
পাবনা চাটমোহরের শাহী মসজিদ
মোঘল ইতিহাসের সাক্ষী হয়ে ঐতিহ্য ধারণ করে দাঁড়িয়ে আছে মফস্বলের সবুজের বুকে। লাল রঙের ইটের দেয়ালি শরীরের মাথায় ৩টি গোলাকার গম্বুজ। গম্বুজগুলোই যেন গোটা মসজিদ, ভেতরে ঢুকলে সেটা দেখা যায়, বোঝা যায়। প্রায় ৯০০ বছর বয়সী মসজিদের গড়নশৈলী রীতিমতো রূপকথার গল্প বলার মতো।
লম্বায় মসজিদটি ৪৫ ফুট, ২২ ফুট ৬ ইঞ্চি চওড়া। উচ্চতা ৪৫ ফুট। ক্ষুদ্র পাতলা জাফরি ইটে নির্মিত এর অবয়ব। এর দেয়াল ৬ ফুট ৯ ইঞ্চি প্রশস্ত। পরবর্তীতে সংস্কারের কারণে মাপের কিছুটা তারতম্য হয়েছে। পূর্বের দেয়ালে ৩টি প্রবেশপথের সঙ্গে পশ্চিম দেয়ালে রয়েছে তিনটি মেহরাব। কেন্দ্রীয় মেহরাব থেকে দুই পাশের মেহরাবে রয়েছে বড় সুরঙ্গের মতো অপূর্ব নিদর্শন। দূর থেকে মসজিদটি বিশাল মনে হলেও ভেতরে মাত্র দুই কাতারে নামাজে দাঁড়াতে পারেন মুসল্লিরা।
পাবনার চাটমোহর উপজেলার শহরের একেবারে মাঝামাঝি জায়গায় ঠাঁই পাওয়া মসজিদটির নাম শাহী মসজিদ। ইতিহাস মতে, সম্রাট আকবরের শাসনামলে সৈয়দ নেতা আবুল ফতে মোহাম্মদ মাসুম খাঁর অর্থায়নে মসজিদটি নির্মিত হয় ৯৮৯ হিজরি সনে, ইংরেজি ক্যালেন্ডার অনুযায়ী ১৫৮১ খ্রিস্টাব্দে। আবুল ফতে মোহাম্মদ মাসুম খাঁর সহোদর খান মুহাম্মদ তুকি খান মসজিদটি নির্মাণ করেন।
শিলালিপি পাঠ অনুযায়ী ধারণা করা হয়, মাসুম খাঁ নিজেকে সুলতানরূপে ঘোষণা করেন। এরপর কিছু কালের জন্য পাবনা অঞ্চলে স্বাধীন সালতানাত প্রতিষ্ঠা করেন। এ জন্য চাটমোহরে রাজধানী স্থাপন করেন। পরবর্তীতে প্রাচীন জনপদ চাটমোহর উপজেলায় বসতি স্থাপন করেন।
ইতিহাস অনুযায়ী নানা ঐতিহাসিক ঘটনার পর সৈয়দ আবুল ফতে মোহাম্মদ মাসুম খাঁ সম্রাট আকবরের অধীনতা অস্বীকার করে চাটমোহরে স্বাধীন ক্ষমতা পরিচালনাকালে মসজিদটি নির্মাণ করেন। আর তখন থেকেই মসজিদটি মাসুম খাঁর মসজিদ নামে পরিচিত।
মসজিদটির দেয়ালের গায়ে প্রাচীন ভাস্কর্যশিল্পের নিদর্শনে দেখা যায়, মসজিদটির তিনটি গম্বুজ ও ছাদ প্রায় ধ্বংস হয়ে পড়েছিল। দেয়ালের ইট খসে যখন ঐতিহ্য হারিয়ে যাচ্ছিল, তখন ১৯৮০-এর দশকে সরকারের প্রত্নতত্ত্ব অধিদপ্তর মসজিদটি সম্পূর্ণরূপে সংস্কার করে। বর্তমানে এটি একটি সংরক্ষিত মসজিদ। “লা-ইলাহা-ইল্লাল্লাহু-মুহাম্মাদুর-রাসুলুল্লাহ” এবং ‘কালেমা শাহাদাত’ লেখা খণ্ডিত একখানা কালো পাথর মসজিদের সামনের ভাগে স্থাপন করা রয়েছে। ১৯০৪ সালে প্রাচীন কীর্তি রক্ষা আইনের আওতায় তৎকালীন পাকিস্তান সরকারও মসজিদটি রক্ষার চেষ্টা করেছিল।
স্থানীয়দের ভাষ্য, মসজিদের সামনে মিঠা পানির একটি ইঁদারা (কূপ) ছিল। কিন্তু সেটি নষ্ট হয়ে যাওয়ায় ইঁদারার মুখ ঢালাই করে বন্ধ করে দেওয়া হয়েছে। মসজিদের পাশে নগররক্ষীদের কয়েকটি পাহারা ঘর (চৌকি) ছিল। সে পাহারা চৌকিগুলোও ধ্বংস হয়ে গেছে এবং স্থানগুলো দখল হয়ে গেছে।
প্রত্নতত্ত্ব অধিদপ্তরের আওতায় যাওয়ার পর কয়েক বছর আগে সরকারিভাবে মসজিদটি সংস্কার করা হয়। এতে এর সৌন্দর্য বৃদ্ধি পায়। প্রাচীর-গেট নির্মাণ করে পরিবেশে আনা হয়েছে মুঘল আমলের মাধুর্য। নির্মাণ করা হয়েছে মিনার। মসজিদটির সৌন্দর্য এখনও মানুষকে বিমোহিত করে। বহু পর্যটক আসেন সম্রাট আকবরের স্মৃতিবিজড়িত মসজিদটি দেখতে।
মসজিদটিতে নিয়মিত পাঁচ ওয়াক্তের নামাজের সঙ্গে জুম্মার নামাজ আদায় করা হয়। সেই সঙ্গে কেন্দ্রীয় জামাত হিসেবে ঈদুল ফিতর ও ঈদুল আজহার দু’টি ঈদের নামাজ এখানে অনুষ্ঠিত হয়।