নানা অনিয়মে ভারত বসেই বিশ্ববিদ্যালয় চালু করলেন আ. লীগ নেতা হানিফ

নানা অনিয়ম ও ক্ষমতার অপব্যবহারের মাধ্যমে অনুমোদন পাওয়া দেশের ১১৩তম বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয় ‘লালন বিজ্ঞান ও কলা বিশ্ববিদ্যালয়’ নিয়ে নতুন করে বিতর্ক তৈরি হয়েছে। বিশ্ববিদ্যালয়টি আওয়ামী লীগের যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক মাহবুবউল আলম হানিফ ও তার স্ত্রী ফৌজিয়া আলমের নামে ২০২৩ সালে অনুমোদন পেলেও দীর্ঘ সময় কার্যক্রম চালু করা সম্ভব হয়নি।
তবে দেশে রাজনৈতিক প্রেক্ষাপট পাল্টে যাওয়ার পর ভারতে আশ্রয় নেওয়া হানিফ এখন কলকাতা থেকে বসেই বিশ্ববিদ্যালয় পরিচালনা করছেন বলে একাধিক সূত্র নিশ্চিত করেছে।
বিশ্ববিদ্যালয়টি অনুমোদনের সময় ঠিকানা দেওয়া হয়েছিল কুষ্টিয়া হাউজিং স্টেটের ৬ ও ৭ নম্বর প্লটের। বাস্তবে এটি ছিল হানিফের ভাই, সাবেক উপজেলা চেয়ারম্যান আতাউর রহমান আতার নির্মাণাধীন ভবন। পরবর্তীতে দুর্নীতি দমন কমিশনের (দুদক) মামলার পর সেই ঠিকানা থেকে সরিয়ে ফেলা হয় বিশ্ববিদ্যালয়ের সাইনবোর্ড।
পরে কুষ্টিয়া জেলা পরিষদের একটি নবনির্মিত ভবনের সপ্তম ও অষ্টম তলা ভাড়া নিয়ে সেখানে বিশ্ববিদ্যালয় কার্যক্রম চালু করা হয়। যদিও জেলা পরিষদের পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে, ভবনটির ডিজাইন পরিবর্তন না করেই অবৈধভাবে বিশ্ববিদ্যালয় স্থাপন করা হয়।
বিশ্ববিদ্যালয়ের রেজিস্ট্রার দপ্তর সূত্র জানায়, ২০২৪ সালের অক্টোবরে মঞ্জুরি কমিশন থেকে ট্রাস্টি বোর্ড পরিবর্তন করা হয়। নভেম্বরে শুরু করা হয়েছে বিশ্ববিদ্যালয়ের কার্যক্রম। নিয়োগ দেওয়া হয়েছে ২৪ জন শিক্ষক এবং ৩৭ জন কর্মকর্তা-কর্মচারী। ২০২৫ সালের জানুয়ারি থেকে শুরু হয়েছে ভর্তি কার্যক্রম। মোট পাঁচ বিভাগের ভর্তি কার্যক্রম চালু হয়েছে। প্রতি বিভাগে ৪০ জন পর্যন্ত শিক্ষার্থী ভর্তির অনুমোদন রয়েছে। চলতি বছরের ৩১ জুলাই পর্যন্ত পাঁচ বিভাগে ১০১ জন শিক্ষার্থী ভর্তি হয়েছেন।
বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ উপাচার্য নিয়োগের জন্য একটি তিন সদস্যের প্যানেল মঞ্জুরি কমিশনে পাঠিয়েছে। এদের মধ্যে প্রথম পছন্দ ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয়ের কম্পিউটার সায়েন্স বিভাগের অধ্যাপক এবং জিয়া পরিষদের সভাপতি ড. ফারুকুজ্জামান। বাকি দুইজন হলেন ইইই বিভাগের অধ্যাপক আক্তারুজ্জামান ও শরিফুল ইসলাম।
এই প্যানেল নিয়েও বিতর্ক তৈরি হয়েছে, কারণ এতে বিএনপিপন্থী বলে পরিচিত এক ব্যক্তিকে শীর্ষে রাখা হয়েছে।
বিশ্ববিদ্যালয়ের ট্রাস্টি বোর্ডের চেয়ারম্যান হালিমুজ্জামান বলেন, ‘বর্তমানে হানিফসহ আওয়ামী লীগ নেতাদের সঙ্গে বিশ্ববিদ্যালয়ের কোনো সম্পর্ক নেই। প্রেক্ষাপট পরিবর্তনের পর ট্রাস্টি বোর্ডে পদধারী যারা ছিলেন, তাদের বাদ দেওয়া হয়েছে। হানিফ ও তার স্ত্রী ট্রাস্টি বোর্ড থেকে রিজাইন দিয়ে চলে গেছেন। পরে ট্রাস্টি বোর্ডের সিদ্ধান্তে আমাকে চেয়ারম্যান ও নতুন সদস্য অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে।’
তবে ট্রাস্টি বোর্ডে এখনো আগের অনেক সদস্য রয়েছেন, যাদের বেশিরভাগই হানিফের ঘনিষ্ঠ বলে পরিচিত। বোর্ডের বর্তমান সদস্যদের মধ্যে রয়েছেন- আর্কিটেক্ট তারিক হাসান (সেক্রেটারি), ইবি’র ইংরেজি বিভাগের অধ্যাপক ড. শাহিনুর রহমান (কোষাধ্যক্ষ), ইবি’র আইন বিভাগের অধ্যাপক সেলিম তোহা, গার্মেন্ট মালিক আব্দুল মান্নান।
২০২৪ সালের রাজনৈতিক পরিবর্তনের পর হানিফ ও তার স্ত্রী দেশত্যাগ করেন। সূত্র বলছে, হানিফ বর্তমানে ভারতের কলকাতায় একটি ভাড়া ফ্ল্যাটে অবস্থান করছেন। সেখান থেকেই তিনি বিশ্ববিদ্যালয়ের বিভিন্ন কার্যক্রমে সম্পৃক্ত ছিলেন বলে একাধিক প্রমাণ পাওয়া গেছে।
নানা অনিয়ম, ঠিকানা জালিয়াতি, এবং রাজনৈতিক প্রভাব খাটিয়ে অনুমোদন পাওয়া ‘লালন বিজ্ঞান ও কলা বিশ্ববিদ্যালয়’ এখন কার্যক্রম চালালেও প্রতিষ্ঠার প্রক্রিয়া, পরিচালনা ও নেতৃত্ব নিয়ে প্রশ্ন থেকেই যাচ্ছে।
স্বদেশ প্রতিদিন/এমএম