
নিরাশার বালুচরে থমকে গেছে তিস্তা পাড়ের মানুষের জীবন-জীবিকা
উত্তরাঞ্চলের রংপুর বিভাগের লালমনিরহাট সহ ৫ জেলায় তিস্তা নদী। বর্ষা এলেই বন্যা আর ভাঙনের মুখে পড়ে তিস্তা পাড়ের বাসিন্দারা। এ যেন তিস্তার করুণ হাল, নিরাশার বালুচরে থমকে গেছে তিস্তা পাড়ের মানুষের জীবন-জীবিকা।
শুষ্ক মৌসুমে তিস্তা শুকিয়ে মরুভূমি হয়ে যাচ্ছে। চারদিকে বালু আর বালু। যে নদীকে ঘিরে গড়ে উঠেছে এ অঞ্চলের মানববসতি ও সভ্যতা, ভাটিয়ালি আর ভাওয়াইয়া গান, সেই চিরযৌবনা প্রমত্তা তিস্তা ক্রমাগত ক্ষীণ হয়ে মরে যাচ্ছে। তার বুক জুড়ে পানির স্রোত আর নেই। হিমালয়ের তুষার গলা পানি আর বৃষ্টিধারায় তিস্তার পানি যতই বেড়ে উঠুক, এখন তা মানুষের হাতে বন্দি। তিস্তার বুক জুড়ে জেগে উঠেছে বিস্তীর্ণ চরাঞ্চল।
জীবন-জীবিকার ঝুঁকিতে পড়েছে তিস্তাকেন্দ্রীক ২০ লাখেরও বেশি মানুষে। ক্রমাগত নাব্য সংকটে লালমনিরহাটের পাটগ্রাম থেকে গাইবান্ধা জেলার সুন্দরগঞ্জ উপজেলার ভাটিকাপাসিয়া পর্যন্ত তিস্তা পাড়ের মানুষের জীবিকা নির্বাহ ক্রমশ কঠিন হয়ে উঠেছে।
তিস্তা পাড়ের মানুষের দুরবস্থা মূলত ভারতীয় বাঁধের কারণে, শুষ্ক মৌসুমে পানির অভাব এবং বর্ষায় অতিরিক্ত পানির কারণে বন্যা ও ভাঙনের ফলে সৃষ্টি হয়। প্রতি বছর ফসলি জমি, ঘরবাড়ি ও সম্পদ নষ্ট হয়ে যাওয়ায় তারা চরম দুর্দশায় দিন কাটায়, যদিও তিস্তা মহাপরিকল্পনার মতো সমাধানের কথা শোনা গেলেও তা এখনো বাস্তবায়িত হয়নি।
স্থানীয়দের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, তিস্তার উজানে ভারতের একের পর এক জলবিদ্যুৎ প্রকল্প আর গজলডোবায় বাঁধ নির্মাণ করে এ নদীর উচ্ছল গতিকে রোধ করে দেওয়া হয়েছে। নভেম্বরের শুরুতেই তিস্তায় নাব্য সংকট তীব্র হওয়ায় মহাদুশ্চিন্তায় পড়েছেন তিস্তাপারের লাখ লাখ মানুষ। বিশেষ করে উজান থেকে নেমে আসা ঢল ও পলি জমে ভরে গেছে নদী। খনন, সংস্কার, শাসন ও সংরক্ষণ না করায় একসময়ের খরস্রোতা নদীটি এখন অনেক স্থানে মরা খালে পরিণত হয়েছে। এখন তিস্তার পানিবণ্টন চুক্তি বাস্তবায়ন ও নদী খনন করে চাষাবাদের সুযোগ সৃষ্টি হলে লাখ লাখ মানুষের দুঃখ-দুর্দশা অনেকটা লাঘব হবে।
সদর উপজেলার গোকুন্ডা ইউনিয়নের পাঙ্গাটারী গ্রামের মৎস্যজীবী মানিক চন্দ্র জানান, তিস্তায় মাছ ধরে জীবিকা নির্বাহ করি, মাছের শুঁটকি করেও সারা বছর বিক্রি করতাম। কিন্তু বেশিরভাগ সময় নদীতে মাছ না থাকার কারণে মাছ ধরে আর সংসার চালানো সম্ভব হচ্ছে না।
আদিতমারী উপজেলার মহিষখোচা ইউনিয়নের গোবর্ধন এলাকার বাসিন্দা রেজাউল করিম জানান, মূল নদীতে হাঁটুর নিচে পানি। যা হেঁটেই পাড় হতে হয়। চরে যে টুকুই কৃষি চাষাবাদ হচ্ছে, কিন্তু সার কীটনাশক ক্রয় বিক্রয়ে পরিবহন সমস্যা। নদীতে পানি থাকলে এই সমস্যা থাকতো না।
