
যারা ইমানের পথে অবিচল থাকে, তাদের জন্য আল্লাহর সাহায্য নিশ্চিত। কিন্তু যখন আমরা বিভেদ, বিচ্ছিন্নতা ও অপমানের মুখোমুখি হই, তখন তা আমাদের নিজেদের কৃতকর্মের ফল।
পবিত্র কোরআনে বলা হয়েছে, ‘যখন তোমাদের ওপর বিপদ এল, যদিও তোমরা তার দ্বিগুণ ক্ষতি করেছিলে, তখন তোমরা বললে, “এটা কীভাবে হলো?” বলো, “এটা তোমাদের নিজেদের থেকেই হয়েছে।” নিশ্চয়ই আল্লাহ সব কিছুর ওপর সর্বশক্তিমান।’
—সুরা আলে ইমরান, আয়াত: ১৬৫
ওহুদের যুদ্ধে সাহাবায়ে কেরাম রাসুল (সা.)-এর নির্দেশ অমান্য করার কারণে পরাজয়ের মুখোমুখি হয়েছিলেন। তিরন্দাজরা তাঁদের নির্ধারিত স্থান ত্যাগ করেছিলেন, যা যুদ্ধের ফলকে বদলে দিয়েছিল।
যদি সাহাবারা রাসুলের নির্দেশ অমান্য করেও বিজয়ী হতেন, তবে তাঁর নির্দেশের গুরুত্ব কমে যেত। তাই সাময়িক পরাজয়ের মাধ্যমে আল্লাহ তাঁদের শিক্ষা দিতে চেয়েছিলেন।
কোরআনে এ ঘটনার উল্লেখ আছে, ‘যতক্ষণ না তোমরা ব্যর্থ হলে বং আদেশ নিয়ে বিতর্কে জড়িয়ে পড়লে এবং অমান্য করলে, যদিও তিনি তোমাদের দেখিয়েছিলেন যা তোমরা ভালোবাসতে। তোমাদের মধ্যে কেউ এই দুনিয়া কামনা করে, আর কেউ আখিরাত কামনা করে।’
—সুরা আলে ইমরান, আয়াত: ১৫২
শাইখ মুহাম্মদ মুতাওয়াল্লি শারাভি (রহ.) বলেন, ‘যদি সাহাবারা রাসুল (সা.)-এর নির্দেশ অমান্য করেও বিজয়ী হতেন, তবে তাঁর নির্দেশের গুরুত্ব তাঁদের চোখে কমে যেত। তাই সাময়িক পরাজয়ের মাধ্যমে আল্লাহ তাঁদের শিক্ষা দিতে চেয়েছিলেন, যাতে তাঁরা রাসুলের নির্দেশের প্রতি অবিচল থাকেন।’
—তাফসিরে শারাভি, দারুল শুরুক, ১৯৯৭, পৃষ্ঠা ২৩৪
কোরআনে আল্লাহর প্রতিশ্রুতি, ‘যদি তোমরা আল্লাহকে সাহায্য করো, তিনি তোমাদের সাহায্য করবেন এবং তোমাদের পা অটল রাখবেন।’
—সুরা মুহাম্মদ, আয়াত: ৭
এই প্রতিশ্রুতি বদরের যুদ্ধে প্রমাণিত হয়েছিল, যখন সংখ্যায় কম ও দুর্বল মুসলিমরা আল্লাহর সাহায্যে বিজয় লাভ করেছিলেন।
‘এবং আল্লাহ তোমাদের বদরে বিজয় দিয়েছিলেন, যখন তোমরা সংখ্যায় কম ছিলে।’
—সুরা আলে ইমরান, আয়াত: ১২৩
