বৃহস্পতিবার ২৪ সেপ্টেম্বর ২০২৬
   
শিরোনাম:
দেশকে অস্থিতিশীল করার সুযোগ দেয়া হবে না       নৈরাজ্য ও ষড়যন্ত্রের বিরুদ্ধে মোংলায় বিএনপির বিক্ষোভ       আওয়ামী লী‌গের তিন নেতা গ্রেপ্তার      সাতক্ষীরায় জলবায়ু ন্যায়বিচার প্রকল্পের সমাপনী      সন্ত্রাসের মাধ্যমে দেশকে অস্থিতিশীল করার প্রতিবাদে বিক্ষোভ       আইনশৃঙ্খলা সভায় হট্টগোল, তর্কে জড়ালেন এমপি হান্নান      লাতিন আমেরিকার দুই দলকে হারাল জাপান-কোরিয়া      কিশোর গ্যাংয়ের সঙ্গে সম্পৃক্ততার সন্দেহে ৫১ কিশোর আটক      প্রথম ১৪ ওয়ানডেতেই ইতিহাস গড়লেন ম্যাথু ব্রিটজকে      ২৫ সেপ্টেম্বরের মুর্তজা কিজিলবাশের কনসার্ট স্থগিত      অঙ্কন-নন্দিতার দ্বৈত কণ্ঠে আজ প্রকাশিত হচ্ছে ‘মথুরা’      ফোটন সার্ভিস সেন্টারের উদ্বোধন      
হুমকিতে স্থানীয় জাতবৈচিত্র্য: বিঘ্নিত হতে পারে খাদ্য নিরাপত্তা
হাবিবুর রহমান সোহাগ, সাতক্ষীরা
প্রকাশ: রবিবার, ২ নভেম্বর, ২০২৫, ২:৪৫ AM

উচ্চফলনশীল ও হাইব্রিড ধানের যুগে হারিয়ে যেতে বসেছে বাংলাদেশের স্থানীয় ধানজাত বৈচিত্র্য। অথচ জলবায়ু পরিবর্তনের অভিঘাতে যখন দেশের দক্ষিণাঞ্চল লবণাক্ততা, ঘূর্ণিঝড় ও জলাবদ্ধতার কবলে, তখন এই স্থানীয় জাতই হতে পারে ভবিষ্যৎ খাদ্য নিরাপত্তার আশার আলো।

সাতক্ষীরার উপকূলীয় উপজেলা শ্যামনগরের পশ্চিম কৈখালী গ্রামের কৃষক হাবিবুর রহমান নিজের পরীক্ষণ প্লটে ১৬২টি স্থানীয় জাতের ধান নিয়ে কাজ করছেন। বছরের পর বছর তিনি নিজেই এসব ধানের বীজ সংরক্ষণ করে রাখেন এবং আশপাশের কৃষকদেরও দেন।

কৃষক হাবিবুর রহমান বলেন, স্থানীয় বীজই আসলে মাদার বীজ। উফশী বা হাইব্রিড জাতীয় ধান তৈরি করতে গেলে স্থানীয় বীজের সংকরায়ন ছাড়া সেটা সম্ভব নয়। আমাদের অঞ্চলে পানি ও মাটির লবণাক্ততা বেশি, যেহেতু এটি জোয়ারভাটার এলাকা। স্থানীয় জাতগুলো এসব পরিস্থিতিতে টিকে থাকতে পারে।

তিনি আরো বলেন , স্থানীয় জাতের ধান শুধু লবণাক্ততা নয়, বরং জলাবদ্ধতা ও খরার বিরুদ্ধেও সহনশীল। এই জাতগুলোতে রাসায়নিক সার ও কীটনাশকের ব্যবহার কম লাগে, আর বীজ সংরক্ষণও সম্ভব হয়। কিন্তু হাইব্রিড জাতের ক্ষেত্রে বীজ সংরক্ষণ করা যায় না—ফলে কৃষক বারবার কোম্পানির কাছে নির্ভরশীল হয়ে পড়ছেন।

