতিগ্রস্ত হয়নি এবং এ ঘটনায় কেউ হতাহত হননি।

রাসায়নিক ধ্বংসের কার্যক্রম তদারকিতে গঠিত কমিটির সদস্য সচিব রাসেল আহমেদ বলেন, মোট ছয়টি কনটেইনার ও তিনটি কাভার্ডভ্যানে করে এসব মালামাল চট্টগ্রাম থেকে নারায়ণগঞ্জে নেওয়া হচ্ছিল। আগুন লাগা কাভার্ডভ্যানটিতে থাকা ড্রামগুলো খালি ছিল। অতীতে এসব ড্রামে রাসায়নিক সংরক্ষণ করা হলেও নিরাপদভাবে ধ্বংসের জন্য সেগুলোও নির্ধারিত স্থানে নেওয়া হচ্ছিল।

কাঁচপুর হাইওয়ে থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) জুয়েল মিয়া বলেন, প্রাথমিকভাবে ধারণা করা হচ্ছে, কাভার্ডভ্যানের ইঞ্জিন থেকেই আগুনের সূত্রপাত। আগুন গাড়িতে থাকা রাসায়নিকের ড্রামগুলোতে ছড়ায়নি।

চট্টগ্রাম বন্দর থেকে পাঠানো ছয়টি কনটেইনার ও তিনটি কাভার্ডভ্যানের মধ্যে একটি কাভার্ডভ্যান ছাড়া বাকি সবগুলো ইতোমধ্যে রূপগঞ্জের ওয়াটা কেমিক্যাল কারখানায় পৌঁছেছে। সোমবার বিকেল পর্যন্ত পাঁচটি কনটেইনার আনলোড করা হয়েছে। এসব কনটেইনারের অধিকাংশে ভাঙাচোরা প্লাস্টিকের গ্যালন ও লোহার ড্রাম ছিল।

চট্টগ্রামের সহকারী রাজস্ব কর্মকর্তা (এআরও) সোহেল আহমেদ জানান, মালামাল আনলোডের পর সংশ্লিষ্ট সব দপ্তরের উপস্থিতিতে এগুলো ধ্বংস করা হবে।

তবে ওয়াটা কেমিক্যালসের ডেপুটি জেনারেল ম্যানেজার (ডিজিএম) বাবলু দাস বলেন, প্রাতিষ্ঠানিকভাবে সরকারি অনুমোদন না থাকলেও পরিত্যক্ত রাসায়নিক বর্জ্য ধ্বংসের পূর্ব অভিজ্ঞতা তাদের রয়েছে। কারখানায় রাসায়নিক বর্জ্য ধ্বংসের জন্য ইটিপি প্ল্যান্টসহ প্রয়োজনীয় ব্যবস্থাপনা রয়েছে বলেও দাবি করেন তিনি।

স্থানীয়দের অভিযোগ প্রসঙ্গে বাবলু দাস বলেন, ‘এলাকাবাসীর অভিযোগ সত্য নয়। আমাদের গ্যাসে কারো কোনো সমস্যা হওয়ার কথা নয়। কিছু মহলের প্ররোচনা ও স্বার্থান্বেষী মহল সুবিধা নিতে এসব করে থাকে।’

নারায়ণগঞ্জ পরিবেশ অধিদপ্তরের উপপরিচালক এএইচএম রাশেদ বলেন, চট্টগ্রাম বন্দর যেসব শর্ত দিয়েছিল, সেসব শর্ত মেনেই ওয়াটা কেমিক্যালসে রাসায়নিকগুলো ধ্বংসের জন্য আনা হয়েছে। এর আগে ওয়াটা কেমিক্যালসে রাসায়নিক ধ্বংসের সময় পরিবেশ অধিদপ্তরের একজন কর্মকর্তা উপস্থিত ছিলেন। এবারও কমিটিতে পরিবেশ অধিদপ্তরকে রাখা হলে ধ্বংসের সময় তাদের একজন প্রতিনিধি উপস্থিত থাকবেন।

রূপগঞ্জ উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) আব্দুল্লাহ মামুন শফি বলেন, ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষ ওয়াটা কেমিক্যালের ইটিপি পরিদর্শন করে বিপজ্জনক রাসায়নিক ধ্বংসের অনুমতি দিয়েছে। তবে এখনো এসব রাসায়নিক ধ্বংসের দিন-তারিখ নির্ধারণ হয়নি।







স্বদেশ প্রতিদিন/এস পি




আরও সংবাদ   বিষয়:  রূপগঞ্জ   ওয়াটা কেমিক্যালস   রাসায়নিক   মেয়াদোত্তীর্ণ রাসায়নিক   চট্টগ্রাম বন্দর   নারায়ণগঞ্জ   জনস্বাস্থ্য   পরিবেশ দূষণ   মঙ্গলখালী   রাসায়নিক বর্জ্য  






Loading...
Loading...
এই ক্যাটেগরির আরো সংবাদ  
অনুসরণ করুন
     
সম্পাদক ও প্রকাশক : মোঃ মজিবুর রহমান চৌধুরী
স্বদেশ গ্লোবাল মিডিয়া লিমিটেড -এর পক্ষে প্রকাশক কর্তৃক সিটি পাবলিশিং লি, আর কে মিশন রোড, ঢাকা-১২০৩ থেকে মুদ্রিত ও ১০, তাহের টাওয়ার, গুলশান সার্কেল-২ থেকে প্রকাশিত।
ফোন: ৯৮৫১৬২০, ৮৮৩২৬৪-৬, ফ্যাক্স: ৮৮০-২-৯৮৯৩২৯৫। ই-মেইল : [email protected], [email protected]
🔝
close
অনুসরণ করুন
     
সম্পাদক ও প্রকাশক : মোঃ মজিবুর রহমান চৌধুরী
স্বদেশ গ্লোবাল মিডিয়া লিমিটেড -এর পক্ষে প্রকাশক কর্তৃক সিটি পাবলিশিং লি, আর কে মিশন রোড, ঢাকা-১২০৩ থেকে মুদ্রিত ও ১০, তাহের টাওয়ার, গুলশান সার্কেল-২ থেকে প্রকাশিত।
ফোন: ৯৮৫১৬২০, ৮৮৩২৬৪-৬, ফ্যাক্স: ৮৮০-২-৯৮৯৩২৯৫। ই-মেইল : [email protected], [email protected]
🔝
close