
সংগৃহীত ছবি
কুমিল্লার হোমনা উপজেলার ৯২টি সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে ‘স্লিপ ফান্ড’ থেকে বিপুল পরিমাণ অর্থ আত্মসাতের অভিযোগ উঠেছে সহকারী শিক্ষা কর্মকর্তাদের (এটিও) বিরুদ্ধে।
তারা হলেন মো. নজরুল ইসলাম, খাদিজা আক্তার ও মো. আনিসুর রহমান।
জানা গেছে, করোনাকালীন সময় থেকে ক্লাস্টারভিত্তিক সহকারী শিক্ষা কর্মকর্তারা সংশ্লিষ্ট বিদ্যালয়ের স্কুল ম্যানেজমেন্ট কমিটির (এসএমসি) সভাপতির দায়িত্ব পালন করে আসছেন। একই ব্যক্তি সভাপতি ও মনিটরিং অফিসার হওয়ায় কোনো জবাবদিহিতা না থাকায় তাঁরা প্রধান শিক্ষকদের উপর প্রভাব খাটিয়ে বরাদ্দকৃত অর্থ আত্মসাৎ করছেন।
উপজেলা শিক্ষা অফিস সূত্রে জানা যায়, সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে স্লিপ ফান্ড ছাড়াও ক্ষুদ্র মেরামত, রুটিন মেইনটেন্যান্স, প্রাক-প্রাথমিক শ্রেণির শ্রেণিকক্ষ সজ্জা, ওয়াশ ব্লক, বই বিতরণ, দিবস পালন ও ক্রীড়া অনুষ্ঠানসহ আটটি খাতে বরাদ্দ থাকে, যা প্রধান শিক্ষকের বার্ষিক পরিকল্পনার ভিত্তিতে ব্যয় হওয়ার কথা। কিন্তু বাস্তবে এটিও’দের নির্দেশনা অনুযায়ী হিসাব দেখাতে বাধ্য হন প্রধান শিক্ষকরা।
২০২১-২২ অর্থবছরে হোমনায় স্লিপ ফান্ডের বরাদ্দ ছিল ৫৮,৭৫,০০০ টাকা, ২০২২-২৩ সালে ৫৬,৫৫,০০০ টাকা, ২০২৩-২৪ সালে ৫৪,৯৫,০০০ টাকা এবং চলতি ২০২৪-২৫ অর্থবছরে বরাদ্দ এসেছে ৫০,৬৭,৪১৯ টাকা। এসব বরাদ্দ থেকে শুধুমাত্র প্রশ্নপত্র প্রিন্ট বাবদ ২০২৩ সাল থেকে ৫টি পরীক্ষায় ১২ লাখ টাকা অতিরিক্ত খরচ দেখানো হয়েছে বলে অভিযোগ রয়েছে।
শিক্ষকদের অভিযোগ, পূর্বে শিক্ষার্থীদের কাছ থেকে দ্বিতীয় শ্রেণিতে ২০ টাকা, তৃতীয় শ্রেণিতে ৩০ টাকা, চতুর্থ শ্রেণিতে ৪০ টাকা এবং পঞ্চম শ্রেণিতে ৫০ টাকা করে পরীক্ষা ফি নেয়া হতো, যার মধ্যে প্রশ্নপত্র বাবদ ব্যয় হতো ৫ টাকা। কিন্তু ২০২৩ সাল থেকে পরীক্ষার খরচ স্লিপ ফান্ড থেকে মেটানোর সিদ্ধান্ত নেওয়া হলে, এটিও’দের পক্ষ থেকে প্রশ্নপত্র বাবদ ৩৬ টাকা ব্যয়ের দাবি করা হয়। অথচ অন্যান্য উপজেলায় এই খরচ ১০-১২ টাকার মধ্যে সীমাবদ্ধ। এতে করে প্রতি শিক্ষার্থীর জন্য অতিরিক্ত ২৪ টাকা ব্যয় দেখানো হয়।
উপজেলার ৯২টি বিদ্যালয়ে তৃতীয়, চতুর্থ ও পঞ্চম শ্রেণির প্রায় ১০ হাজার শিক্ষার্থী অংশগ্রহণ করে, ফলে একেকটি পরীক্ষায় প্রায় ২ লাখ ৪০ হাজার টাকা অতিরিক্ত খরচ দেখানো হয়। ৫টি পরীক্ষার হিসেবে এই অনিয়মের পরিমাণ দাঁড়ায় ১২ লাখ টাকা।
