
‘ঐতিহ্য যেখানে জ্ঞানচর্চার উৎস’ এই স্লোগান যেন জীবন্ত হয়ে উঠেছে টাঙ্গাইল জেলার নাগরপুর উপজেলার এক প্রাচীন জমিদার বাড়িতে। রাজকীয় শান-শওকতের এক সময়ের প্রতীক এই চৌধুরী জমিদার বাড়ি এখন আর কেবল অতীতের স্মৃতি নয়, বরং তা হয়ে উঠেছে আধুনিক শিক্ষার এক প্রাণবন্ত কেন্দ্র।
টাঙ্গাইল জেলার নাগরপুর উপজেলায় গেলেই চোখে পড়বে ‘নাগরপুর মহিলা অনার্স কলেজ’ নামের একটি স্বনামধন্য শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান। হাজারো তরুণীর ভেঙে যাওয়া স্বপ্নকে নতুন করে বাস্তবতায় রূপ দিতে উনিশ শতকে যেটি গড়ে তুলেছিলেন সাবেক প্রতিমন্ত্রী অ্যাডভোকেট নূর মোহাম্মদ খান। বর্তমানে যেখানে অধ্যয়ন করছেন প্রায় সহস্রাধিক শিক্ষার্থী।
একুশ শতকে জ্ঞানচর্চার জন্য ব্যবহৃত হলেও প্রতিষ্ঠানটির পূর্ব অবস্থা ছিল সম্পূর্ণ আলাদা। প্রকৃতপক্ষে এটি ছিল একটি জমিদার বাড়ি। যেটি চৌধুরী বংশের জমিদার বাড়ি নামে পরিচিত ছিল।
চৌধুরী বংশের এই জমিদারির সূচনা ঘটেছিল সুবিদ্ধা খাঁর বংশধর যদুনাথ চৌধুরীর হাত ধরে। যিনি প্রায় ৫৪ একর জমির ওপর এই জমিদারির ভিত্তি স্থাপন করেন। তার তিন পুত্র উপেন্দ্র মোহন, জগদীন্দ্র মোহন ও শশাঙ্ক মোহন চৌধুরী জমিদারির কার্যক্রম পরিচালনা করতেন।
উপেন্দ্র মোহনের বড় ছেলে সতীশ চন্দ্র রায় চৌধুরী সমাজসেবার জন্য ‘রায় বাহাদুর’ উপাধিতে ভূষিত হন। ছোট ছেলে সুরেশ চন্দ্র রায় চৌধুরী ছিলেন আধুনিক চিন্তাধারার ক্রীড়াবিদ ও ঐতিহাসিক ‘ ইস্ট বেঙ্গল ক্লাবের’ প্রতিষ্ঠাতা সেক্রেটারি।
জমিদার বাড়ির স্থাপত্যও যেন এক ইতিহাসের গল্প বলে। বৈঠকখানা ভবনের মোঘল ও পাশ্চাত্য স্থাপত্যশৈলীর সংমিশ্রণ মুগ্ধ করে সবাইকে। ছাদের উপর ছিল নহবতখানা যেখানে প্রতিদিন ভোরে সানাইয়ের সুরে ঘুম ভাঙত এলাকাবাসীর। পাশেই ছিল রঙ্গমহল আর পরিবারের নিজস্ব চিড়িয়াখানা যেখানে ময়ূর, কাকাতোয়া, হরিণ, ময়না এমনকি পরবর্তীতে বাঘ-সিংহও রাখা হয়েছিল সুরেশ চৌধুরীর ইচ্ছায়।
১৯৪৭ সালের দেশভাগের পর জমিদারি প্রথা বিলুপ্ত হলে সরকারের অধিগ্রহণে চলে আসে এই ঐতিহাসিক সম্পত্তি। সেই ইতিহাসেরই ধারাবাহিকতায় ১৯৮৯ সালের ২৬ আগস্ট সাবেক প্রতিমন্ত্রী অ্যাডভোকেট নূর মোহাম্মদ খানের হাতে ‘রওশন এরশাদ মহিলা বিদ্যালয়’ হিসেবে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানটির যাত্রা শুরু হয়। নব্বইয়ের দশকে এটি নতুন নাম পায় নাগরপুর মহিলা অনার্স কলেজ।
কলেজ চত্বরে প্রবেশের কেচি গেটের পাশেই এখনও দৃশ্যমান রয়েছে জমিদার আমলের চারটি পুরোনো তালা, যা নীরবে অতীতের সাক্ষ্য বহন করে।
সম্প্রতি সরকারি সহায়তায় কলেজের মূল ভবনের ব্যাপক সংস্কারকাজ সম্পন্ন হয়েছে। ভগ্নপ্রায় দেয়াল মেরামত, ছাদ ঢালাই, শ্রেণিকক্ষ উন্নয়ন, বাথরুম ও পানি সরবরাহ ব্যবস্থার আধুনিকীকরণসহ পুরো ক্যাম্পাসে সৌন্দর্যবর্ধন করা হয়েছে। ঐতিহ্য অক্ষুণ্ন রেখে করা এই উন্নয়ন কাজ শিক্ষার্থীদের জন্য যেমন সহায়ক, তেমনি আগত দর্শনার্থীদের জন্যও দৃষ্টিনন্দন।
বর্তমানে প্রতিদিন নানা স্থান থেকে মানুষ ছুটে আসছেন এই জমিদার বাড়ির ইতিহাস জানতে এবং প্রাচীন স্থাপত্যের সৌন্দর্য উপভোগ করতে। স্থানীয়দের দাবি, এই জমিদার বাড়িকে যদি সরকারিভাবে পর্যটন কেন্দ্র হিসেবে ঘোষণা করা হয় তবে এটি নাগরপুরবাসীর জন্য এক নতুন সম্ভাবনার দ্বার খুলে দেবে।
কলেজের অধ্যক্ষ মো. আনিসুর রহমান জানান, জমিদারদের ২২ একর জমির মধ্যে কলেজের নামে বরাদ্দ দেওয়া হয়েছে ৫.৮১ একর। তবে এখনো কিছু জমি বেদখলে রয়ে গেছে যা উদ্ধার করে কলেজের পরিধি ও সম্ভাবনা আরও বাড়ানো সম্ভব।
নাগরপুরের এই জমিদার বাড়ি আজ ইতিহাস, স্থাপত্য, ঐতিহ্য ও শিক্ষার এক অপূর্ব মিলনস্থল। সঠিক রক্ষণাবেক্ষণ ও ব্যবস্থাপনার মাধ্যমে এটিও হয়ে উঠতে পারে দেশের অন্যতম দর্শনীয় ও শিক্ষনীয় স্থান।
স্বদেশ প্রতিদিন/এসকে