
ইরান ও ইউক্রেনের যুদ্ধ, জ্বালানি সংকট, জলবায়ু পরিবর্তন, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার ঝুঁকি এবং বৈশ্বিক বৈষম্যের মতো নানা সংকটে আন্তর্জাতিক পরিস্থিতি ক্রমেই জটিল হয়ে উঠছে। এর সঙ্গে দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর গড়ে ওঠা আন্তর্জাতিক প্রতিষ্ঠানগুলোর কার্যকারিতা ও সক্ষমতা নিয়েও নতুন করে প্রশ্ন উঠছে।
এমন প্রেক্ষাপটে যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের দ্বিতীয় মেয়াদের পররাষ্ট্রনীতি নিয়ে আন্তর্জাতিক অঙ্গনে আলোচনা আরও জোরালো হয়েছে। নিউইয়র্কে জাতিসংঘ সাধারণ অধিবেশন চলাকালে ইরান ও ইউক্রেনের যুদ্ধ, আঞ্চলিক নিরাপত্তা এবং জ্বালানি পরিস্থিতির মতো বিষয়গুলো আলোচনার কেন্দ্রে রয়েছে।
ট্রাম্পের জাতিসংঘে ভাষণের সময়ও এসব সংকট সামনে আসছে। বিশেষ করে ইরানের সঙ্গে দীর্ঘস্থায়ী সংঘাত তার প্রশাসনের পররাষ্ট্রনীতি নিয়ে নতুন প্রশ্ন তৈরি করেছে। যুদ্ধ শুরুর দিকে দ্রুত সমাপ্তির প্রত্যাশা ব্যক্ত করা হলেও সংঘাত দীর্ঘায়িত হয়েছে। রয়টার্সের ২২ সেপ্টেম্বরের এক প্রতিবেদনে ট্রাম্পের অনুমোদনের হার ৩২ শতাংশে নেমে আসার কথা উল্লেখ করা হয়েছে।
তবে ট্রাম্প নিজে তার নীতির সাফল্যের দাবি করে আসছেন। তার বক্তব্য অনুযায়ী, তার নেতৃত্বে যুক্তরাষ্ট্রের শক্তি ও আন্তর্জাতিক মর্যাদা বেড়েছে।
মিত্রদের সঙ্গে সম্পর্কেও পরিবর্তন
ট্রাম্পের ‘আমেরিকা ফার্স্ট’ নীতির কারণে যুক্তরাষ্ট্রের দীর্ঘদিনের মিত্রদের সঙ্গে সম্পর্কের ধরনেও পরিবর্তন দেখা যাচ্ছে। কানাডা, জাপান, দক্ষিণ কোরিয়া ও ইউরোপের কয়েকটি দেশ নিজেদের প্রতিরক্ষা সক্ষমতা বাড়ানোর পাশাপাশি যুক্তরাষ্ট্রের ওপর নিরাপত্তা নির্ভরতা পুনর্বিবেচনা করছে।
কানাডার প্রধানমন্ত্রী মার্ক কার্নি ওয়াশিংটন থেকে আসা অস্থিরতা নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন। ইউরোপের দেশগুলোও প্রতিরক্ষা ব্যয় বাড়ানো এবং পারস্পরিক সহযোগিতা জোরদারের দিকে এগোচ্ছে।
সামরিক শক্তি নিয়েও প্রশ্ন
ট্রাম্পের পররাষ্ট্রনীতিতে সামরিক শক্তি, অর্থনৈতিক চাপ এবং হুমকিকে গুরুত্বপূর্ণ হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহারের প্রবণতা রয়েছে বলে বিশ্লেষণে উঠে এসেছে। ইরানের ক্ষেত্রেও সর্বোচ্চ চাপ প্রয়োগের নীতি অনুসরণ করেছে তার প্রশাসন।
তবে দীর্ঘস্থায়ী ইরান সংঘাত যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক সক্ষমতার সীমাবদ্ধতা নিয়েও আলোচনার সুযোগ তৈরি করেছে। বিশেষ করে ক্ষেপণাস্ত্র প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা, দীর্ঘমেয়াদি সামরিক মোতায়েন এবং ড্রোনভিত্তিক যুদ্ধের অভিজ্ঞতা বড় শক্তিগুলোর প্রচলিত সামরিক সক্ষমতা নিয়ে নতুন প্রশ্ন সামনে এনেছে।