স্থানীয় শিক্ষক, অভিভাবক ও এলাকাবাসী এই অর্থ আত্মসাতের ঘটনার সুষ্ঠু তদন্ত ও দোষীদের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা নেয়ার দাবি জানিয়েছেন।
অনুসন্ধানে জানা গেছে, এই এটিও’রা পূর্ব সরকার সমর্থিত কয়েকজন শিক্ষক নেতার সহযোগিতায় শুধু স্লিপ ফান্ড নয়, উন্নয়ন বরাদ্দ, রুটিন রক্ষণাবেক্ষণ, ওয়াশ ব্লক, প্রাক-প্রাথমিক উপকরণ বিতরণ, ক্ষুদ্র মেরামত ও দিবস উদযাপনসহ বিভিন্ন খাত থেকে কমিশন গ্রহণ করেছেন। কেউ প্রতিবাদ করলে শোকজের ভয় দেখিয়ে দমন করা হয়েছে।
২০১৮-১৯ অর্থবছরে প্রতিটি বিদ্যালয়ে ৫ হাজার টাকার ডিজিটাল হাজিরা মেশিন সরবরাহের নামে ২০ হাজার টাকা আদায়ের অভিযোগ ওঠে। এই অনিয়ম নিয়ে মুখ খুলেছিলেন নিলখী সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের ভারপ্রাপ্ত প্রধান শিক্ষক সামসুদ্দিন খান দুলাল। পরে তাঁকে দায়িত্ব থেকে সরিয়ে দেওয়া হয়।
নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক একাধিক প্রধান শিক্ষক জানান, সাব ক্লাস্টার প্রশিক্ষণের খাবার, সহায়ক ভাতা, ভেন্যু ব্যয়সহ বিভিন্ন বরাদ্দের অর্থ আত্মসাৎ করেছেন এই কর্মকর্তারা। এমনকি বিভিন্ন কিন্ডারগার্টেন ও মাদ্রাসায় সরকারি বই বিক্রি এবং ক্রীড়া অনুষ্ঠানে বরাদ্দের টাকা খরচ না করে প্রত্যেক বিদ্যালয় থেকে ১ হাজার এবং শিক্ষক সমিতি থেকে ৫ হাজার টাকা করে চাঁদা আদায় করা হয়েছে।
এ বিষয়ে এটিও নজরুল ইসলাম ও খাদিজা আক্তার প্রশ্নপত্র বাবদ ৩৬ টাকা নেওয়ার বিষয়টি স্বীকার করলেও অন্যান্য অভিযোগ অস্বীকার করে বলেন, “এটি আমাদের বিরুদ্ধে ষড়যন্ত্র।”
এটিও আনিসুর রহমান বলেন, “হোমনায় প্রশ্নপত্র প্রেসে ছাপা হয়নি, ফটোকপি করা হয়েছে। এতে খরচ হয়েছে ১২ টাকা।”
তবে বাকি ২৪ টাকার ব্যয়ের ব্যাখ্যা চাওয়া হলে তিনি ফোন কেটে দেন।
উপজেলা প্রাথমিক শিক্ষা কর্মকর্তা নাহার সুলতানা জানান, “আমি সদ্য যোগদান করেছি। কোনো অনিয়ম বরদাশত করা হবে না। তদন্ত করে আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া হবে।”
এ বিষয়ে কুমিল্লা জেলা শিক্ষা কর্মকর্তা তাপস কুমার পাল বলেন, “প্রশ্নপত্রের খাতে অতিরিক্ত খরচের অভিযোগ শুনেছি। লিখিত অভিযোগ পেলে তদন্ত করে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হবে।”