
বরেন্দ্রে তীব্র পানি সংকটে কৃষি বিপর্যয়
রাজশাহীর ঐতিহাসিক বরেন্দ্রভূমি একসময় দেশের ধানের ভাণ্ডার হিসেবে পরিচিত ছিল। বছরে তিনবার ফসল ফলানো, সমতল উর্বর জমি আর সেচ ব্যবস্থার জন্য অঞ্চলটির সুনাম ছিল ব্যাপক। কিন্তু আজ আর সে রূপ নেই। ভূগর্ভস্থ পানির স্তর দ্রুত কমে যাচ্ছে, সেচ ব্যয় বাড়ছে, বৃষ্টিপাত কমছে— ফলে বিপর্যয় নেমে এসেছে কৃষিজীবনে। উৎপাদন কমছে, খরচ বাড়ছে, চাষাবাদের সক্ষমতা হারাচ্ছেন কৃষকেরা। অসহায়ত্ব, ঋণের বোঝা আর হতাশায় আত্মহত্যার ঘটনাও বাড়ছে। সব মিলিয়ে ধানের ভাণ্ডার বরেন্দ্র আজ মরুকরণের হুমকির মুখে।
রাজশাহীর গোদাগাড়ী উপজেলার সাঁওতাল কৃষক কংগ্রেস টুডু তার আমন ধানের জমি দেখাতে দেখাতে বলেন, সপ্তাহখানেক সেচ না পেলেই জমি শুকিয়ে ফেটে যায়। টাকার অভাবে অক্টোবরের শুরুতে সেচ দিতে পারিনি। দু’-একদিন পানি না পেলে ধান চিটা হয়ে যাবে, দানা ধরবে না। মাঠজুড়ে ফেটে চৌচির মাটি— যেন বিপন্ন কৃষির ছবিই আঁকে।
স্থানীয় সূত্র জানায়, বার্ষাপাড়া গ্রামের এক সাঁওতাল কৃষক ২০২৩ সালে সেচ দিতে না পেরে কীটনাশক খেয়ে আত্মহত্যার চেষ্টা করেন। তার আগের বছর পাশের গ্রামের দুই কৃষক— অভিনাথ মার্ডি ও রবি মার্ডি— নলকূপ মালিক পানি দিতে অস্বীকৃতি জানালে আত্মহত্যা করেন। ফসলহানি, ঋণ আর হতাশা তাদের জীবন কেড়ে নেয়।
তানোর উপজেলার কৃষক মো. খালেক বলেন, আগে ৪০ ফুটের নলকূপে পানি উঠত। এখন আর ওঠে না। নতুন গভীর নলকূপ বসানো ছাড়া উপায় নেই। শুধু তানোর নয়— গোদাগাড়ী, সাপাহারও একই সংকটে। ফলে কৃষি এখন টিকে থাকার লড়াই।
রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের ভূতত্ত্ব ও খনিবিদ্যা বিভাগের অধ্যাপক চৌধুরি সরওয়ার বলেন, জলবায়ু পরিবর্তন বরেন্দ্রে নীরব ঘাতকের মতো। রাজশাহীতে বার্ষিক গড় বৃষ্টিপাত প্রায় ১,২৩৫ মিমি— যেখানে জাতীয় গড় প্রায় ২,০০০ মিমি। ফলে আগে বর্ষার পানিতে জন্মানো আমন এখন নিয়মিত সেচ ছাড়া সম্ভব হয় না। বৃষ্টির ধরনেও পরিবর্তন এসেছে— বর্ষাকালে বৃষ্টির পরিমাণ কমছে, বর্ষার পর অস্বাভাবিক ভারী বৃষ্টি দেখা যাচ্ছে।
নওগাঁর নজিপুরের কৃষক অনিক ইসলাম বলেন, আগের মতো বৃষ্টি হয় না। পানি ৩০ ফুট থেকে এখন ৮০ ফুট নিচে নেমে গেছে। অনেক জায়গায় গভীরেও পানি পাওয়া যায় না। কৃষকরা অস্বাভাবিক ব্যয় করে সেচের চেষ্টা করলেও ফলন কমছে, অর্থনৈতিক সংকট বাড়ছে।
সরকার গত আগস্টে রাজশাহী, চাঁপাইনবাবগঞ্জ, নওগাঁ ও চট্টগ্রামের মোট ২৬টি উপজেলার ৫০টি ইউনিয়নকে ‘তীব্র পানি সংকটপূর্ণ’ এলাকা ঘোষণা করেছে। এর মধ্যে ৪৭টি ইউনিয়ন বরেন্দ্র এলাকার অন্তর্ভুক্ত। পানির ব্যবহার নিয়ন্ত্রণে নতুন নির্দেশিকার কথাও জানা গেছে।
