
বাংলাদেশের অর্থনীতির প্রাণশক্তি কৃষি। এই কৃষিই একদিন আমাদের খাদ্যে স্বয়ংসম্পূর্ণতা এনে দিয়েছিল। কিন্তু আজ সেই কৃষি খাতেই ভর করেছে গভীর হতাশা। কৃষক মাঠে ঘাম ঝরালেও তার ফসলের ন্যায্য মূল্য সে পাচ্ছে না। মধ্যস্বত্বভোগী আর দালালদের দৌরাত্ম্যে কৃষকের পরিশ্রমের ফল শহরের বাজারে পৌঁছাতে পৌঁছাতে এমন দাম হয়ে যায়, যা মধ্যবিত্তের নাগালের বাইরেও চলে যায়। একদিকে কৃষক ক্ষতির মুখে, অন্যদিকে ভোক্তা কষ্টে এই অদ্ভুত বৈপরীত্য এখন আমাদের কৃষি ব্যবস্থার করুণ বাস্তবতা।
গ্রামের কৃষকরা সারাদিন মাটি কেটে, রোদে পুড়ে, ঘাম ঝরিয়ে যে ফসল ফলান, সেই ফসল বিক্রি করতে গেলে তাদের চোখে জল আসে। ধান কেজিপ্রতি ২৫–৩০ টাকা দরে বিক্রি করে কৃষক যখন হিসাব মেলান, তখন বুঝতে পারেন তার উৎপাদন ব্যয়ই তুলনায় বেশি। জমি প্রস্তুত করা, সার–বীজ–পানি–কীটনাশক, শ্রমিকের মজুরি সবকিছুর দাম দিন দিন বাড়ছে, অথচ ফসলের দাম বাড়ছে না। বাজারে দালাল আর পাইকাররা মিলে কৃষকের মুখের হাসি কেড়ে নিচ্ছে। ফলে কৃষক ক্রমেই নিরুৎসাহিত হচ্ছেন, কৃষিতে আগ্রহ হারাচ্ছেন।
অন্যদিকে শহরের বাজারে দেখা যায় উল্টো চিত্র। যে পেঁয়াজ কৃষক বিক্রি করেন কেজি প্রতি ৩০ টাকায়, সেই পেঁয়াজই শহরের বাজারে পৌঁছাতে পৌঁছাতে হয় ৯০ বা ১০০ টাকা। টমেটো, আলু, মরিচ-সবজির ক্ষেত্রেও একই চিত্র। কৃষক ক্ষতিগ্রস্ত, আর ভোক্তা রীতিমতো বিপর্যস্ত। এমন এক অদ্ভুত বাজার ব্যবস্থা, যেখানে কেউ লাভবান হচ্ছে না, তবুও দালালদের পকেট ফুলে-ফেঁপে উঠছে। কৃষক জানে, তার পরিশ্রমের সঠিক মূল্য সে পায়নি; আর ভোক্তা জানে, সে ন্যায্য দামে কিনতে পারছে না।
এই বাস্তবতাই কৃষিতে আগ্রহ হ্রাসের মূল কারণ। এখন অনেক কৃষকই বিকল্প পেশার দিকে ঝুঁকছেন। কেউ বিদেশে যাওয়ার চেষ্টা করছেন, কেউ ছোট ব্যবসায় নেমেছেন, কেউবা চাকরির সন্ধানে শহরমুখী হচ্ছেন। ফলে জমি পড়ে আছে অনাবাদি, উৎপাদন কমছে, আর খাদ্য নিরাপত্তা হুমকির মুখে পড়ছে।
কৃষি অর্থনীতিবিদরা বলছেন, কৃষককে বাঁচাতে হলে প্রথমেই দরকার ন্যায্য মূল্য নিশ্চিত করা। সরকারকে এমন একটি বাজার কাঠামো গড়ে তুলতে হবে যেখানে কৃষক সরাসরি ভোক্তার কাছে বিক্রি করতে পারেন, কিংবা সরকারি হস্তক্ষেপে মধ্যস্বত্বভোগীর সংখ্যা কমানো যায়। ডিজিটাল কৃষি বাজার, কৃষিপণ্য সংরক্ষণের জন্য পর্যাপ্ত কোল্ড স্টোরেজ, এবং সহজ শর্তে কৃষিঋণ-এসব ব্যবস্থা গ্রহণ করা গেলে কৃষকের জীবন অনেকটা বদলে যাবে।
এছাড়াও কৃষকদের প্রশিক্ষণ ও প্রযুক্তিগত সহায়তা বাড়াতে হবে। আধুনিক কৃষি যন্ত্রপাতি, উন্নত বীজ, সেচ ব্যবস্থা এসবের মাধ্যমে উৎপাদন খরচ কমানো সম্ভব। তবে উৎপাদন যতই হোক, যদি বিক্রির সময় ন্যায্য দাম না মেলে, তবে সেই উৎপাদন কৃষকের কাছে কোনো সুখবর নয়।
ভোক্তাদের দিক থেকেও সচেতনতা জরুরি। অনেক সময় আমরা শহুরে মানুষ শুধু বাজারের দাম নিয়ে ক্ষোভ প্রকাশ করি, কিন্তু ভাবি না, কৃষক কত কষ্টে সেই ফসল ফলাচ্ছেন। কৃষকের প্রতি শ্রদ্ধা এবং তার পরিশ্রমের যথাযথ মূল্য দেওয়ার মনোভাব গড়ে তুলতে হবে।
আজ সময় এসেছে, কৃষিকে শুধুমাত্র উৎপাদনের খাত না ভেবে একে জাতির মেরুদণ্ড হিসেবে বিবেচনা করার। কৃষক বাঁচলে দেশ বাঁচবে—এ কথা শুধু স্লোগান নয়, বাস্তব সত্য। কৃষক যদি ফসলের ন্যায্য মূল্য না পান, তবে একদিন সেই ফসলই আমাদের প্লেটে উঠবে না।
অতএব, সরকারের পাশাপাশি সমাজের প্রতিটি শ্রেণিকে একসাথে কাজ করতে হবে। দালালচক্রের দৌরাত্ম্য বন্ধ করে কৃষক ও ভোক্তার মধ্যে সরাসরি সংযোগ স্থাপন করতে হবে। তবেই আমরা এক সমৃদ্ধ ও ন্যায়ভিত্তিক কৃষি ব্যবস্থা গড়ে তুলতে পারব যেখানে কৃষকের ঘাম আর কান্না নয়, থাকবে পরিশ্রমের গৌরব আর ন্যায্যতার আনন্দ।
লেখকঃ শিক্ষক ও সমাজকর্মীস্বদেশ প্রতিদিন/কেআইকে