প্রজাপতি, প্রকৃতির ক্ষুদ্রতম রঙিন উড়াল, নীরব সৌন্দর্যের নিঃশব্দ দূত। এক ঝটকায় তারা ফুলের ওপর বসে, পরাগ সংগ্রহ করে, আর চলে যায় অন্য কোনো গাছে কিন্তু এই ক্ষুদ্র উড়ালের মধ্যে লুকিয়ে থাকে প্রকৃতির গভীর বার্তা। প্রতিটি ডানা, প্রতিটি নীল, হলুদ বা লাল রঙের ছোঁয়া আমাদের বলে দেয় পরিবেশের স্বাস্থ্য কেমন, বনাঞ্চল ও জলবায়ু কতটা সুস্থ বা ঝুঁকিপূর্ণ।
রঙিন প্রজাপতির ঝিলিক যেন বাংলার প্রকৃতির এক চিরন্তন কবিতা। কিন্তু সেই কবিতার লাইনগুলো কি ধীরে ধীরে ফাঁকা হয়ে যাচ্ছে? জলবায়ু পরিবর্তন, নগরায়ণ, কীটনাশকের অতিরিক্ত ব্যবহার সব মিলিয়ে প্রজাপতির জীবনচক্র ঝুঁকির মুখে।
বাংলাদেশে প্রজাপতি শুধু সৌন্দর্যের প্রতীক নয় বরং পরিবেশব্যবস্থার নীরব প্রহরী। ফুল, বন, পানি, মাটি সবকিছুর সঙ্গে তাদের এক সূক্ষ্ম কিন্তু অপরিহার্য সম্পর্ক। অপরদিকে, গত এক দশকে প্রজাপতির সংখ্যা কমে আসার প্রবণতা গবেষকদের ভাবিয়ে তুলছে। পরিবেশবিদরা বলছেন, প্রজাপতির বিলুপ্তি প্রকৃতির ভারসাম্যে এমন এক ধাক্কা দেবে, যার প্রভাব মানুষের জীবনেও এসে পড়বে।
নগরায়ণে হারিয়ে যাওয়া সবুজ আবাসঃ
গত ২০ বছরে বাংলাদেশের নগরায়ণের হার বেড়েছে দ্রুত। ছোট ছোট গাছপালা, ঝোপঝাড়, আগাছা যার ওপর প্রজাপতির জীবনচক্র নির্ভর করে তা অদৃশ্য হচ্ছে চোখের সামনে। শহরের পার্কগুলোও এখন কংক্রিটে মোড়ানো সাজানো বাগানে রূপ নিয়েছে; সেখানে প্রজাপতির জন্য প্রয়োজনীয় খাবারগাছ ও ডিম দেওয়ার গাছের অস্তিত্ব খুবই কম।
এ বিষয়ে জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক ও প্রজাপতি গবেষক মনোয়ার হোসেন বলেন, যদি আমাদের সরকার সচেতন না হয়, তাহলে প্রজাপতি হারিয়ে যাবে। তিনি বলেন, জলবায়ু পরিবর্তন যেভাবে দ্রুত ঘটছে, তাতে সম্ভবত আগামী ১০ বছরের মধ্যেই এটা ঘটবে।
জলবায়ু পরিবর্তন; নীরব এক হুমকিঃ
প্রজাপতির জীবনচক্র অত্যন্ত সংবেদনশীল। তাপমাত্রা, আর্দ্রতা, বৃষ্টিপাত সবকিছুর সামান্য পরিবর্তনও তাদের খাদ্য, ডিম, লার্ভা ও কোকুন পর্যায়ে সরাসরি প্রভাব ফেলে। জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে বৃষ্টিপাতের অস্বাভাবিকতা, দীর্ঘ শুষ্ক মৌসুম বা তাপপ্রবাহ প্রজাপতির ডানায় মারাত্মক আঘাত হানে।
