
২০২৫ সালের ৭ মে পাকিস্তানের সীমান্তবর্তী গোলাবর্ষণে নিহত হয় ১২ বছর বয়সী জমজ ভাইবোন জয়ন আলী ও উরবা ফাতিমা। তাঁদের বাড়ি ভারত নিয়ন্ত্রিত কাশ্মীরের পুঞ্চ জেলায়।
শুধু একটি মেয়ে সন্তান, পাঁচ বছরের মেয়ে, ১২ বছরের জমজ ভাই-বোন—যুদ্ধের আগুনে পুড়ে ছারখার বহু পরিবার। প্রাণ হারিয়েছেন অন্তত ২১ বেসামরিক মানুষ, শুধু পুঞ্চ জেলাতেই নিহত ১৫ জন।
শ্রীনগর:
মোবাইল ফোনে মেয়ের ছবি দেখাচ্ছিলেন জাভেদ ইকবাল। ছবিতে দেখা যাচ্ছে, ছোট্ট মেয়েটি গোলাপি উলের টুপি পরে আছে, গলায় ঝুলছে ছোট একটি ট্রিংকেট। হাসিমুখে ক্যামেরার দিকে তাকিয়ে আছে সে—পাঁচ বছরের মরিয়ম।
মাত্র এক মাস আগে তোলা ছবি। এখন সেই হাসিমুখ নেই, মরিয়ম নেই।
গত ৭ মে সকালে পাকিস্তান থেকে ছোড়া একটি বিস্ফোরক ইকবালের বাড়িতে এসে পড়ে। ঘটনাটি ঘটে পুঞ্চ জেলার সোখা কাথা গ্রামে, যা পাকিস্তানের সঙ্গে সীমান্ত লাইন অব কন্ট্রোল (এলওসি) থেকে প্রায় ২০ কিলোমিটার দূরে। বিস্ফোরণে নিহত হয় মরিয়ম।
কান্নায় ভেঙে পড়ে ইকবাল বলেন, “ও মরিয়ম… এই শোক আমি বয়ে নিয়ে বাঁচতে পারব না।”
চতুর্থ যুদ্ধের দ্বারপ্রান্তে
পাকিস্তান ও ভারতের মধ্যে কয়েক দশকের মধ্যে সবচেয়ে তীব্র সামরিক উত্তেজনা শুরু হয় এপ্রিলের শেষদিকে। ৭ মে থেকে টানা চার দিন চলতে থাকে ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন হামলা। এরপর ১০ মে দুপক্ষ যুদ্ধবিরতিতে সম্মত হয়।
তবে সীমান্তের কাছে বসবাসরত সাধারণ মানুষের জীবনে এই সাময়িক শান্তি খুব একটা অর্থবহ নয়।
ইকবাল বলেন, “মরিয়মকে আমার কোলেই মরতে হলো—এই দৃশ্য ভেবে আমার হৃদয় ফেটে যায়।”
‘মাটি কেঁপে উঠেছিল’
কাশ্মীরের বিতর্কিত অঞ্চলের নিয়ন্ত্রণ নিয়ে ভারত-পাকিস্তানের বহু দশকের দ্বন্দ্ব। উভয় দেশই কাশ্মীর পুরোটা নিজের দাবি করে। গত কয়েক দশকে চারটি যুদ্ধের মধ্যে তিনটিই হয়েছে এই অঞ্চল নিয়ে।
২০০৩ সালে সীমান্তে যুদ্ধবিরতি হয়, যা মাঝে মাঝে লঙ্ঘিত হলেও মূলত বজায় ছিল। ২০২১ সালে আবারও তা নবায়ন হয়।
তবে গত ২২ এপ্রিল পাহেলগাম শহরে ২৫ জন পর্যটক ও এক ঘোড়াচালক নিহত হওয়ার পর উত্তেজনা চূড়ায় ওঠে। ভারত এর জন্য পাকিস্তানকে দায়ী করে, যদিও ইসলামাবাদ তা অস্বীকার করেছে।
এরই ধারাবাহিকতায় ভারত ৭ মে পাকিস্তান ও পাকিস্তান-শাসিত কাশ্মীরের বিভিন্ন স্থানে হামলা চালায়। দাবি করে, ‘সন্ত্রাসী ঘাঁটি’ গুঁড়িয়ে দেওয়া হয়েছে। পাকিস্তান জানায়, নিহতদের বেশিরভাগই বেসামরিক মানুষ।
মরিয়মের শেষ সকাল
ইকবাল জানান, ৭ মে রাত ২টার দিকে গোলাবর্ষণের শব্দে ঘুম ভাঙে তাঁর। পুলিশ, প্রশাসনের কর্মকর্তাদের ফোন করে সাহায্য চাইলেও কেউ আসেনি।
