
কিশোরগঞ্জের ভৈরব উপজেলায় নদ নদী আর খাল বিলে বাড়ছে বর্ষার পানি। আর এই পানিতে গ্রামাঞ্চলের মানুষের জন্য নিত্য প্রয়োজনীয় হয়ে পড়েছে ছোট বড় মাঝাড়ি ধরণের নৌকা। এই নৌকার চাহিদা মেটাতে কুলিয়ারচর উপজেলার ছয় সুতি ও ভৈরবের শিমুলকান্দি এলাকায় কারিগররা মেতে উঠেছে নৌকা তৈরিতে।
এতে করে এই মৌসুমে কারিগড় ও মালিকদের বেশ কিছু টাকা উপার্জন হয়। এসব নৌকা দিয়ে মানুষ পারাপার, মাছ শিকার আর নদ নদী থেকে গরুর জন্য গো খাদ্য সংগ্রহ করে থাকেন স্থানিয়রা। শিকার করা মাছ বিক্রি করে বর্ষায় অধিকাংশ লোক তাদের পরিবারের খাবারের চাহিদা মিটিয়ে বাজারে বিক্রি করে অর্থ উপার্জন করে থাকেন।
ছয়সুতি ও শিমুলকান্দি ঘুরে দেখা গেছে কাঠ মিস্ত্রিরা নৌকা তৈরির উপকরণ দিয়ে অনেক সুন্দর করে বিভিন্ন আকারের নৌকা তৈরি করছেন। প্রকার ভেদে একেকটি নৌকার দাম ৫ থেকে ৫০ হাজার টাকা। এছাড়াও তারা ৩০ থেকে ৫০ হাত লম্বা নৌকাও তারা তৈরি করে থাকেন। সেগুলোর দাম কম করে হলেও লাখ টাকা।
সরেজমিনে দেখা যায়, অনেকের বাড়ির আঙ্গিনায় পানি চলে আসায় নৌকা ছাড়া বাড়ি থেকে বের হতে পারেন না। এ সময়টাতে গ্রামাঞ্চলের মানুষের চলাচল ও জীবিকার তাগিদে বেড়ে যায় ছোট ছোট নৌকার। কোথাও আসা যাওয়া করতে হলে গ্রাম এলাকার মানুষের নৌকা ছাড়া চলেনা। তাই বর্ষার মৌসুম শুরু হলেই বাড়তে থাকে ছোট ছোট নৌকার চাহিদা। আর এই চাহিদা মেটাতে প্রতি বছর ভৈরবের শিমুলকান্দি ও কুলিয়ারচরের ছয়সুতি এলাকায় মৌসুমি ব্যবসায়ীরা তৈরি করে থাকেন ছোট মাঝারি আকারের অনেক নৌকা। এখান থেকে নৌ কিনে নিচ্ছেন গ্রামাঞ্চলের বিভিন্ন শ্রেণিপেশার মানুষ। বর্ষায় এ নৌকা দিয়ে মানুষ তাদের প্রয়োজনীয় কাজ সারতে বিভিন্ন স্থানে যাতায়াত করতে হয়। গ্রামাঞ্চল থেকে শিক্ষা প্রতিষ্ঠান কিংবা কোনো কর্মস্থলে যেতে হলে নৌকা ব্যবহার করতে হচ্ছে এই সময়টাতে। নৌকা দিয়ে মানুষ পারাপার করে কেউ করছে অর্থ উপার্জন আবার কেউবা করছে মাছ শিকার। গ্রামের বেশির ভাগ মানুষই বর্ষার পানিতে মাছ শিকার করে থাকে। আর এই মাছ বিক্রির টাকায় মেটাচ্ছেন পরিবারে ভরণ পোষণ। তাই বর্ষার মৌসুমে গ্রামের মানুষের একমাত্র বাহন হচ্ছে নৌকা। এ নৌকাই হচ্ছে বর্ষায় গ্রাম এলাকার অধিকাংশ মানুষের জীবিকার তাগিদে অর্থ উপার্জনের একমাত্র চাবিকাঠি।
এলাকাবাসী রহমত উল্লাহ বলেন, বর্ষার মৌসুম শুরু হওয়ার আগ মুহূর্ত থেকেই মহাজনরা ছোট ছোট কোষা ডিঙি তৈরি শুরু করেন। বর্ষায় যখন চারিদিকে পানি থই থই করতে থাকে তখন এসব কোষা ডিঙির অনেক কদর বাড়ে। এসব ডিঙি নৌকা দিয়ে মানুষ ও মালামাল পারাপার, মাছ শিকার ও গরুর খাদ্য সংগ্রহ করা হয়। গ্রামাঞ্চলে এমন অনেক জায়গা আছে যেখানে নৌকা ছাড়া বাড়ির বাহির হওয়া যায় না। শহরে কিংবা সরকারি বেসরকারি অফিসে এমনকি শিক্ষা প্রতিষ্ঠানেও যেতে হলে শিক্ষার্থীদেরকে নৌকা ব্যবহার করতে হয়।
