
ইসরায়েল ও ইরানের মধ্যে চলমান সরাসরি সংঘাতে চতুর্থ দিনেও কোনো ধরণের নিয়ন্ত্রণের ইঙ্গিত নেই। একে অপরের ওপর পাল্টাপাল্টি প্রাণঘাতী হামলা চালিয়ে যাচ্ছে দুই পক্ষ। সোমবার ইসরায়েল ইরানের একটি হাসপাতাল এবং রাষ্ট্রীয় টেলিভিশন ভবনে বিমান হামলা চালায়। অন্যদিকে ইরান হাইফা ও তেল আবিব এলাকায় ক্ষেপণাস্ত্র হামলা চালিয়েছে।
তেহরানে রাষ্ট্রীয় টিভির সরাসরি সম্প্রচারে দেখা যায়, বিখ্যাত এক উপস্থাপক হঠাৎ ক্ষেপণাস্ত্র আসার খবর জানিয়ে দ্রুত স্টুডিও ছাড়ছেন। কিছুক্ষণের মধ্যেই ভবনে বিস্ফোরণ ঘটে। এতে সাংবাদিকদের হতাহতের খবর পাওয়া গেছে।
ইরানের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্র এসমাইল বাগায়ি জানান, ‘কারমানশাহ শহরের ফারাবি হাসপাতাল ইসরায়েলি বাহিনীর হামলায় ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। এটি যুদ্ধাপরাধ এবং আন্তর্জাতিক আইনের চরম লঙ্ঘন।’
স্থানীয় গণমাধ্যমে প্রকাশিত ও সানাদ ফ্যাক্টচেকিং সংস্থা দ্বারা যাচাই করা ভিডিও ফুটেজে রক্তের দাগ দেখা গেছে, যা প্রাণহানির প্রমাণ হিসেবে উঠে এসেছে।
ইরানের ফার্স নিউজ এজেন্সির বরাতে জানা গেছে, ইসরায়েল তেহরানের পশ্চিমে একটি সামরিক ঘাঁটিতেও হামলা চালিয়েছে। রাজধানীর পূর্বাঞ্চলে বিস্ফোরণের শব্দ শোনা গেছে। এর আগে রোববার ইসরায়েল তেহরানের বিভিন্ন এলাকায় বোমা বর্ষণ করে।
ইসরায়েলি প্রতিরক্ষামন্ত্রী ইসরায়েল কাৎজ হুঁশিয়ারি দিয়ে বলেন, ‘তেহরানবাসীকে এর মূল্য চুকাতে হবে—খুব শিগগিরই।’
এর আগে সোমবার সকালে ইরান ইসরায়েলের মধ্যাঞ্চল ও হাইফা বন্দরে হামলা চালায়, যাতে অন্তত ৮ জন নিহত ও অর্ধশতাধিক আহত হয়। এর প্রতিশোধে ইসরায়েল রাতভর তেহরান ও আশপাশে সামরিক ও বেসামরিক স্থাপনায় হামলা চালায়।
চার দিনের এই লড়াইয়ে দুই দেশে নিহতের সংখ্যা ২৫০ জনের কাছাকাছি পৌঁছেছে। ইরানের দাবি, এখন পর্যন্ত ইসরায়েলি হামলায় তাদের ২২৪ জন নাগরিক নিহত হয়েছে এবং আরও প্রতিশোধমূলক হামলার ঘোষণা দিয়েছে তারা।
ইসরায়েল বলছে, তারা কুদস ফোর্সের (ইরানের বিপ্লবী গার্ড বাহিনীর বিদেশি শাখা) কয়েকটি কমান্ড সেন্টারে হামলা চালিয়েছে। এসব ঘাঁটি থেকে মধ্যপ্রাচ্যে তাদের প্রতিনিধিদের মাধ্যমে ইসরায়েলের বিরুদ্ধে হামলা চালানো হতো।
তবে ইরান বলছে, ইসরায়েল কেবল সামরিক নয়, বেসামরিক এলাকাও লক্ষ্যবস্তু করেছে। রবিবারই তারা ইরানের পারমাণবিক ও ক্ষেপণাস্ত্র স্থাপনায় হামলা চালায় এবং বিপ্লবী গার্ড বাহিনীর গোয়েন্দা প্রধানসহ কয়েকজন সামরিক বিজ্ঞানীকে হত্যা করে।
এদিকে যুক্তরাষ্ট্রের সাবেক প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প রবিবার বলেন, তিনি চুক্তি চান, কিন্তু লড়াই না করে তা সম্ভব নয় বলেও মন্তব্য করেন। তাঁর এমন দ্ব্যর্থক মন্তব্য নিয়ে সমালোচনা উঠেছে।
ইরানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী আব্বাস আরাগচি বলেন, ‘তেল আবিবে বাংকারে লুকিয়ে থাকা যুদ্ধাপরাধীদের শাস্তি পেতেই হবে।’ তিনি বলেন, ‘ট্রাম্প যদি সত্যিই কূটনীতির পক্ষে থাকেন, তাহলে ওয়াশিংটনকে এক ফোন করলেই নেতনিয়াহুকে থামানো সম্ভব।’
এদিকে ইসরায়েলের প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতনিয়াহু বলেছেন, ‘আমরা বিজয়ের পথে আছি। তেহরানের আকাশ নিয়ন্ত্রণে।’ আর ইরানের প্রেসিডেন্ট মাসউদ পেজেশকিয়ান পার্লামেন্টে বলেন, ‘সব বিভাজন ভুলে একসাথে দাঁড়াতে হবে এই গণহত্যার বিরুদ্ধে।’
বিশ্বজুড়ে যখন এই সংঘাত বন্ধে আহ্বান জানানো হচ্ছে, তখন দুই দেশের বক্তব্য এবং হামলা-প্রতিহামলা পরিস্থিতি স্পষ্ট করছে—আপাতত বিরতির কোনো সুযোগ নেই। যুদ্ধ আরও ভয়াবহ রূপ নিতে পারে বলেও আশঙ্কা বাড়ছে।
সূত্র : আল জাজিরা
স্বদেশ প্রতিদিন/কেএইচ