
কুমিল্লার মুরাদনগর উপজেলা থেকে প্রতিদিন বিপুল পরিমাণ প্রাকৃতিক গ্যাস উত্তোলন হলেও, আবাসিক খাতে জ্বালানি গ্যাসের সুবিধা থেকে বঞ্চিত রয়েছেন এলাকার প্রায় ৯০ শতাংশ পরিবার। মুরাদনগরকে 'প্রাকৃতিক গ্যাসের নগরী' বলা হলেও, এখানকার উৎপাদিত গ্যাস দেশের বৃহৎ শিল্প ও দূরবর্তী আবাসিক খাতে সরবরাহ হওয়ায়, স্থানীয় হাজার হাজার পরিবারকে এখনো নির্ভর করতে হচ্ছে লাকড়ি, খড় ও সিলিন্ডার গ্যাসের উপর। এ যেন প্রবাদের 'বাতির নীচে অন্ধকার'এর বাস্তব প্রতিচ্ছবি।
মুরাদনগর উপজেলায় অবস্থিত বাখরাবাদ গ্যাস ফিল্ড, বাঙ্গরা গ্যাস ফিল্ড এবং শ্রীকাইল-৩ (মুকলিশপুর) গ্যাস ফিল্ড থেকে দৈনিক প্রায় ৬০ মিলিয়ন ঘনফুট গ্যাস জাতীয় গ্রিডে যুক্ত হচ্ছে। বিশেষত বাখরাবাদ একাই প্রতিদিন ৩০-৩৫ মিলিয়ন ঘনফুট গ্যাস সরবরাহ করে। শ্রীকাইল থেকে ২০-২৫ মিলিয়ন এবং বাঙ্গরা থেকে ৭ মিলিয়ন ঘনফুট গ্যাস উত্তোলন করা হচ্ছে। এই গ্যাস দিয়েই মূলত ঢাকা সহ দেশের বিভিন্ন প্রান্তে কল-কারখানা ও লাখ লাখ বাসা-বাড়ির চাহিদা মেটানো হচ্ছে।
মুরাদনগরের ২২টি ইউনিয়ন ও ৩০৮টি গ্রামের মধ্যে মাত্র ১২ হাজার গ্রাহক আবাসিক খাতে প্রাকৃতিক গ্যাস ব্যবহার করছেন, যা মোট পরিবারের শতকরা মাত্র ১০ ভাগ। মুরাদনগর সদর ছাড়া অন্যান্য ইউনিয়নে গ্যাস ব্যবহারকারী পরিবারের সংখ্যা অত্যন্ত নগণ্য। গ্যাস না থাকায় লক্ষাধিক পরিবারের রান্নার একমাত্র ভরসা এখনো মাটির চুলা, লাকড়ি ও গাছের শুকনো পাতা। বহুতল ভবনের মালিকরাও চরম দুর্ভোগে পড়েছেন।
স্থানীয়রা জানান, মুরাদনগর উপজেলা প্রাকৃতিক গ্যাসের উপর 'ভাসমান' বলে পরিচিত। এতো সম্পদ থাকা সত্ত্বেও গ্যাস না পাওয়ায় ক্ষোভ বিরাজ করছে। ২০১৪ সালে "আমাদের গ্যাস আমাদের অধিকার" দাবিতে এলাকার লক্ষাধিক মানুষের গণ স্বাক্ষর সংবলিত একটি আবেদন তৎকালীন প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ে জমা দেওয়া হয়েছিল। তবে এক যুগ পেরিয়ে গেলেও সেই লালিত স্বপ্ন অধরাই রয়ে গেছে।
এ প্রসঙ্গে বাখরাবাদ গ্যাস ফিল্ড সংলগ্ন জাহাপুর ইউনিয়নের চেয়ারম্যান সৈয়দ সওকত আহমেদ মীর বলেন, "এ উপজেলায় উত্তোলিত প্রাকৃতিক গ্যাস রাজধানী ঢাকা সহ দেশের বিভিন্ন স্থানে ব্যবহৃত হচ্ছে, অথচ মুরাদনগরবাসীই বঞ্চিত। আমাদের প্রাণের দাবি, আমাদের এলাকায় উৎপাদিত গ্যাস যেন আমরা ব্যবহারের সুযোগ পাই, সরকার যথাযথ ব্যবস্থা নিক।"
বাখরাবাদ গ্যাস ফিল্ড কোম্পানির ডিজিএম মোঃ আব্দুর রফিক প্রমাণিক জানান, গ্যাস উৎপাদন করে জাতীয় গ্রিডে যুক্ত করা তাদের কাজ। গ্যাস বিপণন বা সংযোগ দেওয়ার কাজটি গ্যাস ডিস্ট্রিবিউশন কোম্পানিগুলির এখতিয়ার।
গ্যাস সংকটের কারণে সরকার আবাসিক খাতে নতুন গ্যাস সংযোগ বন্ধ রেখেছে। যদিও স্থানীয়ভাবে গ্যাস উৎপাদিত হয়, কিন্তু জাতীয় নীতি অনুযায়ী স্থানীয় চাহিদা পূরণের চেয়ে জাতীয় গ্রিডের স্থিতিশীলতা রক্ষাকে অগ্রাধিকার দেওয়া হয়। তবে, এই নীতি মুরাদনগরবাসীর জন্য এক গভীর বঞ্চনা তৈরি করেছে। দ্রুত গ্যাস সংযোগ না পেলে, গ্যাসের মজুত কমার সঙ্গে সঙ্গে এই এলাকার মানুষের গ্যাস পাওয়ার অনিশ্চয়তা আরও বাড়বে বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে।
স্বদেশ প্রতিদিন/ আরএফ