বৃহস্পতিবার ২৪ সেপ্টেম্বর ২০২৬
   
শিরোনাম:
দেশকে অস্থিতিশীল করার সুযোগ দেয়া হবে না       নৈরাজ্য ও ষড়যন্ত্রের বিরুদ্ধে মোংলায় বিএনপির বিক্ষোভ       আওয়ামী লী‌গের তিন নেতা গ্রেপ্তার      সাতক্ষীরায় জলবায়ু ন্যায়বিচার প্রকল্পের সমাপনী      সন্ত্রাসের মাধ্যমে দেশকে অস্থিতিশীল করার প্রতিবাদে বিক্ষোভ       আইনশৃঙ্খলা সভায় হট্টগোল, তর্কে জড়ালেন এমপি হান্নান      লাতিন আমেরিকার দুই দলকে হারাল জাপান-কোরিয়া      কিশোর গ্যাংয়ের সঙ্গে সম্পৃক্ততার সন্দেহে ৫১ কিশোর আটক      প্রথম ১৪ ওয়ানডেতেই ইতিহাস গড়লেন ম্যাথু ব্রিটজকে      ২৫ সেপ্টেম্বরের মুর্তজা কিজিলবাশের কনসার্ট স্থগিত      অঙ্কন-নন্দিতার দ্বৈত কণ্ঠে আজ প্রকাশিত হচ্ছে ‘মথুরা’      ফোটন সার্ভিস সেন্টারের উদ্বোধন      
ইসলামী ব্যাংকিংয়ের কল্যাণভিত্তিক বিনিয়োগ পদ্ধতিসমূহ
মো. খায়রুল হাসান সিএসএস
প্রকাশ: সোমবার, ৩০ জুন, ২০২৫, ৮:৩১ পিএম

ইসলামী ব্যাংকিং বিশ্বব্যাপী সমাদৃত একটি অনন্য আর্থিক ব্যবস্থা, যা শরীয়াহ্‌ নির্দেশনা ও নীতিমালা অনুসরণ করে পরিচালিত হয়। এই ব্যবস্থায় সুদভিত্তিক লেনদেনের পরিবর্তে ন্যায়ভিত্তিক, বাস্তবসম্মত ও ঝুঁকিসমূহ ভাগাভাগির মাধ্যমে ব্যাংক গ্রাহকের সঙ্গে অংশীদারিত্ব, ক্রয়-বিক্রয় বা ইজারা ভিত্তিতে লেনদেন করে। ইসলামী ব্যাংকিংয়ে বিভিন্ন ধরনের বিনিয়োগ পদ্ধতি রয়েছে, যেমন- (১) ক্রয়-বিক্রয় পদ্ধতি, (২) ইজারা পদ্ধতি এবং (৩) অংশীদারী পদ্ধতি। নিচে এদের আলোচনা করা হলো:  

১. ক্রয়-বিক্রয় পদ্ধতি: বিভিন্ন ধরনের ক্রয়-বিক্রয় পদ্ধতি হতে পারে। যেমন-  
ক. বাই মুয়াজ্জাল: বাই মুয়াজ্জাল মানে বাকীতে বিক্রি। বাই মুয়াজ্জাল ইসলামী ব্যাংকিংয়ের একটি শরীয়াহ্‌সম্মত বিক্রয় চুক্তি, যেখানে বিক্রেতা (সাধারণত ইসলামী ব্যাংক) ক্রেতাকে কোনো পণ্য তৎক্ষণাত সরবরাহ করে, কিন্তু মূল্য পরবর্তী সময়ে বা কিস্তিতে আদায় করে। যেমন- গ্রাহকের আবেদনের প্রেক্ষিতে ব্যাংক একটি রেফ্রিজারেটর ক্রয় করে মালিকানা গ্রহণ পূর্বক তা বাকীতে গ্রাহকের নিকট বিক্রি করল। গ্রাহক পরবর্তীতে কিস্তিতে অথবা একসঙ্গে ব্যাংকের মূল্য পরিশোধ করবে। এক্ষেত্রে ব্যাংক ক্রয়মূল্য প্রকাশ করতে বাধ্য নয়।  

খ. বাই মুরাবাহা: বাই মুরারাহা মানে সম্মত লাভে বিক্রয়। বাই মুরাবাহা হলো একটি বহুল ব্যবহৃত বিক্রয়ভিত্তিক লেনদেন পদ্ধতি, যেখানে ইসলামী ব্যাংক কোনো পণ্য গ্রাহকের পক্ষে কিনে নিয়ে একটি চুক্তিভিত্তিক মুনাফা যোগ করে তা গ্রাহকের কাছে বিক্রি করে। এক্ষেত্রে ব্যাংকের ক্রয়মূল্য এবং মুনাফা পৃথকভাবে উল্লেখ করা জরুরী। যেমন- গ্রাহকের আবেদনের প্রেক্ষিতে ব্যাংক ১ লাখ টাকা দিয়ে একটি রেফ্রিজারেটর ক্রয় করে মালিকানা গ্রহণ পূর্বক তা ১ লাখ ১০ হাজার টাকায় গ্রাহকের নিকট বিক্রি করল। এখানে ১০ হাজার টাকা ব্যাংকের লাভ। এক্ষেত্রে গ্রাহক কিস্তিতে অথবা একসঙ্গে ব্যাংকের মূল্য পরিশোধ করতে পারে। 

