বৃহস্পতিবার ২৪ সেপ্টেম্বর ২০২৬
   
শিরোনাম:
শরণখোলায় আওয়ামী লীগের বিরুদ্ধে বিএনপির বিক্ষোভ      রৌমারীতে উপজেলা কাব ক্যাম্পুরীর উদ্বোধন      কপোতাক্ষে মিলল ভ্যানচালক ইখলাসের মরদেহ      টাঙ্গাইল সেতুর প্রকৌশলীকে স্ট্যান্ড রিলিজ      মিছিলের চেষ্টা, ছাত্রলীগের ২০ নেতাকর্মী আটক      এনসিপি নেতাদের গণধোলাই দিতে হবে: এমদাদ চৌধুরী      ৬৮ লাখ টাকার চোরাই পণ্য জব্দ করেছে বিজিবি      ৪২ বোতল বিদেশি মদসহ আটক ৩      বিগত সরকারের সময়ে কুইক রেন্টালের নামে লুটপাট হয়েছে : ড. এম এ কাইয়ুম      আজ জাতিসংঘে বাংলায় ভাষণ দেবেন প্রধানমন্ত্রী       নভেম্বর-ডিসেম্বরে ভোট নয়, জানুয়ারিতে স্থানীয় নির্বাচন: ইসি      বিশ্ববাজারে আরও বাড়ল তেলের দাম      
কেন কাশ্মীরি তরুণরা বন্দুক, ‘আজাদি’র ট্যাটু মুছে ফেলছে
কামাল হোসাইন
প্রকাশ: সোমবার, ১৯ মে, ২০২৫, ৬:০৯ পিএম

ভারত-শাসিত কাশ্মীরের বৃহত্তম শহর শ্রীনগরের এক নিরিবিলি লেজার ক্লিনিকে সামির ওয়ানি বসে আছেন হাত বাড়িয়ে। চোখ তার চামড়ায় ফিকে হয়ে আসা কালি অনুসরণ করছে।

হাতে খোদাই করা "আজাদি" (উর্দুতে স্বাধীনতা) শব্দটি, একসময় ভারতের শাসনের বিরুদ্ধে প্রতিবাদের জ্বলন্ত প্রতীক ছিল—এখন তা ধীরে ধীরে মুছে যাচ্ছে লেজারের যন্ত্রণায়। যা ছিল এক সময়ের অহংকার, এখন তা হয়ে উঠেছে এমন এক বোঝা যা আর বহন করতে চান না তিনি।

২৮ বছর বয়সী সামির বলছেন, “একবার আমি মোটরসাইকেলে এক বন্ধুর সঙ্গে যাচ্ছিলাম, হঠাৎ ভারতীয় নিরাপত্তা বাহিনী আমাদের থামায়। এক কর্মকর্তা আমার ট্যাটু দেখিয়ে জিজ্ঞেস করল, ‘এটা কী?’ ভাগ্য ভালো, সে উর্দু পড়তে পারত না। তখনই বুঝলাম, এই ট্যাটু আমাকে বড় বিপদে ফেলতে পারে।”

তিনি বলেন, “ছোটবেলায় মনে হতো এটা শক্তির প্রতীক। এখন মনে হয় এটা ভুল ছিল। এটা আর আমার পরিচয় নয়। এটা এখন একটা ঝুঁকি—যেটা আমার ভবিষ্যৎ নষ্ট করে দিতে পারে।”

সামির একা নন। অনেক কাশ্মীরি তরুণ এখন এমন ট্যাটু সরিয়ে ফেলছেন—যেগুলো একসময় তাদের রাজনৈতিক মনোভাব, আবেগ বা পরিচয়ের প্রতীক ছিল।

যদিও ট্যাটু মুছে ফেলার প্রবণতা আগেই শুরু হয়েছিল, তাতে নতুন মাত্রা যোগ হয়েছে গত মাসে পহেলগামে ২৬ জন নিহত হওয়ার ঘটনার পর। ভারত-পাকিস্তান এই নিয়ে ফের যুদ্ধের মুখোমুখি চলে গিয়েছিল।

ভারত পাকিস্তানের বিরুদ্ধে ১৯৮৯ সাল থেকে কাশ্মীরে চলা সশস্ত্র বিদ্রোহকে মদদ দেওয়ার অভিযোগ করে। পাকিস্তান তা অস্বীকার করে, দাবি করে তারা কেবল কাশ্মীরি বিচ্ছিন্নতাবাদীদের নৈতিক ও কূটনৈতিক সহায়তা দেয়।

