
সংগৃহীত ছবি
সাপের মতো আকাবাকা, দুই বাংলার বুক চিরে প্রবাহিত মহানন্দা নদী প্রকৃতির অপরূপ সৌন্দর্যের এক অনন্য প্রতীক। হিমালয় পর্বতমালার দক্ষিণ-পশ্চিম অংশ থেকে উৎপত্তি হয়ে নদীটি প্রথমে ভারতের ফুলবাড়ি এলাকা অতিক্রম করে। এরপর বাংলাদেশের পঞ্চগড় জেলার তেঁতুলিয়া উপজেলায় প্রবেশ করে প্রায় ২০ কিলোমিটার আঁকাবাঁকা পথে চলাচল করে আবার ভারতের পশ্চিমবঙ্গের উত্তর দিনাজপুরে প্রবেশ করে। নদীটির দীর্ঘমেয়াদি প্রবাহে গড়ে উঠেছে একাধিক মানবজীবনের গল্প, ইতিহাস, এবং প্রকৃতির অসাধারণ দৃশ্যপট।
নদীর তীরে দাঁড়িয়ে পর্যটকরা উপভোগ করতে পারেন পৃথিবীর দুই সুউচ্চ পর্বতমালা হিমালয় ও কাঞ্চনজঙ্ঘা। এখানকার নদী কেন্দ্রীক দৃশ্যপট এবং নানান পর্যটন সম্ভাবনা স্থানীয় ও জাতীয় পর্যায়ে নজর কাড়ছে।
মহানন্দা নদীর বুকে প্রচুর নুড়ি-পাথর ও সিলিকা বালু রয়েছে, যা প্রায় ৩০ হাজার মানুষের জীবিকার মূল উৎস। নদীর পাথর উত্তোলন, বাছাই ও ব্যবসায় হাজারো পরিবার নির্ভরশীল।
প্রতিদিন ভোরের আলো ফুটতেই শ্রমিকরা নদীতে নামেন। তারা গাড়ির টিউব, লোহার চাকতি, ভেলা ও অন্যান্য সরঞ্জাম ব্যবহার করে পাথর তুলে পাড়ে আনে। একজন শ্রমিক দিনে ৫০০-৭০০ টাকা থেকে কখনো কখনো হাজার টাকা পর্যন্ত উপার্জন করতে পারেন। গ্রীষ্মের তপ্ত রোদ এবং শীতের বরফগলিত পানিতে পাথর তোলা তাদের জন্য এক হাড়ভাঙা পরিশ্রম।
শ্রমিকদের মধ্যে নারীরাও উল্লেখযোগ্য অংশগ্রহণ করেন। স্বামীহারা, পরিত্যক্তা, অসুস্থ স্বামী-সন্তানসহ অনেক নারী এই কাজে যুক্ত, পরিবারের জন্য দুমুঠো ভাত ও জীবিকা নিশ্চিত করে। এভাবে তারা নদীর পাথরের মাধ্যমে সন্তানদের লেখাপড়ার ব্যবস্থা করে, অনেকের সন্তান এখন দেশের বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়ে অধ্যয়নরত।
মহানন্দা নদী ভারত-বাংলাদেশ সীমান্তে প্রবাহিত হওয়ায় মাঝে মাঝে পাথর উত্তোলনে বাধা সৃষ্টি করে বিএসএফ। জীবিকার তাগিদে সীমান্ত পেরিয়ে পাথর উত্তোলনের সময় অনেক শ্রমিক গুলিবিদ্ধ হয়ে প্রাণ হারান।
তবে, দুই দেশের সীমান্তরক্ষী বাহিনী পতাকা বৈঠক ও মানবিক উদ্যোগ গ্রহণ করে শ্রমিকদের জীবন ও জীবিকা রক্ষায় কাজ করছেন। এছাড়াও স্থানীয় প্রশাসন, জনপ্রতিনিধি ও রাজনৈতিকভাবে শ্রমিকদের জীবনযাত্রা সচল রাখার ব্যবস্থা নিয়েছেন।
মহানন্দা নদী শুধু জীবনধারার কেন্দ্র নয়, পর্যটনের জন্যও এক অপার সম্ভাবনা তৈরি করেছে। নদীর তীরে দাঁড়িয়ে বিনা পাসপোর্টে ভারত ও নেপালের দৃশ্য উপভোগ করা যায়। নদীর তীরে ডাকবাংলো পিকনিক কর্ণার, ওয়াকওয়ে, পার্ক, আলোকসজ্জা ইত্যাদি নির্মাণ করা হয়েছে।
তেঁতুলিয়া উপজেলা নির্বাহী অফিসার (ইউএনও) আফরোজ শাহিন খসরু বলেন, মহানন্দা নদীর তীর পর্যটনের জন্য অত্যন্ত সম্ভাবনাময়। আমরা নিরাপদ পরিবেশ ও আধুনিক সুবিধা নিশ্চিত করছি। লক্ষ্য তেঁতুলিয়াকে পূর্ণাঙ্গ পর্যটন নগরী হিসেবে গড়ে তোলা।
রাতের সময় নদীর ওপারে ভারতের সার্চলাইট, চা বাগান, জেলেদের জীবন এবং নদীর শান্তি পর্যটকদের মুগ্ধ করে। হিমালয় ও কাঞ্চনজঙ্ঘার দৃশ্য, পাথর উত্তোলন ও নদীর শান্তি এক সঙ্গে উপভোগ করার সুযোগ মহানন্দা নদী পর্যটনকে বিশেষ গুরুত্ব দিয়েছে।
প্রসঙ্গত, মহানন্দা নদী প্রাচীনকালে প্রশস্ত ও গভীর ছিল। ১৮৭৬ সালে উইলিয়াম হান্টারের জরিপ অনুযায়ী নদীতে বড় বড় মালবাহী নৌকা চলাচল করত। নদীর পূর্ব অংশ বাংলাদেশের পঞ্চগড়, পশ্চিম অংশ ভারতের শিলিগুড়ি ও চটেরহাট। নব্বই দশকের পর ভারতের ফুলবাড়িতে বাঁধ নির্মাণের কারণে নদীর প্রাকৃতিক প্রবাহ পরিবর্তিত হয়েছে। বর্ষাকালে পানি বেড়ে বন্যা সৃষ্টি হয়, শীতে খর্র্রােতার রূপ নেয়।
স্বদেশ প্রতিদিন/শাহো