
বাংলাদেশের শিক্ষাব্যবস্থায় এক গভীর পরিবর্তন নীরবে ঘটছে। একসময়ের গর্ব — সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়গুলো — এখন ক্রমে হারাচ্ছে শিক্ষার্থীদের আগ্রহ ও অভিভাবকদের আস্থা। অন্যদিকে, গ্রামের পর গ্রামে, শহরের অলিতে-গলিতে নতুন করে গড়ে উঠছে মাদ্রাসা শিক্ষা প্রতিষ্ঠান, যেখানে শিক্ষার্থী ভর্তি হচ্ছে দ্রুতহারে। প্রশ্ন উঠছে— কেন সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়গুলো দিন দিন জনশূন্য হয়ে পড়ছে, আর কেনই বা মাদ্রাসা শিক্ষার প্রবণতা এত বাড়ছে?
প্রথমত, সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়গুলোতে শিক্ষার মান এখন অনেকাংশেই প্রশ্নবিদ্ধ। শিক্ষক সংকট, প্রশাসনিক জটিলতা, ও শিক্ষার্থীদের অমনোযোগী মনোভাব— এই তিনটি কারণেই মানসম্মত শিক্ষা প্রদান প্রায় অসম্ভব হয়ে পড়েছে। অনেক বিদ্যালয়ে এখনো পর্যাপ্ত শিক্ষক নেই, বিশেষ করে ইংরেজি ও গণিত বিষয়ে যোগ্য শিক্ষক পাওয়া দুষ্কর। তদুপরি, কিছু শিক্ষক দায়িত্ববোধ হারিয়ে ফেলেছেন; অনেকে শুধু উপস্থিতির খাতা পূরণেই ব্যস্ত।
দ্বিতীয়ত, বিদ্যালয়গুলোতে আধুনিক শিক্ষা পদ্ধতি ও প্রযুক্তির ব্যবহার সীমিত। আজকের শিশুরা ইন্টারনেট, স্মার্টফোন ও ভিডিও-ভিত্তিক শেখার যুগে বড় হচ্ছে, কিন্তু সরকারি বিদ্যালয়ে এখনো ব্ল্যাকবোর্ড ও চকেই সীমাবদ্ধ শিক্ষা কার্যক্রম। ফলে শিক্ষার্থীরা আকর্ষণ হারাচ্ছে, শিক্ষা তাদের কাছে একঘেয়ে ও অনুপ্রেরণাহীন মনে হচ্ছে।
অন্যদিকে, মাদ্রাসা শিক্ষার দিকে অভিভাবক ও শিক্ষার্থীদের ঝোঁক বাড়ছে কয়েকটি সামাজিক ও ধর্মীয় কারণে। অনেকেই মনে করেন, মাদ্রাসায় সন্তান পাঠালে অন্তত ধর্মীয় নৈতিকতা অর্জিত হবে, সন্তান “ভালো মানুষ” হবে। আবার, অনেক মাদ্রাসায় থাকা-খাওয়ার সুব্যবস্থা থাকায় দরিদ্র পরিবারের কাছে এটি একটি বাস্তবসম্মত বিকল্প। বিশেষ করে গ্রামীণ ও নিম্নআয়ের পরিবারের জন্য এটি সন্তান শিক্ষার একমাত্র সাশ্রয়ী পথ।
তবে, মাদ্রাসা শিক্ষার মান নিয়েও বড় প্রশ্ন রয়েছে। অধিকাংশ কওমি ও আলিয়া মাদ্রাসায় শিক্ষার মান নিয়ন্ত্রণের কোনো কার্যকর ব্যবস্থা নেই। পাঠ্যসূচি এখনো যুগোপযোগী নয়; বিজ্ঞান, তথ্যপ্রযুক্তি ও সমসাময়িক জ্ঞান সেখানে প্রায় অনুপস্থিত। ফলে এই শিক্ষার্থীরা মূলধারার কর্মক্ষেত্রে প্রতিযোগিতায় পিছিয়ে পড়ছে। একইভাবে, সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়গুলোতেও মাননিয়ন্ত্রণের কার্যকর কোনো প্রাতিষ্ঠানিক ব্যবস্থা নেই। উপরের দিক থেকে মাঝে মাঝে তদারকি হয়, কিন্তু তা টেকসই নয় এবং শিক্ষার্থীদের শেখার ফলাফলে প্রভাব ফেলতে ব্যর্থ।
মূলত, দুটি ব্যবস্থারই অভিন্ন সমস্যা হলো গুণগত মানের অভাব ও জবাবদিহিতার সংকট। সরকারের নীতিনির্ধারকরা বারবার অবকাঠামো উন্নয়নে জোর দিচ্ছেন— ভবন, বেঞ্চ, মিডডে মিল— কিন্তু শিক্ষার মূল মান উন্নয়নের দিকে মনোযোগ কম। শিক্ষক প্রশিক্ষণ, ক্লাস মনিটরিং, ও শিক্ষার্থীদের শেখার অগ্রগতি মূল্যায়ন— এগুলো ছাড়া কোনো শিক্ষা ব্যবস্থা টেকসই হতে পারে না।
এখন সময় এসেছে এক নতুন দৃষ্টিভঙ্গি নিয়ে ভাবার। সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়কে আবার জনপ্রিয় ও বিশ্বাসযোগ্য করতে হলে শিক্ষার মান নিশ্চিত করতে হবে। প্রযুক্তি, প্রশিক্ষিত শিক্ষক, ও আকর্ষণীয় পাঠদানের মাধ্যমে শিশুদের শেখার আগ্রহ ফিরিয়ে আনতে হবে। পাশাপাশি, মাদ্রাসা শিক্ষাকেও জাতীয় মূলধারার সঙ্গে সম্পৃক্ত করতে হবে— যাতে ধর্মীয় শিক্ষার পাশাপাশি আধুনিক জ্ঞান, বিজ্ঞান ও ভাষা দক্ষতার বিকাশ ঘটে।
শিক্ষা হলো জাতির মেরুদণ্ড। এই মেরুদণ্ড যদি দুর্বল হয়ে পড়ে, তবে জাতির ভবিষ্যৎও টিকবে না। সরকারি বিদ্যালয় হোক বা মাদ্রাসা— উভয় ক্ষেত্রেই মান, আধুনিকতা ও নৈতিকতার সমন্বিত চর্চা এখন সময়ের দাবি।
লেখকঃ শিক্ষক ও সমাজকর্মী
স্বদেশ প্রতিদিন/ এমএস