
সংগৃহীত ছবি
শরৎ ঋতুর মেঘমুক্ত আকাশে ভোরের আলো ফুটতেই উত্তর সীমান্তের আকাশে ধরা দিচ্ছে হিমালয়ের অপরূপ দৃশ্য। চোখের সামনে ভেসে উঠছে হিমালয়ের দ্বিতীয় উচ্চতম পর্বতশৃঙ্গ কাঞ্চনজঙ্ঘা। কখনো লালচে, কখনো কমলা, কখনো আবার সাদা রূপে সাজে এই মায়াবি পাহাড়। রূপশৈলীর মোহনীয়তায় মুগ্ধ হয়ে হাজারো পর্যটক ভিড় করছেন পঞ্চগড়ের তেঁতুলিয়ায়।
বাংলাদেশের সর্বউত্তরের জেলা পঞ্চগড় ‘হিমালয় কন্যা’ নামে পরিচিত। শরৎ ও শীতকাল এই জেলার প্রধান পর্যটন মৌসুম। দুর্গাপূজা ও সাপ্তাহিক ছুটি মিলিয়ে এ সময় তিনদিনের অবকাশ পেয়েছেন অনেকেই। ফলে রাজধানী ঢাকা, চট্টগ্রাম, বগুড়া, রংপুর, দিনাজপুর, ঠাকুরগাঁওসহ দেশের বিভিন্ন স্থান থেকে প্রতিদিন শত শত পর্যটক ছুটে আসছেন তেঁতুলিয়ায়।
ডাকবাংলো পিকনিক কর্ণার, মহানন্দা নদীর তীর, সবুজ চা বাগান, ইকো ট্যুরিজম পার্কসহ নানা স্পটে ভোর থেকে পর্যটকদের ভিড় দেখা যাচ্ছে। কেউ কাঞ্চনজঙ্ঘা দর্শন করছেন, কেউ আবার ছবি তুলে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে শেয়ার করছেন।
পর্যটক বাড়ায় তেঁতুলিয়ার হোটেল-মোটেলগুলোতে আগেই শুরু হয়েছে বুকিং প্রতিযোগিতা। দুই সপ্তাহ আগে থেকেই আবাসিক হোটেলগুলোর অধিকাংশ কক্ষ বুকড হয়ে গেছে।
হোটেল সীমান্তের পাড়ের পরিচালক ও পঞ্চগড় ট্যুরিজম ডেভেলপমেন্ট অ্যাসোসিয়েশনের সাধারণ সম্পাদক আতিকুজ্জামান শাকিল জানান, “পুজোর ছুটির কারণে প্রচুর পর্যটক তেঁতুলিয়ায় আসছেন। প্রতিদিন অসংখ্য ফোন পাচ্ছি। আমরা সর্বোচ্চ চেষ্টা করছি যেন তারা ভালোভাবে সেবা পান।”
এ সময় স্থানীয়রা জানান, পর্যটন মৌসুমে হোটেল-রেস্তোরাঁ, ভ্যান চালক থেকে শুরু করে চা-বাগানের রিসোর্ট পর্যন্ত সবাই ব্যস্ত হয়ে পড়েন। এতে স্থানীয় অর্থনীতিতেও প্রাণচাঞ্চল্য ফিরে আসে।
তথ্য অনুযায়ী, কাঞ্চনজঙ্ঘা পৃথিবীর তৃতীয় ও হিমালয় পর্বতমালার দ্বিতীয় উচ্চতম শৃঙ্গ। এর উচ্চতা প্রায় ২৮ হাজার ১৬৯ ফুট বা ৮ হাজার ৫৮৬ মিটার। ভারতীয় সিকিম রাজ্যের সঙ্গে নেপালের পূর্বাঞ্চলীয় সীমান্তে অবস্থিত এই পাহাড় থেকে চারটি নদীর উৎপত্তি হয়েছে, যেগুলোর কয়েকটি বাংলাদেশেও প্রবাহিত।
সেপ্টেম্বরের শুরু থেকে আকাশ মেঘমুক্ত থাকায় প্রতিদিন সকালেই দেখা যাচ্ছে কাঞ্চনজঙ্ঘার দৃশ্য। বিশেষ করে ভোরের প্রথম আলোয় পাহাড়টি লাল, কমলা, হলুদ থেকে ধীরে ধীরে সাদা রঙে রূপ নেয়। এ সময় অনেকেই বলেন, মনে হয় পাহাড় হাসছে।
শুধু কাঞ্চনজঙ্ঘা নয়, তেঁতুলিয়ায় রয়েছে অসংখ্য দর্শনীয় স্থান। ডাকবাংলো, মহানন্দার তীরে প্রাকৃতিক সৌন্দর্য, শতশত বছরের পুরাকীর্তি, প্রত্নতাত্ত্বিক নিদর্শন, দেড় হাজার বছরের মহারাজা দিঘী, পাথরের জাদুঘর, সবুজ চা বাগান, জিরোপয়েন্ট, বিজিবি-বিএসএফের জয়েন্ট রিট্রিট অনুষ্ঠান, কালিমন্দির, ইকো ট্যুরিজম পার্কের টিউলিপ গার্ডেন, মির্জাপুর শাহী মসজিদ, বারো আউলিয়া মাজার, গোলকধাম মন্দিরসহ নানা স্থানে ভ্রমণ করে পর্যটকেরা ইতিহাস ও প্রকৃতির মেলবন্ধন খুঁজে পান।
পর্যটকদের নিরাপত্তায় কাজ করছে ট্যুরিস্ট পুলিশ। পরিদর্শক কেএম আজমিরুজ্জামান বলেন, “তেঁতুলিয়া দেশের একটি গুরুত্বপূর্ণ পর্যটন এলাকা। পর্যটকদের জন্য সার্বক্ষণিক দায়িত্ব পালন করছি। প্রয়োজনে যোগাযোগের জন্য আমাদের কন্টাক্ট নম্বর বিলবোর্ডেও দেওয়া আছে।”
তেঁতুলিয়া উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা আফরোজ শাহীন খসরু বলেন, “পর্যটকদের জন্য সব ধরনের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। তারা যাতে স্বাচ্ছন্দ্যে ভ্রমণ করে আনন্দ উপভোগ করতে পারেন, প্রশাসন সেদিকে নজর রাখছে।”
স্থানীয়দের মতে, কাঞ্চনজঙ্ঘা ঘিরে সরকারি-বেসরকারিভাবে দ্রুত বিকশিত হচ্ছে পর্যটন শিল্প। আবাসন ব্যবস্থা, নতুন রিসোর্ট ও পর্যটক সেবা প্রতিষ্ঠান গড়ে উঠছে। ফলে কর্মসংস্থানও বাড়ছে।
‘তেঁতুলিয়া ট্রাভেল অ্যান্ড ট্যুরিজম’ নামের একটি স্থানীয় প্রতিষ্ঠান জানায়, কেবল পর্যটন মৌসুমেই স্থানীয় শত শত মানুষ কর্মসংস্থানের সুযোগ পান।
স্বদেশ প্রতিদিন/শাহো