স্থানীয় জাত বনাম হাইব্রিড: গবেষণার দৃষ্টিতে

বাংলাদেশ রিসোর্স সেন্টার ফর ইন্ডিজেনাস নলেজ (বারসিক)-এর কর্মকর্তা বিশ্বজিৎ মণ্ডল বলেন, বিজ্ঞানীরা যেসব উচ্চ ফলনশীল বা হাইব্রিড জাত উদ্ভাবন করেন, তার মূল উৎস কিন্তু স্থানীয় জাত। স্থানীয় জাত সংরক্ষণ না করলে ভবিষ্যৎ গবেষণা, জলবায়ু অভিযোজন, এমনকি খাদ্য নিরাপত্তাও হুমকির মুখে পড়বে। কিন্তু বাস্তবে সরকারি পৃষ্ঠপোষকতা দেওয়া হচ্ছে হাইব্রিড বীজকেই, স্থানীয় জাতকে নয়।”

বিশ্বজিৎ মণ্ডল আরও বলেন, স্থানীয় জাতগুলো প্রাকৃতিকভাবে অভিযোজিত। জলবায়ু পরিবর্তনের ফলে সৃষ্ট নতুন নতুন চ্যালেঞ্জ—যেমন লবণাক্ততা, অতিবৃষ্টি, খরা বা অপ্রত্যাশিত তাপমাত্রা—এসব মোকাবেলায় স্থানীয় জাতের ভূমিকা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।

সাতক্ষীরার প্রধান বৈজ্ঞানিক ও ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা বিনা ড. মো. কামরুজ্জামান বলেন, আমরা এখানে যে পদ্ধতিটি অবলম্বন করি, তা হলো গামা রেডিয়েশনের মাধ্যমে ফসলের বৈশিষ্ট্য পরিবর্তন করে নতুন জাত উদ্ভাবন করা। এখানে স্থানীয় যেসব জাত রয়েছে, তাদের কিছু বিশেষ বৈশিষ্ট্য আছে। এই স্থানীয় জাতগুলো রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতাসম্পন্ন এবং সংশ্লিষ্ট অঞ্চলের ঝুঁকি মোকাবিলা করে টিকে আছে। তবে সমস্যা হলো,এই জাতগুলো অধিক ফলনশীল নয়।এই কারণেই আমরা যখন নতুন জাত উদ্ভাবন করি, তখন লক্ষ্য থাকে,অধিক ফলনশীল জাতের সঙ্গে স্থানীয় জাতের বিশেষ বৈশিষ্ট্যগুলো সংযুক্ত করা। এতে একদিকে যেমন উচ্চ ফলন পাওয়া যায়, অন্যদিকে ঝুঁকি মোকাবেলার ক্ষমতাও বজায় থাকে। এর ফলে কৃষক লাভবান হন।

তিনি আরও বলেন,আপনারা জানেন, হাইব্রিড বীজের কিছু সীমাবদ্ধতা রয়েছে। হাইব্রিড বীজ ফলন দিলেও কৃষক সেই বীজ সংরক্ষণ করতে পারেন না,এটাই বড় অন্তরায়। ইনব্রিড বীজের দাম যেখানে প্রতি কেজি ৫০ টাকা, সেখানে হাইব্রিড বীজের দাম ৩০০–৪০০ টাকা পর্যন্ত। আবার অনেক সময় কৃত্রিম সংকট দেখিয়ে ব্যবসায়ীরা প্রতি কেজি হাজার টাকাও নিচ্ছেন, যা আমাদের কৃষকদের জন্য অত্যন্ত ভোগান্তিকর।

কৃষি মন্ত্রণালয় থেকে টেকসই উন্নয়ন অভীষ্ট (SDG) ২০৩০ অ্যাকশন প্ল্যানের অংশ হিসেবে জিন প্লাজম (Gene Plasma) সংরক্ষণের একটি লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়েছে। বিশেষ করে ধান, পাট, ইক্ষু ও ডালজাতীয় ফসলের স্থানীয় জাতগুলো সংরক্ষণে গবেষণা প্রতিষ্ঠানগুলো কাজ করছে, যাতে বাংলাদেশের নিজস্ব জিনভাণ্ডার সুরক্ষিত থাকে।