জেলার হাতীবান্ধা উপজেলার গড্ডিমারী ইউনিয়নের বাসিন্দা, ব্যবসায়ী আশরাফুল ইসলাম বলেন, তিস্তার পানি না থাকলে আমাদের ব্যবসা-বাণিজ্যও ক্ষতিগ্রস্ত হয়। কৃষিপণ্য উৎপাদন কমে গেলে বাজারে সংকট দেখা দেয়, মানুষের আয় কমে যায়।
তিস্তা পারের দুই কোটি মানুষের দুঃখ তিস্তা। বন্যার আর খরায় তিস্তাপারের মানুষের জীবন দুর্বিষহ হয়ে ওঠে। আর তাই তিস্তা বাঁচাতে ফুঁসে উঠেছে তিস্তাপারের লাখো মানুষ।
তিস্তা মহাপরিকল্পনা বাস্তবায়নের দাবিতে আন্দোলন ক্রমেই তীব্র থেকে তীব্রতর হচ্ছে। মহাপরিকল্পনা বাস্তবায়নের দাবিতে রংপুর বিভাগের ৫ জেলা লালমনিরহাট, রংপুর, নীলফামারী, কুড়িগ্রাম ও গাইবান্ধা জেলা চলমান আন্দোলনের কর্মসূচি পালন হয়ে আসছে।
এই কর্মসূচির অংশগ্রহণ করছেন রংপুর বিভাগের পাঁচ জেলার সর্বস্তরের তিস্তা পারের মানুষসহ, শিক্ষক- শিক্ষার্থী, কৃষক-শ্রমিক, ব্যবসায়ীসহ অফিস-আদালতের কর্মকর্তা-কর্মচারী ও সাধারণ মানুষ।
তিস্তা নদী রক্ষা আন্দোলনের প্রধান সমন্বয়ক, বিএনপির জাতীয় নির্বাহী কমিটির রংপুর বিভাগীয় সাংগঠনিক সম্পাদক ও সাবেক উপমন্ত্রী অধ্যক্ষ আসাদুল হাবিব দুলু এই কর্মসূচির দফায় দফায় ডাক দিয়ে আসছেন।
এ প্রসঙ্গে তিস্তা নদী রক্ষা আন্দোলনের প্রধান সমন্বয়ক, অধ্যক্ষ আসাদুল হাবিব দুলু বলেন, সরকার যদি নির্বাচনের তফসিল ঘোষণার আগে আগামী নভেম্বর মাসে নিজস্ব অর্থায়নে তিস্তা মহাপরিকল্পনার কাজ শুরু না করে, তবে তিস্তাপারের মানুষকে সঙ্গে নিয়ে বৃহত্তর আন্দোলন গড়ে তোলা হবে।
তিনি আরও বলেন, তিস্তা মহাপরিকল্পনা বাস্তবায়নের দাবিতে উত্তরাঞ্চলের মানুষ আজ ঐক্যবদ্ধ। তিস্তা নদী শুধু একটি নদী নয়, এটি আমাদের জীবন-জীবিকা ও সংস্কৃতির প্রতীক। এই নদীর অববাহিকায় বসবাসকারী প্রায় দুই কোটি মানুষের ভাগ্য জড়িয়ে আছে এর পানির প্রবাহ ও পুনরুজ্জীবনের সঙ্গে। যা তিস্তাপারের মানুষের ন্যায্য অধিকার।
সংশ্লিষ্টরা জানান, তিস্তার নাব্য সংকটে ২০ রুটে নৌচলাচল বন্ধ রয়েছে। এতে বেকার হয়ে পড়েছেন প্রায় চার হাজার নৌশ্রমিক ও জেলে। ভারতের একতরফা পানি প্রত্যাহারের কারণে শুষ্ক মৌসুমে তিস্তায় পানি না থাকায় উত্তরাঞ্চল মরুভূমি হয়ে যাচ্ছে। নদীর লালমনিরহাট অংশ এখন মৃতপ্রায়। ফলে লাখ লাখ মানুষের জীবন-জীবিকা ঝুঁকিতে পড়েছে।
দেশের বৃহত্তম সেচ প্রকল্প তিস্তা ব্যারাজের ডালিয়া পয়েন্টের নির্বাহী প্রকৌশলী আসফা উ দৌলা জানান, নদীতে পানি কম থাকায় ৪৫ হেক্টর জমিতে চাষাবাদ হচ্ছে। নদীতে মাত্র ২ হাজার কিউসেক পানি রয়েছে। সব কয়টি জলকপাট বন্ধ রয়েছে। তাই মূল নদী পানি শুকিয়ে গেছে।
লালমনিরহাট পানি উন্নয়ন বোর্ডের নির্বাহী প্রকৌশলী সুনীল কুমার জানান, বর্তমানে পানি রিজার্ভ আছে ২,০০০ কিউসেক। এই ২০০০ কিউসেক পানি তিস্তা নদী থেকে নিয়ে ক্যানেলে সরবরাহ করা হয়েছে।
৪৪ গেটের মধ্যে ৬ ইঞ্চি করে ২টি গেট খুলে রাখা হয়েছে। শুষ্ক মৌসুমে বন্ধ থাকে বাকি সব গুলো গেট। তিস্তা মহাপরিকল্পনার কাজ চালু হলে বাঁচতে পারবে নদীর দুই পাড়ের মানুষ।