বাংলাদেশ পানি উন্নয়ন বোর্ডের (বিডব্লিউডিবি) সাবেক পরিচালক আনোয়ার জাহিদ বলেন, বরেন্দ্র অঞ্চলে মাটির নিচে ২০০ থেকে ৮০০ ফুট পর্যন্ত কোনো বালির স্তর নেই, পুরোটা শক্ত মাটি। ফলে বৃষ্টির পানি ভূগর্ভে নামতে পারে না। গত ৫০ বছরে ভূগর্ভস্থ পানির স্তর প্রায় ৮০ মিটার নিচে নেমে গেছে। পুকুর-খালসহ জলাধার শুকিয়ে যাওয়ায় পানি পুনরায় সংরক্ষণও সম্ভব হচ্ছে না।
বৃষ্টিপাত কমার পাশাপাশি তাপমাত্রা বেড়ে কৃষি আরও বড়ো সংকটে পড়েছে। আবহাওয়াবিদদের হিসেবে, রাজশাহীতে প্রতি দশকে গড় তাপমাত্রা বেড়েছে ০.৫° সেলসিয়াস। এতে পোকামাকড়ের প্রজনন বাড়ছে— বিশেষ করে বাদামি ঘাসফড়িংয়ের আক্রমণ দেখা দিচ্ছে। এতে ধান ফসল ব্যাপক ক্ষতিগ্রস্ত হয়। প্রতিরোধে কৃষকেরা বেশি কীটনাশক ব্যবহার করছেন— যা খাদ্য নিরাপত্তার জন্য নতুন ঝুঁকি।
রাজশাহীর কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের অতিরিক্ত উপপরিচালক (ফসল) শারমিন সুলতানা বলেন, মার্চ থেকেই রাজশাহীতে তাপমাত্রা বাড়তে থাকে। গড় তাপমাত্রা ৩৫ ডিগ্রি সেলসিয়াস ছাড়ালে বোরো ধানের পরাগায়ন মারাত্মকভাবে বাধাগ্রস্ত হয়। মে মাসে মাঠে কাজ করতে গিয়ে অনেক কৃষক হিটস্ট্রোকে আক্রান্ত হন। তাপ, পানি সংকট ও রোগবালাই মিলিয়ে উৎপাদন কমছে; ফসলের গুণগত মানও ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, বৃষ্টিপাতের ঘাটতি, তাপমাত্রা বৃদ্ধি, ভূগর্ভস্থ পানি স্তর কমে যাওয়া, অতিরিক্ত সেচনির্ভরতা, পরিবেশ ধ্বংস— সব মিলিয়ে বরেন্দ্র অঞ্চল এখন টিকে থাকার লড়াইয়ে। যে জমিতে তিন ফসল হতো— সেই জমি এখন চৌচির; খরচ বাড়ছে, আয় কমছে, মানুষ ঋণে জর্জরিত। পরিবার চালানো দায় হয়ে দাঁড়িয়েছে অনেক কৃষকের।
তারা বলছেন, পানি ব্যবস্থাপনা এখন সময়ের দাবি। বৃষ্টির পানি সংরক্ষণ, গভীর নলকূপ নিয়ন্ত্রণ, খাল–পুকুর পুনরুদ্ধার, খরা–সহনশীল বীজ, কৃষি ভর্তুকি বৃদ্ধি— এসব না হলে ভয়াবহ খাদ্যসংকট দেখা দিতে পারে। কৃষকেরা বলছেন—“আমরা লড়ছি। কিন্তু পানির সঙ্গে লড়াই, প্রকৃতির সঙ্গে লড়াই— এটা একা সম্ভব না। সরকারের সহযোগিতাই একমাত্র ভরসা।”
জলবায়ু পরিবর্তন ও পানি সংকট বরেন্দ্রভূমির কৃষিকে আজ বিপন্ন করে তুলেছে। সময় থাকতে পানি–ব্যবস্থাপনা, বিজ্ঞানভিত্তিক কৃষিনীতি ও কৃষকদের সুরক্ষায় পদক্ষেপ না নেওয়া হলে ধানের ভাণ্ডার বরেন্দ্র— পরিণত হবে মরুময় নিষ্ফলা ভূমিতে।
স্বদেশ প্রতিদিন/ নিয়াজ