বৃহস্পতিবার ২৪ সেপ্টেম্বর ২০২৬
   
শিরোনাম:
৮ মাসে পেরিয়ে গেলেও ফরেনসিক প্রতিবেদন পাওয়া জায় নেই      বিএনপি ও সহযোগী সংগঠনের বিক্ষোভ মিছিল-সমাবেশ       একাদশের শিক্ষার্থীদের ওরিয়েন্টেশন      ২৪ ঘণ্টায় ডেঙ্গুতে প্রাণ গেল আরও ৮ জনের      শরণখোলায় আওয়ামী লীগের বিরুদ্ধে বিএনপির বিক্ষোভ      রৌমারীতে উপজেলা কাব ক্যাম্পুরীর উদ্বোধন      কপোতাক্ষে মিলল ভ্যানচালক ইখলাসের মরদেহ      টাঙ্গাইল সেতুর প্রকৌশলীকে স্ট্যান্ড রিলিজ      মিছিলের চেষ্টা, ছাত্রলীগের ২০ নেতাকর্মী আটক      এনসিপি নেতাদের গণধোলাই দিতে হবে: এমদাদ চৌধুরী      ৬৮ লাখ টাকার চোরাই পণ্য জব্দ করেছে বিজিবি      ৪২ বোতল বিদেশি মদসহ আটক ৩      
হরমুজ সংকটে বাড়ছে বাংলাদেশের অর্থনীতির বহুমুখী চাপ
স্বদেশ ডেস্ক
প্রকাশ: রবিবার, ৬ সেপ্টেম্বর, ২০২৬, ১:৪০ পিএম

হরমুজ প্রণালিকে ঘিরে অচলাবস্থা এবং মধ্যপ্রাচ্যের দীর্ঘস্থায়ী সংঘাতের প্রভাব ক্রমেই বিস্তৃত হচ্ছে বাংলাদেশের অর্থনীতিতে। সবচেয়ে বেশি চাপ তৈরি হয়েছে জ্বালানি খাতে। যুদ্ধ ও সরবরাহ সংকটের কারণে মার্চ থেকে জ্বালানি আমদানি ও বিল পরিশোধে সরকারের অতিরিক্ত ৪ থেকে ৫ বিলিয়ন ডলার ব্যয় হয়েছে বলে জানিয়েছেন অর্থমন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী।

পরিস্থিতি মোকাবিলায় হরমুজ প্রণালি দিয়ে জাহাজ চলাচল ও পণ্য সরবরাহে বিঘ্নের কারণে দেশের অর্থনীতি, বাণিজ্য, জ্বালানি, নৌপরিবহণ এবং প্রবাসী খাতে কী ধরনের প্রভাব পড়ছে, তা জানতে পাঁচ মন্ত্রণালয়ের কাছে তথ্য চেয়েছে পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়। ৩ সেপ্টেম্বর পাঠানো চিঠিতে আগামী ৭ সেপ্টেম্বরের মধ্যে প্রয়োজনীয় তথ্য ও মতামত দিতে বলা হয়েছে।

পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের পশ্চিম ইউরোপ ও ইউরোপীয় ইউনিয়ন শাখার পাঠানো ওই চিঠিতে চলমান সংঘাতের কারণে পণ্য পরিবহণ ও সরবরাহ ব্যবস্থায় কী ধরনের সংকট তৈরি হয়েছে, তার প্রভাব বাংলাদেশের ওপর কতটা পড়ছে এবং সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়গুলো কী পদক্ষেপ নিয়েছে—এসব বিষয় জানতে চাওয়া হয়েছে।

সরকারি সূত্রগুলো বলছে, সংকট এখন শুধু জ্বালানি আমদানিতে সীমাবদ্ধ নেই। বাড়তি আমদানি ব্যয়, ভর্তুকির চাপ, রপ্তানি পরিবহণ ব্যয় বৃদ্ধি, সার ও নিত্যপণ্যের বাজারে অস্থিরতা এবং বৈদেশিক মুদ্রার অতিরিক্ত চাহিদা—সব মিলিয়ে অর্থনীতিতে তৈরি হয়েছে একাধিক ঝুঁকি।

জ্বালানি আমদানিতে বাড়তি ব্যয়

যুদ্ধ ও সরবরাহ সংকটের কারণে জ্বালানি আমদানিতে সরকারের বাড়তি ব্যয় ইতোমধ্যে ৪ থেকে ৫ বিলিয়ন ডলারে পৌঁছেছে। একই সময়ে জ্বালানি তেল ও এলএনজির বাড়তি মূল্য সামাল দিতে মার্চ থেকে জুন পর্যন্ত প্রায় ৩১ হাজার কোটি টাকা ভর্তুকির প্রয়োজন হতে পারে বলে আগেই জানিয়েছিল বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজসম্পদ মন্ত্রণালয়।

এর মধ্যে ডিজেলে ১৫ হাজার ৪০৯ কোটি, অকটেনে ৬৩৬ কোটি এবং এলএনজিতে ১৫ হাজার ৭৭ কোটি টাকা ভর্তুকির প্রয়োজনের হিসাব দেওয়া হয়েছিল।