তিন সন্তান ও ভাইয়ের তিন সন্তানকে নিয়ে একটি ওয়ার্কশেডে আশ্রয় নেন তাঁরা। কিন্তু ভোরের পর এক বিস্ফোরক ঠিক তাঁদের কাছেই এসে পড়ে। মরিয়মের শরীরে ছিন্নবিচ্ছিন্ন হয়ে ঢুকে পড়ে গরম ধাতব টুকরো।
তাঁর বড় মেয়ে ইরাম নাজ (৭) গুরুতর আহত হয়, বর্তমানে তাঁরা কাসবা গ্রামে চিকিৎসাধীন।
মৃত্যুপুরীতে পরিণত সোখা কাথা
তিন দিন ধরে গোলাবর্ষণ চলে সোখা কাথায়। প্রায় ২০০ পরিবারের গ্রামটি এখন প্রায় জনশূন্য। কেবল কিছু পুরুষ পাহারায় থাকেন।
“সবাই পালিয়ে গেছে। চুরি-ডাকাতি ঠেকাতে আমরা কয়েকজন রয়ে গেছি,” বলেন স্থানীয় বাসিন্দা মোহাম্মদ মুখতার।
ভূগোলের কারণে ঝুঁকিতে ভারতীয় গ্রাম
রাজনৈতিক বিশ্লেষক জাফর চৌধুরীর মতে, সীমান্তে ভারতীয় গ্রামগুলো পাহাড়ের নিচে অবস্থিত, আর পাকিস্তানি সেনাচৌকিগুলো পাহাড়ের উপরে। ফলে ভারতের প্রতিক্রিয়ায় পাকিস্তানে বেসামরিক ক্ষয়ক্ষতির সম্ভাবনা কম, কিন্তু ভারতের গ্রামগুলো মারাত্মক ঝুঁকির মধ্যে পড়ে।
গাড়িতে থাকা অবস্থায় নিহত ১৩ বছরের ভিহান
খানেতার গ্রামে বাড়ি ভিহান কুমারের। পাকিস্তানি গোলা বিস্ফোরণে তাঁর পরিবার যখন পালাতে চেষ্টা করছিল, তখন গাড়ির মধ্যেই মারা যায় সে। মাথা ছিন্নভিন্ন হয়ে গিয়েছিল।
ভিহানের বাবা সঞ্জীব ভারগব বলেন, “আমার ছেলে তখন রক্তের সাগরে… হাসপাতালে নেওয়ার আগেই ও চলে গেল।”
জমজ দুই সন্তান হারালেন রমিজ
জম্মুর সরকারি মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের আইসিইউ-তে মৃত্যুর সঙ্গে লড়ছেন রমিজ খান। পাকিস্তানি শেলের টুকরো তাঁর যকৃৎ ছিদ্র করে দিয়েছে। একই হামলায় তাঁর ১২ বছর বয়সী জমজ সন্তান—জয়ন আলী ও উরবা ফাতিমা—নিহত হয়।
রমিজের স্ত্রী আরুশার বোন মারিয়া জানান, “ওরা বাড়ি থেকে বের হয়ে গাড়ির দিকে দৌড়েছিল, তখনই শেল পড়ে। উরবা ঘটনাস্থলেই মারা যায়। জয়ন আহত অবস্থায় পাশের বাড়িতে গিয়ে পড়ে, সেখানেই মারা যায়।”
যুদ্ধাপরাধের আশঙ্কা
হিউম্যান রাইটস ওয়াচের এশিয়া অঞ্চলের উপপরিচালক মীনাক্ষী গাঙ্গুলী বলেন, “বেসামরিক এলাকায় নির্বিচারে হামলা আন্তর্জাতিক মানবাধিকার আইনের লঙ্ঘন। ইচ্ছাকৃত হলে তা যুদ্ধাপরাধ হিসেবে বিবেচিত হতে পারে।”
‘মৃত্যুর নগ্ন নৃত্য’
পুঞ্চের রাজনীতিক শামীম গণাই বলেন, “পাকিস্তানি গোলাবর্ষণ একেবারে মৃত্যু আর ধ্বংসের নগ্ন নৃত্য ছিল। মানুষ নিরস্ত্র, অনাহারে, খালি পায়ে দৌড়ে পালিয়েছে।”
তিনি বলেন, “আগেও অনেক গোলাগুলির মধ্যে থেকেছি, কিন্তু এমন ভয়াবহতা আগে কখনও দেখিনি।”
আল জাজিরা থেকে অনূদিত
স্বদেশ প্রতিদিন/কেএইচ