
টাঙ্গাইল জেলার সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়গুলোতে শিক্ষক সংকট দিন দিন প্রকট আকার ধারণ করছে। জেলার মোট ১,৬২৩টি সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে বর্তমানে প্রধান শিক্ষক ও সহকারী শিক্ষক মিলিয়ে ১,২৭৭টি পদ শূন্য রয়েছে। এর মধ্যে প্রধান শিক্ষক পদেই শূন্য রয়েছে ৮৩১টি, যা পাঠদান কার্যক্রমে মারাত্মকভাবে প্রভাব ফেলছে।
জেলা প্রাথমিক শিক্ষা অফিস সূত্রে জানা গেছে, শিক্ষক সংকটের ফলে অনেক বিদ্যালয়ে পাঠদান কার্যক্রম ব্যাহত হচ্ছে। প্রধান শিক্ষক না থাকায় অনেক সহকারী শিক্ষককে অতিরিক্ত দায়িত্ব পালন করতে হচ্ছে, যা তাদের পক্ষে একাধারে প্রশাসনিক কাজ ও পাঠদানের মান বজায় রাখা কঠিন করে তুলেছে।
প্রধান শিক্ষক সংকটের চিত্র : ১২টি উপজেলার মধ্যে সবচেয়ে বেশি সংকট রয়েছে গোপালপুর (১২০ জন), কালিহাতী (১১৪ জন) এবং নাগরপুর (৯৭ জন) উপজেলায়। এর বাইরে অন্যান্য উপজেলাগুলোর মধ্যে ঘাটাইলে ১০৩, মধুপুরে ৬৩, দেলদুয়ারে ৬২, ভূঞাপুরে ৬৯, মির্জাপুরে ৪২, সদর উপজেলায় ৬৬ জন প্রধান শিক্ষক পদ শূন্য রয়েছে।
সহকারী শিক্ষক সংকটের চিত্র : ৯,০৬০টি অনুমোদিত পদে কর্মরত রয়েছেন ৮,৬১৪ জন সহকারী শিক্ষক। ফলে মোট ৪৪৬টি পদ শূন্য রয়েছে। এর মধ্যে সবচেয়ে বেশি শূন্য পদ রয়েছে কালিহাতীতে (৬৫ জন), গোপালপুরে (৬২ জন), নাগরপুরে (৫১ জন) এবং ভূঞাপুরে (৪৬ জন)।
ঘাটাইল উপজেলার খাজনাগড়া সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের ভারপ্রাপ্ত প্রধান শিক্ষক নাসির উদ্দিন জানান, বিদ্যালয়ে ৫টি পদ থাকলেও বর্তমানে শিক্ষক মাত্র ২ জন। একজন শিক্ষককে অফিসিয়াল কাজ সামলাতে হয়, ফলে অন্যজনের পক্ষে একাই সব শ্রেণির পাঠদান করানো অসম্ভব হয়ে দাঁড়িয়েছে। এতে শিক্ষার্থীরা মানসম্মত শিক্ষা থেকে বঞ্চিত হচ্ছে।
বাংলাদেশ প্রাথমিক শিক্ষক সমিতির টাঙ্গাইল জেলা শাখার সাধারণ সম্পাদক বাশিরুল ইসলাম বলেন, “শিক্ষক ঘাটতির কারণে একজন শিক্ষককে অনেক সময় ৩৫ থেকে ৪০টি ক্লাস নিতে হয়। এতে শিক্ষার্থীদের শিখন প্রক্রিয়া মারাত্মকভাবে ব্যাহত হয়। বিশেষ করে প্রান্তিক এলাকার শিশুরা সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে।”
মাওলানা ভাসানী বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক মোস্তফা কামাল বলেন, “শিক্ষক সংকট শুধু শিক্ষাদানের মান কমায় না, বরং জাতির ভবিষ্যৎ গঠনে দীর্ঘমেয়াদি নেতিবাচক প্রভাব ফেলে। এই সংকট নিরসনে দ্রুত বাস্তবভিত্তিক প্রশিক্ষণ, পরিকল্পনা ও পদক্ষেপ গ্রহণ জরুরি।”
জেলা প্রাথমিক শিক্ষা কর্মকর্তা সাহাব উদ্দিন বলেন, “সংকট মোকাবেলায় আমরা চেষ্টা করছি। সংযুক্তির মাধ্যমে কিছুটা সমন্বয় করা হচ্ছে। তবে স্থায়ী সমাধানে সরকারের উচিত দ্রুত শূন্যপদে শিক্ষক নিয়োগ দেওয়া। সেইসাথে প্রান্তিক এলাকায় শিক্ষকতা নিশ্চিত করতে বাধ্যবাধকতা আরোপ করা প্রয়োজন।”
টাঙ্গাইলে প্রাথমিক শিক্ষায় শিক্ষক সংকট এখন গুরুতর সমস্যা হিসেবে দেখা দিয়েছে। এই সংকট নিরসন না হলে শিক্ষার্থীরা আরও বেশি করে মানহীন শিক্ষার শিকার হবে। দ্রুত পদক্ষেপ না নিলে ভবিষ্যতে প্রাথমিক শিক্ষাব্যবস্থা ধ্বংসের মুখে পড়তে পারে এমন আশঙ্কা করছেন অভিভাবক ও শিক্ষাবিদরা।
স্বদেশ প্রতিদিন/কেআইকে