উত্তরবঙ্গ ও পার্বত্য অঞ্চলে কিছু প্রজাতির অকাল বিলুপ্তির আশঙ্কা ইতোমধ্যে প্রকাশ পেয়েছে। এ নিয়ে উদ্বেগ জানিয়েছেন বিশেষজ্ঞরা। তারা সতর্ক করেছেন, প্রজাপতির সংখ্যা কমে যাওয়া আসলে পরিবেশের অসুস্থতার প্রথম সতর্কসংকেত।
কৃষিজমিতে অতিরিক্ত কীটনাশকের ব্যবহারঃ
বাংলাদেশের গ্রামীণ প্রজাপতি প্রজাতিগুলোর সবচেয়ে বড় হুমকি কীটনাশক। ফসল রক্ষার নামে ব্যবহার করা রাসায়নিকগুলো শুধু ক্ষতিকর পোকাই মারে না; মেরে ফেলে প্রজাপতির ডিম, লার্ভা এবং খাদ্য গাছও।
কৃষকরা অনেক সময় না জেনেই প্রজাপতির প্রজনন ঋতুতেই মাঠে স্প্রে করেন যার ফলে একটি প্রজননচক্র পুরোপুরি ধ্বংস হয়ে যায়।
মানুষের অবহেলা ও কৌতূহলের ক্ষতিঃ
প্রজাপতি ধরার প্রবণতা, নষ্ট করে ফেলা শুঁয়োপোকা, ক্যাম্পাস বা পার্কের গাছ কাটার মতো কাজও প্রজাপতির জীবনচক্রে হস্তক্ষেপ করে। শিশুদের আনন্দ দিতে গিয়ে প্রজাপতির পেছনে দৌড়ানো ক্ষতিকর নয়, কিন্তু প্রজনন মরসুমে ফুলগাছ নষ্ট করা বা কোকুন ভেঙে ফেলা পরিবেশকে বিপদে ফেলে।
কেন প্রজাপতি রক্ষা জরুরি?
প্রজাপতি শুধু পরিবেশের সৌন্দর্য নয় এরা পরাগায়নকারী। ফুল, ফল, সবজি সবকিছুর উৎপাদনে তাদের অবদান আছে। পাখি ও প্রাণীদের খাদ্যচক্রেও তারা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। অর্থাৎ প্রজাপতির জীবন মানেই পুরো প্রকৃতির জীবন।
যদি একদিন প্রজাপতি হারিয়ে যায়, আমরা বুঝবো প্রকৃতি তার ভারসাম্য হারিয়েছে।
আশার আলো- বিশ্ববিদ্যালয় ও তরুণদের উদ্যোগঃ
জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়সহ দেশের বিভিন্ন শিক্ষা প্রতিষ্ঠান এখন প্রজাপতি গবেষণা, সংরক্ষণ ও জনসচেতনতা বৃদ্ধি নিয়ে কাজ করছে। ক্যাম্পাসে গড়ে উঠেছে প্রজাপতি-নিবিড় বাগান, যেখানে দেশী-বিদেশি বহু প্রজাতির প্রজাপতির নিরাপদ আশ্রয় তৈরি হয়েছে।
তরুণ শিক্ষার্থীরা প্রজাপতির ছবি তোলা, তথ্য সংগ্রহ, নতুন প্রজাতি শনাক্তকরণ এবং পরিবেশবান্ধব বাগান তৈরিতে আগ্রহ দেখাচ্ছেন। এই আগ্রহ যদি সারা দেশে ছড়িয়ে পড়ে, তাহলে প্রজাপতির ভবিষ্যৎ আরও উজ্জ্বল হবে।
প্রকৃতির হৃৎস্পন্দন প্রজাপতি তাদের উড়াল থেমে গেলে আমরা হারাব এক নীরব সৌন্দর্য, হারাব পরিবেশের সুস্থতার প্রাথমিক সূচক। আমাদের শহর, গ্রাম, ক্যাম্পাস যদি আবারও সবুজের কাছে ফিরে যায় তবে হয়তো কোনো ভোরবেলায় আমরা আবার দেখতে পাবো রঙিন ডানার নিঃশব্দ উড়াল।
লেখকঃ শিক্ষার্থী, আইন ও বিচার বিভাগ, জাবি