
ব্রেন টিউমার- একটি জটিল ও প্রাণঘাতী রোগ, যা আমাদের মস্তিষ্কের কোষগুলো অস্বাভাবিকভাবে বেড়ে ওঠার ফলে সৃষ্টি হয়। অন্যান্য টিউমারের মতো এটি ‘স্টেজ’ বা পর্যায়ে নয়, বরং ‘গ্রেড’ বা ভয়াবহতার মাত্রায় চিহ্নিত করা হয় (Grade I-IV)। যত বেশি গ্রেড, তত বেশি জটিলতা ও দ্রুত প্রসার।
সমস্যা হলো, ব্রেন টিউমারের প্রাথমিক উপসর্গগুলো অনেক সময় এতটাই সাধারণ মনে হয় যে আমরা সেগুলোকে অবহেলা করে থাকি। ফলে রোগ ধরা পড়ে অনেক দেরিতে, যখন চিকিৎসা জটিল হয়ে ওঠে।
চলুন জেনে নিই, ব্রেন টিউমারের কিছু সতর্কতামূলক উপসর্গ, যেগুলি দেখা দিলেই দ্রুত চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়া উচিত।
১. আচরণগত বা মেজাজে অস্বাভাবিক পরিবর্তন:হঠাৎ করে অতিরিক্ত রাগ বা খিটখিটে মেজাজ, অকারণে বিষণ্ণতা বা হতাশা, সিদ্ধান্ত নিতে সমস্যা, আত্মবিশ্বাস বা আগ্রহে ঘাটতি। এসব পরিবর্তন পরিবার বা ঘনিষ্ঠজনেরা হয়তো টের পান, কিন্তু রোগী নিজে সচরাচর তা বুঝতে পারেন না। মস্তিষ্কের ফ্রন্টাল লোব আক্রান্ত হলে এ ধরনের সমস্যা দেখা দিতে পারে।
২. স্মৃতি ও মনোযোগে ঘাটতি:সম্প্রতি ঘটে যাওয়া ঘটনা ভুলে যাওয়া, সহজ বিষয় মনে রাখতে না পারা, কাজের মাঝে মনোযোগ হারানো বা কথা বলার সময় সঠিক শব্দ খুঁজে না পাওয়া—এসবই হতে পারে ব্রেন টিউমারের ইঙ্গিত। এগুলো ডিমেনশিয়া বা স্ট্রেসের লক্ষণ মনে হলেও, টিউমারের কারণে মস্তিষ্কের কার্যক্ষমতা ব্যাহত হলে এমনটা হতে পারে।
৩. ভারসাম্য ও সমন্বয়হীনতা:চলা বা হাঁটার সময় সামান্য টলমল করা, হাতের সামনে থাকা জিনিস ধরতে অসুবিধা হওয়া—অনেকে এসবকে ক্লান্তি বা সাধারণ অসাবধানতা মনে করলেও, এগুলিও ব্রেন টিউমারের সম্ভাব্য উপসর্গ। সেরিবেলাম বা ব্রেইনস্টেম আক্রান্ত হলে এসব সমস্যা বেশি দেখা যায়।
৪. কথা ও লেখার অস্বাভাবিকতা:কথা জড়িয়ে যাওয়া, অস্পষ্টভাবে কথা বলা, অথবা হাতের লেখায় হঠাৎ পরিবর্তন- এসব পরিবর্তনের পেছনে স্ট্রেস বা সাময়িক সমস্যার পাশাপাশি মস্তিষ্কে টিউমার থাকার সম্ভাবনাও উড়িয়ে দেওয়া যায় না। এগুলো মস্তিষ্কের ভাষা ও মোটর সেন্টারের উপর চাপ সৃষ্টির কারণে হতে পারে।
৫. স্বাদ ও ঘ্রাণে পরিবর্তন:হঠাৎ কোনও গন্ধ বা স্বাদ না পাওয়া, কিংবা পরিচিত খাবার বা জিনিসের স্বাদ-গন্ধ অদ্ভুত লাগা- এই লক্ষণগুলো অনেক সময় সাধারণ ফ্লু বা সাইনাসের ভুলে গুলিয়ে ফেলা হয়। অথচ এগুলিও হতে পারে ব্রেন টিউমারের প্রাথমিক সংকেত।
অনেকেই এগুলোকে সাধারণ সাইনাস সমস্যা বা ভাইরাল জ্বর বলে ভেবে ভুল করেন। কিন্তু এগুলো অলফ্যাকটরি নার্ভ বা লোব সংক্রান্ত জটিলতারও ইঙ্গিত হতে পারে।
অন্যান্য সাধারণ উপসর্গ:মাথাব্যথা (বিশেষ করে সকালে ঘুম থেকে ওঠার পর), বমি বমি ভাব বা বমি (কোনো কারণ ছাড়াই), চোখে ঝাপসা দেখা বা ডাবল ভিশন, খিঁচুনি বা মৃদু টান (আগে না থাকলেও), শ্রবণ বা দৃষ্টিশক্তি হঠাৎ কমে যাওয়া।
ব্রেন টিউমারের ক্ষেত্রে প্রাথমিকভাবে এমআরআই (MRI), সিটিস্ক্যান (CT Scan), অথবা নিউরোলজিকাল টেস্টের মাধ্যমে রোগ নির্ণয় করা হয়। অনেক ক্ষেত্রে বায়োপসি দরকার হয় টিউমারের ধরণ ও গ্রেড চিহ্নিত করতে। উপসর্গগুলো একটানা ২-৩ সপ্তাহের বেশি স্থায়ী হলে বা বাড়তে থাকলে, অবহেলা না করে নিউরোলজিস্ট বা নিউরো সার্জনের পরামর্শ নেওয়া জরুরি।
স্বদেশ প্রতিদিন/এমএম