পাহেলগামের ঘটনার দুই সপ্তাহ পর, ৭ মে ভারত পাকিস্তান ও পাকিস্তান-শাসিত কাশ্মীরে ড্রোন ও ক্ষেপণাস্ত্র হামলা চালায়—১৯৭১ সালের যুদ্ধের পর এটাই ছিল সবচেয়ে বড় সীমান্ত পারাপারের অভিযান। তিন দিন ধরে দুই পক্ষের মধ্যে পাল্টাপাল্টি গুলি বিনিময়ের পর ১০ মে যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের মধ্যস্থতায় যুদ্ধবিরতির ঘোষণা আসে।

তবে ভারত-শাসিত কাশ্মীরে পরিস্থিতি এখনো থমথমে। নিরাপত্তা বাহিনীর ধরপাকড় বেড়েছে, সন্দেহভাজন বিদ্রোহীদের বাড়ি গুঁড়িয়ে দেওয়া হয়েছে, বাড়িতে বাড়িতে হানা পড়ছে, এবং পাহেলগামের ঘটনার পর ১,৫০০-এর বেশি মানুষকে আটক করা হয়েছে, অনেককে প্রিভেন্টিভ ডিটেনশনে নেওয়া হয়েছে।

এমন টানটান পরিস্থিতিতে কাশ্মীরি তরুণরা বলছেন, তারা যেন দিন দিন আরও বেশি নজরদারির আওতায় চলে যাচ্ছে। এমনকি তাদের শরীরের উল্কিত লেখাগুলোও এখন ‘ঝুঁকি’।

শোপিয়ানের বাসিন্দা ২৬ বছর বয়সী রায়িস ওয়ানি বলেন, “ভারত-পাকিস্তানের মধ্যে কিছু হলেই আমরা সেটা গায়ে মেখে নিই। আমার হাতে হুরিয়ত নেতা সৈয়দ আলী শাহ গিলানির নামের ট্যাটু আছে। পাহেলগামের ঘটনার পর থেকে চেকপয়েন্টে অদ্ভুত দৃষ্টিতে তাকাচ্ছে সবাই।”

“বন্ধুরাও অস্বস্তিকর প্রশ্ন করে। পুলিশ, প্রতিবেশী, এমনকি গণমাধ্যমও ভিন্ন চোখে দেখছে,”—যোগ করেন তিনি।

“মানুষ যদি বুঝত যে একটা ট্যাটু দিয়ে কারও চরিত্র বিচার করা যায় না! আমরা শুধু বাঁচতে চাই, প্রতিদিন ব্যাখ্যা দিতে দিতে ক্লান্ত।”

পুলওয়ামার ১৯ বছর বয়সী আর্সালান বলেন, “যাদের ট্যাটুতে রাজনৈতিক বার্তা আছে, তারা এখন আতঙ্কে—তাদের যেকোনো সময় আটক করা হতে পারে।”

তবে কাশ্মীরে ট্যাটুর জনপ্রিয়তা একেবারে হারিয়ে যায়নি। এখনো অনেক তরুণ ট্যাটু করাচ্ছেন। শুধু বদলে গেছে নকশা—রাজনৈতিক বা ধর্মীয় বার্তার বদলে এখন মানুষ বেছে নিচ্ছে ছোট, নান্দনিক ডিজাইন, প্রকৃতিপ্রেরিত চিত্র বা স্টাইলিশ ফন্টে নিজের নাম কিংবা উদ্ধৃতি।

ধর্ম, পরিবার, চাকরি—সবই কারণ

বারামুল্লার ইরফান ইয়াকুব বলেন, “আমি যখন কিশোর ছিলাম, এক নিহত বিদ্রোহীর নাম হাতে ট্যাটু করিয়েছিলাম। তখন মনে হয়েছিল এটা সাহসের প্রতীক। এখন মনে হয় জীবন এগিয়ে গেছে, আমিও বদলে গেছি। এখন পরিবার, চাকরি আর ভিন্ন দায়িত্ব রয়েছে।”

ট্যাটু সরানোর কারণ কেবল নিরাপত্তা নয়। কারও জন্য এটা অতীতের যন্ত্রণার স্মৃতি, কারও জন্য পেশাগত পথে বাধা।

শ্রীনগরের আনাস মির তার ‘আজাদি’ লেখা তরবারির ট্যাটু মুছে ফেলেছেন। বলেন, “পরিবারের চাপে মুছেছি। তবে যেকোনো ট্যাটু করা আমার অধিকার। সরকার এতে হস্তক্ষেপ করতে পারে না।”

ধর্মীয় দৃষ্টিকোণ থেকেও অনেকে ট্যাটু মুছে ফেলছেন। ২৪ বছর বয়সী ফাহিম বলছেন, তিনি ১৭ বছর বয়সে পিঠে একটি কোরআনিক আয়াত ট্যাটু করান। পরে বুঝতে পারেন, ইসলামে ট্যাটু নিরুৎসাহিত। “নামাজ পড়তে গেলে অপরাধবোধ হতো। তাই মুছে ফেলেছি।”

