
দেশে প্রাপ্তবয়স্কদের প্রায় ১৯ শতাংশ এবং শিশু-কিশোরদের ১৪ দশমিক ৫ শতাংশ মানসিক স্বাস্থ্য সমস্যায় আক্রান্ত। তবে এসব সমস্যায় ভোগা ব্যক্তিদের ৯২ শতাংশ চিকিৎসাসেবা নেন না, যদি না অবস্থা গুরুতর হয়ে ওঠে। শুধু চিকিৎসা গ্রহণে অনীহাই নয়, মানসিক স্বাস্থ্যসেবায় রয়েছে জনবল ঘাটতি, প্রতিকূল পরিবেশ, রেফারেল সংকট ও বাজেটের সীমাবদ্ধতাও।
‘বিপর্যয় ও জরুরি পরিস্থিতিতে মানসিক স্বাস্থ্য’ শীর্ষক এক গোলটেবিল বৈঠকে এই তথ্য উঠে আসে। বৃহস্পতিবার দুপুরে জাতীয় মানসিক স্বাস্থ্য ইনস্টিটিউটের সভাকক্ষে আয়োজিত এ অনুষ্ঠানের আয়োজন করে কালের কণ্ঠ এবং সহযোগিতা করে ইনসেপ্টা ফার্মাসিউটিক্যালস লিমিটেড।
বৈঠকে জুলাই মাসের গণঅভ্যুত্থানে আহতদের মানসিক অবস্থা এবং মাইলস্টোন স্কুল অ্যান্ড কলেজে বিমান দুর্ঘটনা-পরবর্তী মানসিক প্রভাব নিয়ে দুটি প্রবন্ধ উপস্থাপন করা হয়।
জাতীয় মানসিক স্বাস্থ্য ইনস্টিটিউটের সহযোগী অধ্যাপক ডা. মুনতাসীর মারুফ জানান, জাতীয় চক্ষুবিজ্ঞান ইনস্টিটিউটের ৫৫ জন ও অর্থোপেডিক হাসপাতালে ভর্তি ৬৪ জন রোগীর ওপর করা জরিপে দেখা গেছে— এক-চতুর্থাংশ রোগী গুরুতর বিষণ্নতায় এবং এক-তৃতীয়াংশ গুরুতর উদ্বেগে ভুগছেন। অনেকেই মানসিক সমস্যার কথা প্রকাশ করতে চাননি; বরং বিদেশে চিকিৎসা ও আর্থিক সহায়তা চেয়েছেন, যা চিকিৎসা প্রক্রিয়াকে জটিল করেছে।
অন্যদিকে, মাইলস্টোন স্কুল অ্যান্ড কলেজে বিমান দুর্ঘটনা-পরবর্তী মানসিক প্রভাব নিয়ে প্রবন্ধ উপস্থাপন করেন ইনস্টিটিউটের রেজিস্ট্রার ডা. আরিফুজ্জামান। ২৫৫ জন শিক্ষক, শিক্ষার্থী ও অভিভাবকের ওপর করা জরিপে দেখা গেছে— ৭১ শতাংশ ঘুমের সমস্যা, ২৯ শতাংশ খিটখিটে মেজাজ, ২৬ শতাংশ ফ্লাশব্যাক ও ক্ষুধামান্দ্য, এবং ২০ শতাংশ মনোযোগের ঘাটতি ও কাজে অনাগ্রহে ভুগছেন।
জাতীয় মানসিক স্বাস্থ্য ইনস্টিটিউটের পরিচালক অধ্যাপক ডা. মো. মাহবুবুর রহমান বলেন, “বাংলাদেশে প্রতি এক লাখ মানুষের জন্য মাত্র ০.২ জন সাইকিয়াট্রিস্ট, ০.৫ জন নার্স এবং ০.৩ জন সাইকোলজিস্ট আছেন। মানসিক স্বাস্থ্যকর্মীর মোট সংখ্যা দাঁড়ায় প্রতি এক লাখে ১.৪ জন।”
তিনি আরও জানান, দেশের স্বাস্থ্য বাজেটের মাত্র ০.৪৪ শতাংশ মানসিক স্বাস্থ্যের জন্য বরাদ্দ এবং জেলা হাসপাতালে এখনো কোনো সাইকিয়াট্রিস্ট নেই। উপজেলা পর্যায়ে আগামী ১০ বছরেও সাইকিয়াট্রিস্ট নিয়োগ দেওয়া সম্ভব হবে কি না, তা নিয়েও সন্দেহ রয়েছে। তিনি দুর্যোগকালে ত্রাণের পাশাপাশি মানসিক স্বাস্থ্যসেবাও নিশ্চিত করার আহ্বান জানান।
বাংলাদেশ অ্যাসোসিয়েশন অব সাইকিয়াট্রিস্টসের সদস্যসচিব অধ্যাপক ডা. মো. নিজামউদ্দিন বলেন, “মানুষের সচেতনতা বাড়ছে, কুসংস্কার কিছুটা কমছে এবং সাইকিয়াট্রিস্টের সংখ্যাও ধীরে ধীরে বাড়ছে।” বর্তমানে চারটি প্রতিষ্ঠানে পোস্টগ্র্যাজুয়েট কোর্স চালু আছে, যেখানে প্রতিবছর ৪৪–৪৫ জন নতুন বিশেষজ্ঞ তৈরি হচ্ছে। তিনি বলেন, উপজেলা পর্যায়ের চিকিৎসকদের প্রাথমিক মানসিক স্বাস্থ্যসেবায় প্রশিক্ষিত করলে ভালো ফল পাওয়া যাবে। পাশাপাশি মানসিক স্বাস্থ্যসেবার ওষুধ সরবরাহ ও বাজেট বাড়ানোও জরুরি।
কালের কণ্ঠের সম্পাদক কবি হাসান হাফিজের সঞ্চালনায় আলোচনায় অংশ নেন— বিএসএমএমইউ মনোরোগবিদ্যা বিভাগের চেয়ারম্যান অধ্যাপক ডা. সালাহ্উদ্দিন কাউসার বিপ্লব, অধ্যাপক ডা. নাহিদ মাহজাবিন মোরশেদ, আল-মানার হাসপাতালের সিনিয়র পরামর্শক ডা. মো. আসাদ-উজ-জামান, জাতীয় মানসিক স্বাস্থ্য ইনস্টিটিউটের সহকারী অধ্যাপক ডা. মো. জোবায়ের মিয়া, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সহযোগী অধ্যাপক মো. শাহানূর হোসেন, মাইলস্টোন স্কুল অ্যান্ড কলেজের অধ্যক্ষ ক্যাপ্টেন (অব.) জাহাঙ্গীর আলম, ইনসেপ্টা ফার্মাসিউটিক্যালসের নির্বাহী পরিচালক আশরাফ উদ্দিন আহমেদ এবং কালের কণ্ঠের পরিকল্পনা সম্পাদক মাহবুবুল হক।
সূত্র: কালের কণ্ঠ
স্বদেশ প্রতিদিন/ আরএফ