অন্যদিকে, ১১ জুন পর্যন্ত বাংলাদেশ পেট্রোলিয়াম করপোরেশনের (বিপিসি) প্রকৃত লোকসান দাঁড়িয়েছে ১৭ হাজার ৩৯ কোটি ৫৬ লাখ টাকা। মার্চে বিপিসির লোকসান ছিল ২ হাজার ২৪৮ কোটি, এপ্রিলে ৭ হাজার ৮৬৬ কোটি, মে মাসে ২ হাজার ৬২৩ কোটি এবং জুনের প্রথম ১১ দিনে ৪ হাজার ৩০১ কোটি টাকা।

এই অঙ্কগুলো সরাসরি যোগ করে মোট ক্ষতির পরিমাণ নির্ধারণ করা যাবে না। কারণ এগুলো বৈদেশিক মুদ্রার অতিরিক্ত ব্যয়, সরকারি ভর্তুকি এবং বিপিসির লোকসানের পৃথক চিত্র তুলে ধরে।

বিকল্প উৎসে জ্বালানি সংগ্রহের চেষ্টা

হরমুজ সংকটের প্রভাব কমাতে সরকার বিকল্প উৎস থেকে জ্বালানি সংগ্রহের উদ্যোগ নিয়েছে। এর অংশ হিসেবে কাজাখস্তান থেকে এক লাখ টন ডিজেল এবং সিঙ্গাপুর থেকে এলএনজি আমদানির অনুমোদন দেওয়া হয়েছে।

অর্থমন্ত্রী জানিয়েছেন, সরকার বিকল্প উৎস নিশ্চিত করার পাশাপাশি তিন মাসের জ্বালানি মজুত গড়ে তোলার চেষ্টা করছে।

দীর্ঘমেয়াদি জ্বালানি নিরাপত্তার জন্য দেশীয় গ্যাস অনুসন্ধান, ভোলার গ্যাস শিল্পাঞ্চলে সরবরাহ, মালয়েশিয়া থেকে গ্যাস আমদানির উদ্যোগ এবং সৌরবিদ্যুৎ উৎপাদন বাড়ানোর পরিকল্পনাও নেওয়া হয়েছে। আগামী পাঁচ বছরে ১০ হাজার মেগাওয়াট সৌরবিদ্যুৎ উৎপাদনের লক্ষ্য রয়েছে বলে জানিয়েছেন জ্বালানিমন্ত্রী।

এ ছাড়া জ্বালানি আমদানি ও বাজার ব্যবস্থাপনায় বেসরকারি খাতের অংশগ্রহণ বাড়ানোর বিষয়টিও বিবেচনা করছে সরকার। এতে জ্বালানি সরবরাহের উৎস বাড়ানোর পাশাপাশি বাজারে প্রতিযোগিতা তৈরি হবে বলে মনে করছে সরকার।

মধ্যপ্রাচ্যগামী রপ্তানিতে বাড়ছে পরিবহণ ব্যয়

হরমুজ সংকটের সবচেয়ে দৃশ্যমান প্রভাব পড়েছে মধ্যপ্রাচ্যগামী পণ্য পরিবহণে। যুদ্ধের আগে চট্টগ্রাম থেকে উপসাগরীয় দেশগুলোতে প্রক্রিয়াজাত খাদ্যপণ্যের একটি কনটেইনার পাঠাতে যেখানে প্রায় ১ হাজার ৫০০ ডলার খরচ হতো, বিকল্প রুট ব্যবহারের কারণে তা বেড়ে প্রায় ৬ হাজার ৫০০ ডলারে দাঁড়িয়েছে।

অর্থাৎ পরিবহণ ব্যয় চার গুণেরও বেশি বেড়েছে। একই সময়ে মধ্যপ্রাচ্যের বাজারে বাংলাদেশের নতুন রপ্তানি অর্ডার প্রায় ৪০ শতাংশ কমেছে বলে সংশ্লিষ্ট ব্যবসায়ীরা জানিয়েছেন।

জাহাজকে বিকল্প ও দীর্ঘ রুটে ঘুরিয়ে নেওয়ায় জ্বালানি ও বিমা ব্যয়ও বাড়ছে। এতে কম মুনাফার পণ্য রপ্তানিকারকরা সবচেয়ে বেশি চাপে পড়েছেন। একদিকে বাড়ছে পরিবহণ ব্যয়, অন্যদিকে কমছে অর্ডার—ফলে বাজার ধরে রাখতে গিয়ে লোকসানের ঝুঁকিও বাড়ছে।

সারের বাজারেও তৈরি হচ্ছে চাপ

হরমুজ প্রণালি দিয়ে মধ্যপ্রাচ্য থেকে বিশ্ববাজারে বিপুল পরিমাণ ইউরিয়া সার সরবরাহ হয়। সংঘাতের প্রথম ধাক্কায় আন্তর্জাতিক বাজারে প্রতি টন ইউরিয়ার দাম প্রায় ৪০০ ডলার থেকে বেড়ে ৮৫০ ডলারের ওপরে উঠে যায়। পরে জুনে তা আবার প্রায় ৪৫৩ ডলারে নেমে আসে।

