
পৃথিবীতে মানুষ নিজের জন্য নানা ধরনের ঘরবাড়ি নির্মাণ করে। জীবনের সঞ্চয় ও সামর্থ্য ব্যয় করে তৈরি করে সুন্দর প্রাসাদ। কিন্তু দুনিয়ার এসব স্থাপনা একসময় নশ্বর হয়ে যায়। এর বিপরীতে এমন কিছু আমল রয়েছে, যার প্রতিদান মানুষের মৃত্যুর পরও অব্যাহত থাকে। মহান আল্লাহর সন্তুষ্টির উদ্দেশ্যে মসজিদ নির্মাণ ও এতে সহযোগিতা করা তেমনই একটি মহৎ কাজ।
মসজিদ শুধু ইট-পাথরের একটি ভবন নয়। এটি মুসলমানদের ইবাদত, নামাজ, কুরআন তিলাওয়াত ও আল্লাহর স্মরণে সমবেত হওয়ার স্থান। তাই আল্লাহর সন্তুষ্টির উদ্দেশ্যে একটি মসজিদ নির্মাণে অর্থ, শ্রম বা অন্য কোনোভাবে সহযোগিতা করা ইসলামে অত্যন্ত মর্যাদাপূর্ণ আমল হিসেবে বিবেচিত।
মসজিদ নির্মাণের প্রতিদান জান্নাতে ঘর
মসজিদ নির্মাণের ফজিলত সম্পর্কে রাসুলুল্লাহ (সা.) সুসংবাদ দিয়েছেন। হজরত উসমান ইবনে আফফান (রা.) থেকে বর্ণিত, রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন—
‘যে ব্যক্তি আল্লাহর সন্তুষ্টির উদ্দেশ্যে কোনো মসজিদ নির্মাণ করবে, আল্লাহ তার জন্য জান্নাতে অনুরূপ ঘর তৈরি করে দেবেন।’
—সহিহ বুখারি: ৪৫০; সহিহ মুসলিম: ৫৩৩
এই হাদিস থেকে বোঝা যায়, মসজিদ নির্মাণে অর্থ ব্যয় করার প্রকৃত উদ্দেশ্য হতে হবে আল্লাহর সন্তুষ্টি অর্জন। মানুষের প্রশংসা, সামাজিক মর্যাদা বা লোকদেখানোর উদ্দেশ্যে দান করার চেয়ে আন্তরিক নিয়তে আল্লাহর জন্য ব্যয় করাই বেশি গুরুত্বপূর্ণ।
কুরআনেও মসজিদ আবাদকারীদের মর্যাদা
পবিত্র কুরআনে আল্লাহ তাআলা মসজিদ আবাদকারীদের বিশেষ মর্যাদার কথা উল্লেখ করেছেন। আল্লাহ বলেন—
‘নিশ্চয়ই তারাই আল্লাহর মসজিদসমূহ আবাদ করবে, যারা আল্লাহ ও শেষ দিবসের প্রতি ঈমান এনেছে, নামাজ কায়েম করেছে, জাকাত দিয়েছে এবং আল্লাহ ছাড়া কাউকে ভয় করেনি। আশা করা যায়, তারা সৎপথপ্রাপ্তদের অন্তর্ভুক্ত হবে।’
—সুরা আত-তওবা: ১৮
মসজিদ নির্মাণের পাশাপাশি সেটিকে নামাজ, কুরআন তিলাওয়াত, জিকির ও অন্যান্য বৈধ ইবাদতের মাধ্যমে আবাদ করাও গুরুত্বপূর্ণ। অর্থাৎ শুধু একটি ভবন নির্মাণ করাই উদ্দেশ্য নয়; বরং সেখানে যেন নিয়মিত ইবাদত ও দ্বীনি কার্যক্রম পরিচালিত হয়, সেটিও গুরুত্বপূর্ণ।
সদকায়ে জারিয়ার অন্যতম সুযোগ
মানুষের মৃত্যুর সঙ্গে দুনিয়ার জীবনের আমল বন্ধ হয়ে যায়। তবে কিছু নেক কাজের সুফল মৃত্যুর পরও অব্যাহত থাকতে পারে। মসজিদ নির্মাণ ও এতে সহযোগিতা সদকায়ে জারিয়ার অন্তর্ভুক্ত হতে পারে।
রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, মুমিনের মৃত্যুর পর তার আমল ও নেক কাজের মধ্যে যেসব কাজের সওয়াব তার কাছে পৌঁছাতে থাকে, তার মধ্যে রয়েছে এমন জ্ঞান যা সে শিক্ষা দিয়েছে ও প্রচার করেছে, সৎ সন্তান, কুরআন রেখে যাওয়া এবং মসজিদ নির্মাণ করে যাওয়া।
—সুনান ইবনে মাজাহ: ২৪২
অর্থাৎ একজন ব্যক্তি মারা যাওয়ার পরও যদি তার নির্মাণ করা মসজিদে মানুষ নামাজ আদায় করে, কুরআন পড়ে, আল্লাহকে স্মরণ করে এবং অন্যান্য বৈধ ইবাদত করে, তাহলে সেই নেক কাজের মাধ্যমে তার জন্য সওয়াব অব্যাহত থাকার আশা করা যায়।
সামর্থ্য অনুযায়ী অংশ নেওয়াই গুরুত্বপূর্ণ
মসজিদ নির্মাণে অংশ নিতে হলে বিপুল অর্থের মালিক হওয়া জরুরি নয়। যার যতটুকু সামর্থ্য, সে অনুযায়ী সহযোগিতা করতে পারে। কেউ অর্থ দিয়ে, কেউ নির্মাণসামগ্রী দিয়ে, কেউ শ্রম দিয়ে কিংবা অন্য কোনো বৈধ উপায়ে সহযোগিতা করতে পারেন।
তবে দানের ক্ষেত্রে নিয়ত অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। মানুষের প্রশংসা পাওয়ার জন্য নয়, বরং একমাত্র আল্লাহর সন্তুষ্টি অর্জনের উদ্দেশ্যেই এমন কাজে অংশ নেওয়া উচিত।
মসজিদ নির্মাণের পাশাপাশি এর রক্ষণাবেক্ষণ, পরিচ্ছন্নতা ও প্রয়োজনীয় সংস্কারেও সহযোগিতা করা যেতে পারে। কারণ মসজিদকে সচল ও ইবাদতের উপযোগী রাখাও গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব।
দুনিয়ার সম্পদের চেয়ে আখেরাতের বিনিয়োগ
দুনিয়ার সম্পদ মানুষকে কিছু সময়ের জন্য স্বাচ্ছন্দ্য দিতে পারে। কিন্তু আল্লাহর সন্তুষ্টির জন্য ব্যয় করা সম্পদের প্রতিদান আখেরাতে পাওয়ার আশা রয়েছে। তাই সামর্থ্য অনুযায়ী মসজিদ নির্মাণ ও অন্যান্য কল্যাণমূলক কাজে অংশ নেওয়া একজন মুসলমানের জন্য নেক আমলের সুযোগ হতে পারে।
সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো—এ ধরনের দান যেন হালাল সম্পদ থেকে এবং আন্তরিক নিয়তে করা হয়। লোকদেখানো বা অহংকারের পরিবর্তে আল্লাহর সন্তুষ্টিকে উদ্দেশ্য করাই হওয়া উচিত।
সামর্থ্য অনুযায়ী আল্লাহর ঘর নির্মাণে অংশ নেওয়া তাই শুধু দুনিয়ার একটি স্থাপনা তৈরিতে সহযোগিতা নয়; বরং একজন মুমিনের জন্য আখেরাতের স্থায়ী জীবনের কল্যাণ অর্জনের একটি গুরুত্বপূর্ণ সুযোগ।
স্বদেশ প্রতিদিন/এস পি