আগানগরের মাঝি আনোয়ার হোসেন বলেন, বর্ষার পানি এলে এই খালটি নৌকা ছাড়া পার হওয়া যায় না। তাই পানি আসার আগেই শিমুলকান্দি কখনো বা ছয় সুতি থেকে নৌকা কিনে আনি। দাম কখনো ৫ হাজার আবার কখনো ৬ হাজার টাকাও পরে। এ অঞ্চলের মানুষ শিক্ষা প্রতিষ্ঠানসহ হাট বাজার, বিভিন্ন সরকারি বেসরকারি প্রতিষ্ঠানে আসা যাওয়া করতে হলে এ নৌকা দিয়ে পার হতে হয়। আমাদের এলাকার সব চেয়ে বড় সমস্যা হল অসুস্থ রোগীদের নিয়ে। এই সিজনে বিভিন্ন ধরনের রোগে আক্রান্ত হয়ে অসুস্থ রোগী কিংবা গর্ভবতী নারীদেরকে ডাক্তারের কাছে নিতে হলেও সবার আগে প্রয়োজন হয় নৌকার।তাই আমার মত এমন অনেকেই ছোট ছোট নৌকা কিনে জীবিকা নির্বাহসহ প্রয়োজনীয় কাজগুলো সারতে নৌকা কিনে থাকেন। আমিও এই নৌকা দিয়ে মানুষ পারাপার করে প্রতিদিন আমি ৮শ থেকে ৯শ টাকা রোজী করে থাকি।
মাছ শিকারি রহমত ব্যাপারী বলেন, বর্ষায় যখন বাড়ির চারিদিকে পানি চলে আসে তখন আমরা মাছ শিকার করে বিক্রি করে থাকি অর্থ উপার্জন করি। সেই টাকাতে আমাদের সংসার চলে। সেজন্য বর্ষার সিজনে নৌকা ছাড়া আমাদের চলেনা। তাই ভৈরবে শিমুলকান্দি ও কুলিযারচরের ছয় সুতি থেকে আমরা নৌকা কিনে আনি। একেকটি নৌকার দাম পড়ে প্রায় ৫ থেকে ৬ হাজার টাকা। বর্ষার পানি নেমে গেলে আমরা কৃষি কাজ সহ বিভিন্ন পেশায় জড়িয়ে পড়ি। এভাবেই চলতে থাকে আমাদের গ্রামাঞ্চলে মানুষের জীবন।
অপর মহাজন রইস উদ্দিন বলেন, কাঠসহ নৌকা তৈরি উপকরণের দাম অনেক বেড়ে গেছে। আগে একেকটা নৌকা বিক্রি করে ২ থেকে আড়াই হাজার টাকা লাভ পেতাম। এখন তেমনটা হয় না। তারপরও যেহেতু দীর্ঘদিন যাবত এ পেশায় আছি তখন ছাড়তেও পারি না। সিজন শুরু হলেই কারিগরদের এনে চুক্তিভিত্তিক কাজে লাগিয়ে নৌকা তৈরি শুরু করি। সব খরচ বাদে একেক সিজনে ৩০ থেকে ৪০ হাজার টাকা আয় করে থাকি।
কারিগর রমেশ বর্মণ বলেন, একেকটা নৌকা তৈরি করতে ৫ থেকে ৬ দিন সময় লাগে। এভাবে প্রতি মাসে একেকজন কারিগর নৌকার প্রকার ভেদে ৪ থেকে ৫ টা নৌকা তৈরি করতে পারে। মজুরি হিসেবে জনপ্রতি কারিগর প্রতি মাসে ২০ থেকে ২২ হাজার টাকা রোজী করে থাকি শুধু বর্ষার মৌসুমে।
কারিগর সুধন চন্দ্র বলেন, বর্ষার মৌসুমে আমাদের কাজ বেড়ে যায়। এ মৌসুমে আমরা মহাজনদের নৌকা তৈরি করে থাকি। এতে প্রতিদিন ৮ শ থেকে ৯ শ টাকা মজুরি পাই। বাকি সময়টাতে অন্য কাজ করি। নৌকা তৈরি করে যে টাকা রোজি করি তাতে কয়েক মাস আমাদের ভালোই কাটে।
মহাজন হামিদ মিয়া বলেন, আমার মত এখানে আরো বেশ কয়েকজন মহাজন আছে যারা বর্ষার মৌসুমে ছোট ছোট নৌকা তৈরি করে বিক্রি করে থাকে। নৌকাগুলোর সাইজ অনুযায়ী দাম নেওয়া হয় সাড়ে ৪ থেকে সাড়ে ৫ হাজার টাকা করে। মহাজনরা এ মৌসুমে মাসে অন্তত ২০ থেকে ৩০ টা করে নৌকা বিক্রি করে থাকি। যার মূল্য আসে প্রায় লক্ষাধিক টাকা। এতে একেকজন মহাজনের লাভ হয় প্রতি মাসে অন্তত ২০ থেকে ২৫ হাজার টাকা। এখানকার তৈরি নৌকাগুলো নরসিংদী, কিশোরগঞ্জ ব্রাহ্মণবাড়িয়াসহ বিভিন্ন অঞ্চলের মানুষ কিনে নেয়। মৌসুমের বাহির সময়টাতে বিভিন্ন ধরনের ফার্নিচার তৈরি করে থাকি।
স্বদেশ প্রতিদিন/এনআর