কুয়েটের ১১'শ শিক্ষক-কর্মকর্তার বেতন-ভাতা বন্ধ, বিকল্প ব্যবস্থার জন্য আবেদন প্রশাসনের

খুলনা প্রকৌশল ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয় (কুয়েট) বর্তমানে এক গভীর প্রশাসনিক অচলাবস্থার মধ্য দিয়ে সময় পার করছে। একের পর এক উপাচার্য অপসারণ ও পদত্যাগের ঘটনায় প্রতিষ্ঠানটি কার্যত নেতৃত্বশূন্য হয়ে পড়েছে, যার সরাসরি প্রভাব পড়েছে বিশ্ববিদ্যালয়ের আর্থিক কার্যক্রমে।
বিশ্ববিদ্যালয়ের কোনো উপাচার্য না থাকায় গত ২১ মে থেকে কুয়েটের সকল ধরনের লেনদেন বন্ধ রয়েছে। কারণ, উপাচার্যের অনুমোদিত স্বাক্ষর ছাড়া কোনো বিল পরিশোধ করা সম্ভব নয়।
সর্বশেষ অন্তর্বর্তীকালীন উপাচার্য অধ্যাপক ড. মো. হযরত আলীর পদত্যাগের পর কুয়েট সম্পূর্ণরূপে উপাচার্যশূন্য হয়ে পড়ে। এর আগে গত ১৮ ফেব্রুয়ারি ছাত্র-ছাত্রীদের আন্দোলনের প্রেক্ষাপটে সংঘর্ষের ঘটনায় সরকার প্রাক্তন উপাচার্য অধ্যাপক ড. মুহাম্মদ মাসুদ এবং প্রো-ভিসি অধ্যাপক ড. শরিফুল আলমকে অপসারণ করে।
টানা ১০১ দিন ধরে শিক্ষা কার্যক্রম বন্ধ রয়েছে এবং অনুমোদিত স্বাক্ষরকারী না থাকায় বিশ্ববিদ্যালয়ের ১,১০০-এরও বেশি শিক্ষক, কর্মকর্তা ও কর্মচারী বেতন, ভাতা ও ঈদুল আজহার উৎসবভাতা থেকে বঞ্চিত হয়েছেন। এর মধ্যে প্রায় ৫০০ জন নিম্ন আয়ের কর্মচারী রয়েছেন, যারা ঈদের প্রাক্কালে চরম আর্থিক সংকটে রয়েছেন।
বিশ্ববিদ্যালয়ের হিসাব বিভাগ জানিয়েছে, শুধু বেতন-ভাতা নয়, উন্নয়ন প্রকল্পগুলোর বিল পরিশোধেও উপাচার্যের স্বাক্ষর প্রয়োজন। ফলে ৩৫০ জনের বেশি শিক্ষক, ২০০ কর্মকর্তা ও ৫০০ কর্মচারীর বকেয়া বিল আটকে রয়েছে।
এমনকি বিশ্ববিদ্যালয়ে নিযুক্ত প্রায় ৩০ জন আউটসোর্সড নিরাপত্তাকর্মী এপ্রিল মাসের বেতন পাননি। নিরাপত্তাকর্মীদের তত্ত্বাবধায়ক মো. সুমন সরদার বলেন, “আমরা এমনিতেই কম বেতনে কাজ করি। ঈদ সামনে, সন্তানের মুখে কীভাবে খাবার তুলব—তা জানি না।”
প্রশাসনিক স্থবিরতার প্রভাব পড়েছে কুয়েটের উন্নয়ন প্রকল্পেও। ৬০০ কোটি টাকার অবকাঠামো ও শিক্ষা সম্প্রসারণ প্রকল্পের পরিচালক জুলফিকার হোসেন বলেন, ‘ভিসি মাসুদের অপসারণের পর অন্তর্বর্তী উপাচার্যও কোনো বিল স্বাক্ষর করেননি। ফলে ঠিকাদারদের অর্থ দেওয়া যাচ্ছে না। পরিস্থিতি দ্রুত সমাধান না হলে ঈদের পর কাজ পুরোপুরি বন্ধ হয়ে যেতে পারে।’
ডেপুটি রেজিস্ট্রার ও অফিসার্স অ্যাসোসিয়েশনের সভাপতি মো. মইনুল হক বলেন, ‘এই অচলাবস্থা থেকে যদি দ্রুত উত্তরণ না হয়, তাহলে কর্মকর্তা-কর্মচারীরা রাস্তায় নামতে বাধ্য হবেন।’
চামড়া প্রকৌশল বিভাগের প্রধান অধ্যাপক ড. মো. গোলাম কাদের বলেন, ‘১৮ ফেব্রুয়ারির সংঘর্ষে কিছু শিক্ষক আক্রান্ত হন। অথচ কোনো তদন্ত ছাড়াই উপাচার্য ও প্রো-ভিসিকে সরিয়ে দেওয়া হয়। কুয়েট এখন অভিভাবকহীন অবস্থায় রয়েছে।’
শিক্ষক সমিতির সাধারণ সম্পাদক অধ্যাপক ড. মো. ফারুক হোসেন বলেন, ‘আমরা নেতৃত্ববিহীন। শিক্ষার্থীরা ক্লাসে ফিরতে চায়, আমরাও চাই। কিন্তু নেতৃত্ব ছাড়া ন্যায়বিচার নিশ্চিত করা সম্ভব নয়।’
এই পরিস্থিতিতে, শুক্রবার (৩০ মে) বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসনের পক্ষ থেকে সায়েন্স অ্যান্ড হিউম্যানিটিস অনুষদের ডিন অধ্যাপক ড. আবুল কালাম আজাদ শিক্ষা উপদেষ্টার বরাবর একটি চিঠি দিয়েছেন। চিঠিতে উপাচার্য নিয়োগ না হওয়া পর্যন্ত আর্থিক কার্যক্রম পরিচালনার জন্য বিকল্প ব্যবস্থা গ্রহণের অনুরোধ জানানো হয়েছে।
উল্লেখ্য, ১৮ ফেব্রুয়ারি ছাত্র রাজনীতি নিষিদ্ধের দাবিতে আন্দোলনের সময় শিক্ষার্থীদের সঙ্গে বহিরাগতদের সংঘর্ষ শুরু হয়। এতে প্রাক্তন উপাচার্য মাসুদসহ শতাধিক শিক্ষার্থী আহত হন। এরপর বিশ্ববিদ্যালয়ের কার্যক্রম স্থগিত হয় এবং শিক্ষার্থীরা পাঁচ দফা দাবিতে আন্দোলন শুরু করে, যা পরে উপাচার্য অপসারণের দাবিতে রূপ নেয়।
২৩ এপ্রিল শিক্ষার্থীরা আমরণ অনশনে বসেন এবং ২৫ এপ্রিল সরকার উপাচার্য ও প্রো-ভিসিকে অপসারণ করে। এরপর ১ মে চুয়েটের অধ্যাপক হযরত আলী কুয়েটের অন্তর্বর্তী উপাচার্য হিসেবে নিয়োগ পান। তবে শিক্ষকরা ঘটনার বিচার দাবি করে একাডেমিক কার্যক্রম স্থগিত রাখেন এবং ৩৭ জন শিক্ষার্থীকে কারণ দর্শানোর নোটিশ দেওয়ায় নতুন করে আন্দোলন শুরু হয়। অবশেষে ২১ মে হযরত আলী পদত্যাগ করলে বিশ্ববিদ্যালয় আবারও সম্পূর্ণরূপে নেতৃত্বশূন্য হয়ে পড়ে।
স্বদেশ প্রতিদিন/এমএম