ধর্মীয় আলেম আলি মোহাম্মদ বলেন, “ট্যাটু মুছে ফেলা লজ্জা নয়, পরিপক্বতার লক্ষণ। মানুষ যখন বুঝতে পারে কোনো কিছু তাদের বিশ্বাসের সঙ্গে যায় না এবং তা সংশোধন করে—এটাই বড় কথা।”

সরকারি চাকরির ক্ষেত্রেও ট্যাটু সমস্যা তৈরি করতে পারে। তলিব নামের এক যুবক বলেন, “আমার হাতে ছিল একে-৪৭ আকৃতির ট্যাটু, যার মধ্যে ছিল কোরআনিক আয়াত। একবার চাকরির আবেদন করলে পরিবারে এক পুলিশ কর্মকর্তা বলেন, এটা সমস্যা হতে পারে।”

‘ভবিষ্যতের জন্য অতীত মুছে দিচ্ছি’

শ্রীনগরের বেশ কয়েকটি ক্লিনিকে এখন লেজার ট্যাটু রিমুভালের চাহিদা বেড়েছে। আগে যা ছিল বিরল, এখন তা নিয়মিত—সেশন বুকিং নিতে সময় লাগে সপ্তাহখানেক।

ট্যাটু শিল্পী ও রিমুভাল সার্ভিস চালক মুবারক বশির বলেন, “২০২২ সালে গায়ক সিধু মুসেওয়ালার মৃত্যুর পর একে-৪৭ ট্যাটুর ঝড় ওঠে। এখন তার উল্টোটা ঘটছে। মানুষ ভয় পাচ্ছে, নিরাপত্তাহীনতায় ভুগছে।”

তিনি জানান, ২০১৯ সালে কাশ্মীরের স্বায়ত্তশাসন বাতিলের পর থেকে প্রায় কয়েক লাখ ট্যাটু সরানো হয়েছে।

ট্যাটু মুছতে ব্যথা লাগে, অনেক সেশন লাগে, খরচ হয় হাজার হাজার রুপি। তারপরও, সামিরের মতে, “এই ব্যথা ভবিষ্যতের জন্য সহ্য করা যায়।”

“ট্যাটু করানোর সময় কাঁদিনি, কিন্তু মুছতে গিয়ে কেঁদে ফেলেছিলাম। মনে হয়েছিল আমি নিজেকে ছেড়ে দিচ্ছি। তবে এটা লজ্জা নয়। আমি নিজেকেই সম্মান করি। কিন্তু এখন আমি নতুন মানুষ হতে চাই।”

স্লিভ নামিয়ে সামির বলেন, “আজাদির ট্যাটুটা কী মানে রাখত, তা ভুলব না। কিন্তু এখন আমি এমন জীবন চাই, যেখানে পিছন ফিরে তাকাতে না হয়।”

আল জাজিরা থেকে অনূদিত






Loading...
Loading...
এই ক্যাটেগরির আরো সংবাদ  
অনুসরণ করুন
     
সম্পাদক ও প্রকাশক : মোঃ মজিবুর রহমান চৌধুরী
স্বদেশ গ্লোবাল মিডিয়া লিমিটেড -এর পক্ষে প্রকাশক কর্তৃক সিটি পাবলিশিং লি, আর কে মিশন রোড, ঢাকা-১২০৩ থেকে মুদ্রিত ও ১০, তাহের টাওয়ার, গুলশান সার্কেল-২ থেকে প্রকাশিত।
ফোন: ৯৮৫১৬২০, ৮৮৩২৬৪-৬, ফ্যাক্স: ৮৮০-২-৯৮৯৩২৯৫। ই-মেইল : [email protected], [email protected]
🔝
close
অনুসরণ করুন
     
সম্পাদক ও প্রকাশক : মোঃ মজিবুর রহমান চৌধুরী
স্বদেশ গ্লোবাল মিডিয়া লিমিটেড -এর পক্ষে প্রকাশক কর্তৃক সিটি পাবলিশিং লি, আর কে মিশন রোড, ঢাকা-১২০৩ থেকে মুদ্রিত ও ১০, তাহের টাওয়ার, গুলশান সার্কেল-২ থেকে প্রকাশিত।
ফোন: ৯৮৫১৬২০, ৮৮৩২৬৪-৬, ফ্যাক্স: ৮৮০-২-৯৮৯৩২৯৫। ই-মেইল : [email protected], [email protected]
🔝
close