গবেষণা বলছে, হারিয়ে যাচ্ছে বৈচিত্র্য, বাড়ছে ঝুঁকি,একসময় বাংলাদেশে প্রায় ১০ হাজারেরও বেশি স্থানীয় ধানজাত চাষ হতো। এখন টিকে আছে অল্প কয়েকশ। হাইব্রিড ও উফশী জাতের আগ্রাসনে অনেক স্থানীয় বীজ হারিয়ে গেছে। ফলে খাদ্য ব্যবস্থায় বৈচিত্র্য কমছে, আর কৃষক নির্ভরশীল হয়ে পড়ছে বহুজাতিক বীজ কোম্পানির ওপর।

করণীয়: স্থানীয় বীজ সংরক্ষণে সরকার কৃষকের যৌথ উদ্যোগ, স্থানীয় বীজ সংরক্ষণে গ্রামীণ বীজ ব্যাংক স্থাপন করা জরুরি,কৃষক পর্যায়ে প্রশিক্ষণ ও প্রণোদনা দিতে হবে,গবেষণা বাজেটে স্থানীয় জাতের জন্য বিশেষ বরাদ্দ রাখা দরকার, সরকারি বীজ বোর্ডে স্থানীয় জাত নিবন্ধন প্রক্রিয়া সহজ করতে হবে

কৃষিবিদদের মতে, স্থানীয় বীজ সংরক্ষণ শুধু কৃষকের স্বাধীনতা নয়, বরং এটি খাদ্য সার্বভৌমত্বের অংশ,স্থানীয় বীজ সংরক্ষণ শুধু কৃষকের স্বাধীনতা নয়, বরং এটি খাদ্য সার্বভৌমত্বের অংশ। ভূ-রাজনীতিতে তেল, গ্যাস ও খাদ্যশস্যের পর “বীজ”–ও একসময় হয়ে উঠবে কৌশলগত নিয়ামক—এমনটি সহজেই অনুমেয়। তাই জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাব মোকাবেলা করে খাদ্যশস্য উৎপাদনের লক্ষ্যে স্থায়িত্বশীল কৃষি ব্যবস্থা গড়ে তুলতে স্থানীয় জাতের বীজ সংরক্ষণ ও সম্প্রসারণে রাষ্ট্রীয় উদ্যোগ এখন সময়ের দাবি।

স্বদেশ প্রতিদিন/ নিয়াজ




আরও সংবাদ   বিষয়:  হুমকি   স্থানীয়   জাতবৈচিত্র্য   বিঘ্নিত   খাদ্য নিরাপত্তা  






Loading...
Loading...
এই ক্যাটেগরির আরো সংবাদ  
অনুসরণ করুন
     
সম্পাদক ও প্রকাশক : মোঃ মজিবুর রহমান চৌধুরী
স্বদেশ গ্লোবাল মিডিয়া লিমিটেড -এর পক্ষে প্রকাশক কর্তৃক সিটি পাবলিশিং লি, আর কে মিশন রোড, ঢাকা-১২০৩ থেকে মুদ্রিত ও ১০, তাহের টাওয়ার, গুলশান সার্কেল-২ থেকে প্রকাশিত।
ফোন: ৯৮৫১৬২০, ৮৮৩২৬৪-৬, ফ্যাক্স: ৮৮০-২-৯৮৯৩২৯৫। ই-মেইল : [email protected], [email protected]
🔝
close
অনুসরণ করুন
     
সম্পাদক ও প্রকাশক : মোঃ মজিবুর রহমান চৌধুরী
স্বদেশ গ্লোবাল মিডিয়া লিমিটেড -এর পক্ষে প্রকাশক কর্তৃক সিটি পাবলিশিং লি, আর কে মিশন রোড, ঢাকা-১২০৩ থেকে মুদ্রিত ও ১০, তাহের টাওয়ার, গুলশান সার্কেল-২ থেকে প্রকাশিত।
ফোন: ৯৮৫১৬২০, ৮৮৩২৬৪-৬, ফ্যাক্স: ৮৮০-২-৯৮৯৩২৯৫। ই-মেইল : [email protected], [email protected]
🔝
close