দাম বাড়ার আশঙ্কায় সরকার বিকল্প উৎস থেকে সার সংগ্রহের উদ্যোগ নিয়েছে। আন্তর্জাতিক বাজারে সারের দাম দীর্ঘ সময় বেশি থাকলে কৃষকের উৎপাদন ব্যয় বাড়তে পারে। এর প্রভাব পরবর্তী সময়ে খাদ্যপণ্যের বাজারেও পড়ার আশঙ্কা রয়েছে।

রেমিট্যান্সেও বাড়ছে অনিশ্চয়তা

বাংলাদেশের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ শ্রমবাজার মধ্যপ্রাচ্য। সৌদি আরব, সংযুক্ত আরব আমিরাত, কাতার, কুয়েত, ওমান ও বাহরাইন—এই ছয় দেশ থেকে দেশের মোট রেমিট্যান্সের প্রায় ৪৬ থেকে ৫১ শতাংশ আসে।

অর্থনীতিবিদদের মতে, সংঘাত দীর্ঘায়িত হলে মধ্যপ্রাচ্যের শ্রমবাজারে নেতিবাচক প্রভাব পড়তে পারে। এতে নতুন কর্মসংস্থানের সুযোগ কমার পাশাপাশি প্রবাসী আয়েও চাপ তৈরি হওয়ার ঝুঁকি রয়েছে।

এ অবস্থায় প্রবাসীকল্যাণ ও বৈদেশিক কর্মসংস্থান মন্ত্রণালয়ের সামনে বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছে প্রবাসীদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা, বিদেশে নতুন কর্মসংস্থানের ধারাবাহিকতা বজায় রাখা এবং সম্ভাব্য শ্রমবাজার সংকট মোকাবিলায় আগাম প্রস্তুতি নেওয়া।

সামনে বড় চ্যালেঞ্জ

অর্থনীতিবিদদের মতে, হরমুজ প্রণালির পরিস্থিতি কতদিন স্থায়ী হয় এবং মধ্যপ্রাচ্যের সংঘাত কোন দিকে যায়—তার ওপর বাংলাদেশের ক্ষতির মাত্রা অনেকটাই নির্ভর করবে। সংঘাত দীর্ঘায়িত হলে জ্বালানি আমদানি ব্যয়, পরিবহণ খরচ, পণ্যমূল্য, বৈদেশিক মুদ্রার চাহিদা এবং রেমিট্যান্স—সব ক্ষেত্রেই চাপ আরও বাড়তে পারে।

তাই জ্বালানির বিকল্প উৎস নিশ্চিত করার পাশাপাশি পর্যাপ্ত মজুত, আমদানি বহুমুখীকরণ, রপ্তানি পরিবহণে সহায়তা, সার ও নিত্যপণ্যের সরবরাহ স্থিতিশীল রাখা এবং প্রবাসী শ্রমবাজার ধরে রাখার ওপর গুরুত্ব দেওয়ার প্রয়োজন রয়েছে।




স্বদেশ প্রতিদিন/এফএইচ


আরও সংবাদ   বিষয়:  বাংলাদেশের অর্থনীতি রপ্তানি বাণিজ্য  






Loading...
Loading...
এই ক্যাটেগরির আরো সংবাদ  
অনুসরণ করুন
     
সম্পাদক ও প্রকাশক : মোঃ মজিবুর রহমান চৌধুরী
স্বদেশ গ্লোবাল মিডিয়া লিমিটেড -এর পক্ষে প্রকাশক কর্তৃক সিটি পাবলিশিং লি, আর কে মিশন রোড, ঢাকা-১২০৩ থেকে মুদ্রিত ও ১০, তাহের টাওয়ার, গুলশান সার্কেল-২ থেকে প্রকাশিত।
ফোন: ৯৮৫১৬২০, ৮৮৩২৬৪-৬, ফ্যাক্স: ৮৮০-২-৯৮৯৩২৯৫। ই-মেইল : [email protected], [email protected]
🔝
close
অনুসরণ করুন
     
সম্পাদক ও প্রকাশক : মোঃ মজিবুর রহমান চৌধুরী
স্বদেশ গ্লোবাল মিডিয়া লিমিটেড -এর পক্ষে প্রকাশক কর্তৃক সিটি পাবলিশিং লি, আর কে মিশন রোড, ঢাকা-১২০৩ থেকে মুদ্রিত ও ১০, তাহের টাওয়ার, গুলশান সার্কেল-২ থেকে প্রকাশিত।
ফোন: ৯৮৫১৬২০, ৮৮৩২৬৪-৬, ফ্যাক্স: ৮৮০-২-৯৮৯৩২৯৫। ই-মেইল : [email protected], [email protected]
🔝
close