
শফিকুল ইসলাম ও আফসার উদ্দিন
কাটকাটার সেই খটখট শব্দ আর শোনা যায় না। এক যুগ আগেও গ্রামাঞ্চল-বাজারে কানে বাজতো খটখট শব্দ। ক্রেতা-বিক্রেতার আনাগোনায় মুখরিত থাকত মিস্ত্রিপাড়া। এখন নেই সেই প্রাণচাঞ্চল্য।
কালের বিবর্তনে অনেক কিছুই হারিয়ে যাচ্ছে। সময়ের সঙ্গে তাল মিলিয়ে অনেকেই বদলে ফেলেছেন পৈতৃক সূত্রের পুরোনো পেশা। কেউ কেউ মানবেতর জীবনযাপন করলেও পুরোনো পেশার আঁকড়ে জীবনটা পার করার সিদ্ধান্তে অটল। তাদেরই দুজন চুয়াডাঙ্গার দামুড়হুদার কার্পাসডাঙ্গা বাজারের শফিকুল ইসলাম (৬৭) ও আফসার উদ্দিন (৭৪)। তবুও তারা আঁকড়ে রয়েছেন গরুর গাড়ির চাকা তৈরির পেশা। যখন বৈধ-অবৈধ যান রাস্তায় ছড়াছড়ি করছে, তখন গরুর গাড়ির চাকা তৈরির পেশায় কি পেট চলে?
একসময় আয়-উপার্জনের জন্য গরুর গাড়ি চালানোকে অনেকে পেশা হিসেবে গ্রহণ করত। রাস্তা দিয়ে গরুর গাড়ি আসা-যাওয়ার সময় গরুর গলার ঘুঙুর আর গাড়ির চালকের শব্দে বিশেষ করে সন্ধ্যা ও রাতে শিশুদের ঘুম ভেঙে যেত। গরুর গাড়ির প্রচলনের সময় অনেকে গাড়ি তৈরি করে সংসার চালাত।
গাড়ি তৈরির কারিগররা ছিলেন অভিজ্ঞ নিপুণ শিল্পী। সেই সময়ে গাড়ির জন্য বলবান গরুর কদর ছিল অত্যধিক। আধুনিক প্রযুক্তির ভিড়ে গরুর গাড়ি আজ বিলুপ্তপ্রায়। সেই কারণে ভালো নেই গরুর গাড়ির চাকা তৈরির কারিগররা। তবুও বংশ পরম্পরায় বাপ-দাদার এ পেশাকে আঁকড়ে ধরে আছেন চাপাইনবাবগঞ্জ থেকে ৪৫ বছর আগে দামুড়হুদা উপজেলার কার্পাসডাঙ্গায় আসা গরুর গাড়ির চাকা তৈরির কারিগর শফিকুল ইসলাম ও আফসার।
সরেজমিনে উপজেলার কার্পাসডাঙ্গার কাঠপট্টি এলাকায় চোখে পড়ে গরুর গাড়ির চাকা তৈরির দৃশ্য। এ সময় কাজের ফাঁকে কথা হয় তার সঙ্গে। তিনি বলেন, আধুনিক প্রযুক্তির ছোঁয়ায় গরুর গাড়ির ব্যবহার কমে যাওয়ায় এখন এ পেশা প্রায় বিলুপ্তির পথে। তবুও নাড়ির টানে বাপ-দাদার এ পেশাকে আঁকড়ে ধরে আছি। তার পূর্বপুরুষরা এ পেশায় থেকে তাদের মানুষ করেছেন।
শফিকুল আরো বলেন, শুধু বাবলার কাঠ দিয়েই গরুর গাড়ির চাকা তৈরি হয়। এক জোড়া চাকা তৈরিতে সপ্তাহ খানেক সময় লাগে। প্রতিটি তৈরি চাকা ১২ হাজার থেকে ১৪ হাজার টাকায় বিক্রি করা হয়। সাধারণত ভুট্টা, পাট ও ধানের মৌসুম পর্যন্ত এ চাহিদা থাকে। পরের ছয় মাস বসে থাকতে হয়। আগে হাটে চাকার চাহিদা অনেক ছিল। বিভিন্ন এলাকা থেকে চাকা কিনতে আসত। এখন যান্ত্রিক যুগের কারণে গরুর গাড়ির চাকা বিক্রি হয় না। এখন মাসে ৪ জোড়া তৈরি করি। এভাবেই তিনি পরিবার-পরিজনের মুখে দু’বেলা দু’মুঠো অন্ন জোগাচ্ছেন।
অনেক দুঃখের সঙ্গে তিনি বলেন, এক সময় গ্রামের পথ-ঘাট ছিল অনুন্নত। গ্রামের প্রায় প্রতিটি গৃহস্থ পরিবারেই ছিল গরুর গাড়ি। তখন গরুর গাড়ির চাকা তৈরিতে ভিড় সামলানোই ছিল কঠিন। কিন্তু সময় পাল্টেছে। এখন পাওয়ার টিলার, ট্রাক্টরসহ আধুনিক প্রযুক্তির ভিড়ে গরুর গাড়ি প্রায় বিলুপ্ত হতে চলেছে।
তিনি আরো বলেন, এখন ছয় মাস নিজ জেলায় থাকি আর ছয় মাস উপজেলার কার্পাসডাঙ্গায় থাকি। আগে প্রতি মাসে ১০ জোড়া পর্যন্ত চাকা বিক্রি করেছি। সংসারে স্ত্রী ও তিন সন্তান আছে। আমি এই কারখানায় চাকা তৈরি করি আর এখানেই রাতে থাকি। নিজেই রান্না করে খাই। তবে গরু-মহিষের গাড়ির চাকার কারিগর ও উপকরণ সংকটের কারণে এ শিল্পের ভবিষ্যৎ নিয়ে শঙ্কা রয়েই যাচ্ছে।
উপজেলার ধান্যঘরা গ্রামের গাড়িওয়ালা ইয়ানবী বলেন, আমি চল্লিশ বছর ধরে মহিষের গাড়ি চালাচ্ছি। এখন চাকার দাম দিনকে দিন বেড়েই চলেছে। আধুনিক যন্ত্রপাতির ছোঁয়ায় গরু-মহিষের গাড়ির চাহিদা দিন দিন হারিয়ে যাচ্ছে।