ইরান যুদ্ধের প্রভাব
ইরানের পারমাণবিক সক্ষমতা ঠেকানোকে ট্রাম্প প্রশাসন যুদ্ধের অন্যতম প্রধান লক্ষ্য হিসেবে তুলে ধরেছে। জাতিসংঘে ট্রাম্প এ বিষয়ে যুক্তরাষ্ট্রের অবস্থান পুনর্ব্যক্ত করতে পারেন বলেও মার্কিন কর্মকর্তারা জানিয়েছেন।
তবে সংঘাত দীর্ঘায়িত হওয়ায় যুক্তরাষ্ট্রের কৌশল নিয়েও বিতর্ক তৈরি হয়েছে। ইউক্রেন যুদ্ধে রাশিয়ার দীর্ঘস্থায়ী সামরিক ক্ষয়ক্ষতি এবং ইরানের সঙ্গে সংঘাত—দুটি ঘটনাই আধুনিক যুদ্ধের বাস্তবতা ও বড় শক্তিগুলোর সামরিক সক্ষমতার সীমা নিয়ে আলোচনাকে জোরদার করেছে।
গ্রিনল্যান্ড নিয়েও টানাপোড়েন
ট্রাম্পের পররাষ্ট্রনীতির আরেকটি আলোচিত বিষয় গ্রিনল্যান্ড। ডেনমার্কের স্বায়ত্তশাসিত এই অঞ্চলকে যুক্তরাষ্ট্রের নিয়ন্ত্রণে নেওয়ার বিষয়ে ট্রাম্প অতীতে আগ্রহ প্রকাশ করেছিলেন এবং সামরিক শক্তি ব্যবহারের সম্ভাবনার কথাও বলেছিলেন।
তবে সাম্প্রতিক সময়ে গ্রিনল্যান্ডে মার্কিন সামরিক উপস্থিতি জোরদার এবং ডেনমার্ক ও গ্রিনল্যান্ডের সঙ্গে সম্পর্কের টানাপোড়েন কমানোর বিষয়ে আলোচনা হয়েছে। বিশ্লেষকদের মতে, মিত্রদেশের সার্বভৌমত্ব নিয়ে এমন বক্তব্য যুক্তরাষ্ট্রের প্রতি দীর্ঘমেয়াদি আস্থার ওপর প্রভাব ফেলতে পারে।
সংকটের জন্য শুধু ট্রাম্পই দায়ী নন
বর্তমান বৈশ্বিক অস্থিরতার পেছনে শুধু ট্রাম্পের নীতিকে কারণ হিসেবে দেখা হচ্ছে না। কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার দ্রুত বিকাশ, চীনের উত্থান, রাশিয়া ও পশ্চিমাদের দীর্ঘদিনের বিরোধ, জলবায়ু পরিবর্তন এবং মধ্যপ্রাচ্যের সংঘাত—এসব সংকটের অনেকগুলোই ট্রাম্পের দ্বিতীয় মেয়াদের আগেই তৈরি হয়েছে।
এ ছাড়া আফগানিস্তান ও ইরাকে যুক্তরাষ্ট্রের দীর্ঘ সামরিক অভিযানের অভিজ্ঞতাও দেশটির বৈশ্বিক নেতৃত্ব ও সামরিক সক্ষমতা নিয়ে আগে থেকেই নানা প্রশ্ন তৈরি করেছে।
তবে বর্তমান বিশ্লেষণে বলা হচ্ছে, ট্রাম্পের দ্বিতীয় মেয়াদের নীতি ও রাজনৈতিক অবস্থান এসব দীর্ঘদিনের পরিবর্তনকে আরও দৃশ্যমান করে তুলছে। একই সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্রের নেতৃত্বে গড়ে ওঠা পুরোনো আন্তর্জাতিক ব্যবস্থা আগের অবস্থায় ফিরবে কি না, সেই প্রশ্নও সামনে এসেছে।
ডেমোক্রেটিক পার্টির সম্ভাব্য ২০২৮ সালের প্রেসিডেন্ট প্রার্থী পিট বুটিগিগের বক্তব্য অনুযায়ী, অনেক দেশ এখন যুক্তরাষ্ট্রের নীতিগত পরিবর্তনকে সাময়িক ঘটনা হিসেবে না দেখে দীর্ঘমেয়াদি প্রবণতা হিসেবে বিবেচনা করছে।
ফলে ইরান ও ইউক্রেনের যুদ্ধ, মিত্রদের সঙ্গে সম্পর্কের টানাপোড়েন এবং বৈশ্বিক প্রতিষ্ঠানগুলোর সক্ষমতা নিয়ে চলমান বিতর্কের মধ্যে আন্তর্জাতিক ব্যবস্থার ভবিষ্যৎ কী হবে—সেটিই এখন বড় প্রশ্ন হয়ে উঠেছে।
স্বদেশ প্রতিদিন/এফএইচ