গ. বাই সালাম: বাই সালাম মানে অগ্রিম ক্রয়। বাই সালাম এমন একটি ক্রয়-বিক্রয় পদ্ধতি যার মাধ্যমে লিখিত চুক্তি অনুযায়ী ব্যাংক পণ্যের দাম পণ্য বিক্রেতাকে অগ্রিম পরিশোধ করে দেয় এবং বিক্রেতা ভবিষ্যতের নির্ধারিত সময় বা সময়ের মধ্যে চুক্তির শর্তানুযায়ী ব্যাংকের কাছে সরবরাহ করে। যেমন- ইসলামী ব্যাংক লিখিত চুক্তির ভিত্তিতে একটি গার্মেন্টস কারখানাকে শার্ট তৈরির জন্য মূলধন জোগান দিল। চুক্তির শর্ত অনুযায়ী পরবর্তীতে গার্মেন্টস কারখানাটি যথাযথ পরিমান ও মানের শার্ট ব্যাংকের নিকট সরবরাহ করবে। এ পদ্ধতির মাধ্যমে ইসলামী ব্যাংক কর্তৃক উৎপাদনশীল কোম্পানিকে চলতি মূলধন প্রদান করা হলে শুধুমাত্র উৎপাদনই ত্বরান্বিত হয় না বরং প্রদত্ত চলতি মূলধনের টাকা কোনো অবস্থাতে ভিন্ন খাতে প্রবাহিত হবার সুযোগ থাকে না। 

ঘ. ইস্তিসনা: ইস্তিসনা মানে তৈরি করে বা নির্মাণ করে বিক্রি করা। এটি এমন একটি শরীয়াহ্‌সম্মত চুক্তি, যা অর্ডারভিত্তিক উৎপাদন বা নির্মাণ চুক্তি হিসেবে পরিচিত। এই চুক্তির অধীনে একজন ক্রেতা (অর্ডারদাতা) বিক্রেতার (প্রস্তুতকারকের) কাছে কোনো নির্দিষ্ট পণ্য বা স্থাপনা তৈরি করে দেওয়ার জন্য আদেশ দেন, যা ভবিষ্যতে সরবরাহ করা হবে। যেমন- একজন গ্রাহক বাড়ি নির্মাণের ব্যাংকের নিকট অর্থায়নের আবেদন করল। গ্রাহকের আবেদনের প্রেক্ষিতে চুক্তি মোতাবেক ব্যাংক বাড়ি নির্মাণ করে গ্রাহকের নিকট হস্তান্তর করে। গ্রাহক পরবর্তীতে ব্যাংকের টাকা পরিশোধ করবে।   

২. ইজারা পদ্ধতি: ইজারা হলো ইসলামী ব্যাংকিং-এর একটি শরীয়াহতসম্মত চুক্তি, যার মাধ্যমে কোনো সম্পদ বা সম্পত্তি নির্দিষ্ট সময় ও ভাড়ার বিনিময়ে ভাড়া (লিজ) দেওয়া হয়। এটি মূলত ইসলামী লিজিং ব্যবস্থা, যেখানে ব্যাংক মালিকানা রেখে গ্রাহককে সম্পদ ব্যবহারের অধিকার দেয়। ইজারা কয়েক ধরণের হতে পারে। যেমন- 

ক. আর্থিক ইজারা: আর্থিক ইজারা একটি লিজিং পদ্ধতি, যার মাধ্যমে ব্যাংক কোনো সম্পদ বা যন্ত্রপাতি ক্রয় করে গ্রাহকের ব্যবহারের জন্য নির্দিষ্ট মেয়াদে ভাড়ায় প্রদান করে। আর্থিক ইজারার ভাড়া এমনভাবে নির্ধারিত হয় যেন প্রাপ্ত ভাড়া থেকে ব্যাংক সম্পদ বা সম্পত্তির অবচয়য়ের টাকা আদায়সহ লাভ করতে পারে। ইজারা মেয়াদ শেষ হলে ব্যাংক সম্পদ বা সম্পত্তি ফেরত নেয় এবং নতুন চুক্তির অধীনে ভাড়া দিতে পারে অথবা উক্ত সম্পদ বা সম্পত্তি ইজারা গ্রহিতাসহ যে কোন ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠানের নিকট বিক্রয় করে দিতে পারে।