আহযাবের যুদ্ধে মুসলিমরা চারদিক থেকে শত্রুর চাপে পড়েছিল। তখন কোরআন বলছে, ‘যখন তারা তোমাদের ওপর থেকে এবং নিচ থেকে এসেছিল, যখন চোখ বিস্ফারিত হয়েছিল এবং হৃদয় গলায় উঠে এসেছিল এবং তোমরা আল্লাহ সম্পর্কে সন্দেহ পোষণ করছিলে। সেখানে মুমিনদের পরীক্ষা করা হয়েছিল এবং তাদের তীব্রভাবে কাঁপানো হয়েছিল।’
—সুরা আহযাব, আয়াত: ১০-১১
তবু তাঁদের ধৈর্য ও ইমান বিজয় এনে দেয়।
ইতিহাসজুড়ে মুসলিমরা বহুবার শক্তিশালী শত্রুর মুখোমুখি হয়েছেন। এ ধরনের পরীক্ষাই আসল মুমিন ও মুনাফিকদের মধ্যে পার্থক্য তৈরি করেছে।
কোরআনে বলা হয়েছে, ‘কত ছোট দল আল্লাহর অনুমতিক্রমে বড় দলকে পরাজিত করেছে। এবং আল্লাহ ধৈর্যশীলদের সঙ্গে আছেন।’
—সুরা বাকারা, আয়াত: ২৪৯
মুসা (আ.)-এর অনুসারীদের উদাহরণ উল্লেখ করে বলা হয়েছে, যখন তাঁরা ফিরাউনের সৈন্য দেখে ভয় পেয়েছিলেন, তখন মুসা (আ.) বলেছিলেন, ‘নিশ্চয়ই আমার সঙ্গে আমার রব আছেন, তিনি আমাকে পথ দেখাবেন।’
—সুরা শুয়ারা, আয়াত: ৬২
হিজরতের সময় গুহায় রাসুল (সা.) আবু বকর (রা.)-কে আশ্বস্ত করেছিলেন:
‘তুমি কী মনে করো দুজনের কথা, যাদের সঙ্গে আল্লাহ তৃতীয়?’
—সহিহ বুখারি, হাদিস: ৩৬৫৩
বিজয়ের জন্য প্রস্তুতি, সরঞ্জাম ও কৌশল প্রয়োজন—এটি সত্য। কিন্তু শুধু প্রস্তুতিই যথেষ্ট নয়।
কোরআনে বলা হয়েছে, ‘এবং তাদের বিরুদ্ধে তোমরা যা পারো শক্তি ও যুদ্ধের ঘোড়া প্রস্তুত করো।’
—সুরা আনফাল, আয়াত: ৬০
তবে শেষ পর্যন্ত বিজয় আল্লাহর হাতে, ‘এবং তুমি যখন নিক্ষেপ করেছিলে, তখন তুমি নিক্ষেপ করোনি; বরং আল্লাহই নিক্ষেপ করেছিলেন।’
—সুরা আনফাল, আয়াত: ১৭
হুনাইনের যুদ্ধে মুসলিমরা প্রথমে নিজেদের সংখ্যার ওপর ভরসা করে পরাজিত হতে বসেছিল।
কোরআনে বলা হয়েছে, ‘আল্লাহ তোমাদের অনেক স্থানে বিজয় দিয়েছেন এবং হুনাইনের দিনে, যখন তোমাদের সংখ্যাধিক্য তোমাদের খুশি করেছিল, কিন্তু তা তোমাদের কোনো কাজে আসেনি এবং পৃথিবী তার বিশালতা সত্ত্বেও তোমাদের জন্য সংকীর্ণ হয়ে গিয়েছিল। তারপর তোমরা পিঠ দেখিয়ে পালিয়েছিলে।’
—সুরা তাওবা, আয়াত: ২৫
তবু আল্লাহর রহমতে তারা বিজয় লাভ করেছিল। কোরআন স্মরণ করিয়ে দেয়, ‘তোমরা দুর্বল হয়ো না এবং শোক করো না, যদি তোমরা সত্যিকারের মুমিন হও তবে তোমরাই শ্রেষ্ঠ হবে।’
—সুরা আলে ইমরান, আয়াত: ১৩৯
স্বদেশ প্রতিদিন/ আরএফ