খ. ব্যবহারিক ইজারা: ব্যবহারিক ইজারা বলতে ইসলামী ব্যাংকিংয়ে এমন একটি ইজারা চুক্তিকে বুঝায়, যেখানে ব্যাংক কোনো ব্যবহারযোগ্য সম্পদ বা যন্ত্রপাতি গ্রাহককে নির্দিষ্ট সময়ের জন্য ভাড়ায় প্রদান করে, শুধুমাত্র ব্যবহারের উদ্দেশ্যে, মালিকানা হস্তান্তরের কোনো শর্ত ছাড়াই। 

৩. অংশীদারী পদ্ধতি: অংশীদারী পদ্ধতিতে বিনিয়োগ মূলতঃ ইসলামী ব্যাংকিংয়ের মূল সৌন্দর্যের জায়গা। এ পদ্ধতি বিনিয়োগ করা হলে ঝুঁকি ভাগাভাগি হয়ে থাকে, যা ইসলামী শরীয়াহর অন্যতম উদ্দেশ্য। অংশীদারী ভিত্তিতে বিভিন্ন পদ্ধতির বিনিয়োগ হয়ে থাকে। যেমন-   

ক. মুদারাবা: মুদারাবা হলো ইসলামী ব্যাংকিংয়ের একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশীদারিত্বভিত্তিক চুক্তি, যেখানে এক পক্ষ পুঁজি (অর্থ) প্রদান করে এবং অন্য পক্ষ ব্যবসায়িক দক্ষতা বা শ্রম প্রদান করে। এই পদ্ধতিতে লাভ ভাগ হয় পূর্বনির্ধারিত হারে, তবে ক্ষতি হলে তা কেবল পুঁজি দানকারীর ওপর বর্তায়। ইসলামী ব্যাংকগুলো সাধারণতঃ এই পদ্ধতিতে গ্রাহকদের নিকট থেকে ডিপোজিট সংগ্রহ করে থাকে। 

খ. মুশারাকা: মুশারাকা হলো ইসলামী ব্যাংকিংয়ের একটি শরীয়াহ্‌সম্মত অংশীদারিত্বভিত্তিক অর্থায়ন পদ্ধতি, যেখানে দুই বা ততোধিক পক্ষ যৌথভাবে পুঁজি প্রদান করে একটি ব্যবসা বা প্রকল্পে বিনিয়োগ করে, এবং লাভ ও ক্ষতি আনুপাতিকহারে ভাগাভাগি করে নেয়। মুশারাকা আবার কয়েক প্রকার হতে পারে। যেমন-  

•    শিরকাতুল মিল্ক: ইসলামী ব্যাংকিংয়ের একটি অংশীদারিত্ব মূলক ধারণা, যেখানে দুই বা ততোধিক ব্যক্তি বা পক্ষ কোনো সম্পদের যৌথ মালিক হন, তবে তা ব্যবসায়িক উদ্দেশ্যে নাও হতে পারে। যেমন- কয়েক জন মিলে যৌথ মালিকানায় একটি বাড়ি বানাতে পারে। শিরকাতুল মিল্ক আবার দুই প্রকার। যথা: 

        -স্বেচ্ছামূলক শিরকাতুল মিল্ক: স্বেচ্ছামূলক শিরকাতুল মিল্ক হলো ইসলামী ব্যাংকিং বা ইসলামী অর্থনীতিতে এমন একটি অংশীদারিত্ব, যেখানে দুই বা ততোধিক ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠান স্বেচ্ছায় চুক্তির মাধ্যমে কোনো সম্পদের যৌথ মালিকানা গ্রহণ করে, বিশেষভাবে ব্যবসায়িক বা বিনিয়োগমূলক উদ্দেশ্যে। 

        -বাধ্যতামূলক শিরকাতুল মিল্ক: বাধ্যতামূলক শিরকাতুল মিল্ক হলো ইসলামী অর্থনীতিতে এমন একটি যৌথ মালিকানা, যেখানে দুই বা ততোধিক ব্যক্তি বা পক্ষ অনিচ্ছাকৃতভাবে কোনো সম্পদের যৌথ মালিক হন, অর্থাৎ এটি স্বেচ্ছায় নয়, বরং পরিস্থিতিগত বা বাধ্যতামূলকভাবে সৃষ্টি হয়। যেমন- উত্তোরাধিকার সূত্রে প্রাপ্ত সম্পদ।

•    শিরকাতুল উকুদ: শিরকাতুল উকুদ হলো ইসলামী ব্যাংকিং ও ফিকহে এমন একটি চুক্তিভিত্তিক অংশীদারিত্ব, যেখানে দুই বা ততোধিক পক্ষ পারস্পরিক চুক্তির মাধ্যমে একটি ব্যবসায়িক উদ্যোগে অংশগ্রহণ করে, যৌথভাবে লাভ-ক্ষতি ভাগ করে নেয়।

•    শিরকাতুল ইনান: যখন অংশীদারগণ কারবারে অসমান পূঁজি যোগান দেয়, কারবার ব্যবস্থপনায় অসম অংশ নেয়, লাভের ক্ষেত্রে অসমান অংশ নেয় ও লোকসানের ক্ষেত্রে অংশীদার তার পূঁজির অনুপাতে লোকসান বহন করে তাকে শিরকতুল ইনান বলে।

•    শিরকাতুল মুফাওয়া: শিরকাত-উল-মুফাওয়া হলো ইসলামী ব্যাংকিং ও ফিকহে একটি বিশেষ ধরনের চুক্তিভিত্তিক অংশীদারিত্ব, যেখানে সব অংশীদার সম্পূর্ণ ক্ষমতা ও অধিকার পায় ব্যবসার সকল দিক পরিচালনার ক্ষেত্রে। অর্থাৎ, অংশীদাররা শুধু পূঁজি বা লাভ-ক্ষতির অংশীদারই নয়, তারা ব্যবসার পরিচালনায় সমান নিয়ন্ত্রণও রাখে।
•    শিরকাতুল ওয়াজুহ: যখন অংশীদারগণ বাকিতে পণ্য ক্রয় করে এবং তা বিক্রয় করে মুনাফা অর্জন করে ও চুক্তি অনুসারে ভাগ করে নেয় এবং তাদের সুনাম, সততা, বিশ্বস্তা পূঁজি হিসাবে কাজ করে তখন তাকে শিরকাতুল ওয়াজুহ বলে।

•    শিরকাতুল আবদান বা ছানাই: একই পেশার দুই বা ততোধিক ব্যক্তি যখন কোনো অংশীদারি কারবার শুরু করে এবং কাজ থেকে প্রাপ্ত মুনাফা চুক্তি অনুসারে বন্টন করাকে শিরকাতুল আবদান বা ছানাই বলে। যেমন- কয়েক জন ডাক্তার মিলে একটি হাসপাতাল প্রতিষ্ঠা করলে, তারা সবাই সেখানে সেবা দেয় এবং মুনাফা চুক্তি অনুসারে ভাগাভাগি করে নেয়। 

লেখক: বাহরাইনভিত্তিক ‘অ্যাকাউন্টিং অ্যান্ড অডিটিং অর্গানাইজেশন ফর ইসলামিক ফাইন্যন্সিয়াল ইনস্টিটিউট (আওফি)-এর একজন ফেলো ও ‘সার্টিফায়েড শরিয়াহ অ্যাডভাইজর অ্যান্ড অডিটর’ এবং ফার্স্ট সিকিউরিটি ইসলামী ব্যাংকের হেড অব পাবলিক অ্যাফেয়ার্স অ্যান্ড ব্র্যান্ড কমিউনিকেশন্স। ইমেইল: [email protected]

স্বদেশ প্রতিদিন/এনআর

আরও সংবাদ   বিষয়:  ইসলামী ব্যাংকিং  






Loading...
Loading...
এই ক্যাটেগরির আরো সংবাদ  
অনুসরণ করুন
     
সম্পাদক ও প্রকাশক : মোঃ মজিবুর রহমান চৌধুরী
স্বদেশ গ্লোবাল মিডিয়া লিমিটেড -এর পক্ষে প্রকাশক কর্তৃক সিটি পাবলিশিং লি, আর কে মিশন রোড, ঢাকা-১২০৩ থেকে মুদ্রিত ও ১০, তাহের টাওয়ার, গুলশান সার্কেল-২ থেকে প্রকাশিত।
ফোন: ৯৮৫১৬২০, ৮৮৩২৬৪-৬, ফ্যাক্স: ৮৮০-২-৯৮৯৩২৯৫। ই-মেইল : [email protected], [email protected]
🔝
close
অনুসরণ করুন
     
সম্পাদক ও প্রকাশক : মোঃ মজিবুর রহমান চৌধুরী
স্বদেশ গ্লোবাল মিডিয়া লিমিটেড -এর পক্ষে প্রকাশক কর্তৃক সিটি পাবলিশিং লি, আর কে মিশন রোড, ঢাকা-১২০৩ থেকে মুদ্রিত ও ১০, তাহের টাওয়ার, গুলশান সার্কেল-২ থেকে প্রকাশিত।
ফোন: ৯৮৫১৬২০, ৮৮৩২৬৪-৬, ফ্যাক্স: ৮৮০-২-৯৮৯৩২৯৫। ই-মেইল : [email protected], [email protected]
🔝
close