
বর্তমান সময়ে নগরজীবনের সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জগুলোর একটি হচ্ছে বায়ুদূষণ। শহরজুড়ে দিন দিন বাড়ছে গাড়ির সংখ্যা, গড়ে উঠছে নতুন নতুন শিল্পকারখানা। ফলে বাতাসে মিশছে হাজারো ক্ষতিকর উপাদান।
ঢাকার মতো ব্যস্ত শহরগুলোতে এই দূষণের প্রভাব এতটাই প্রকট যে অনেক সময় বাতাসে শ্বাস নেওয়া অযোগ্য হয়ে পড়ে। এ পরিস্থিতি থেকে পরিত্রাণ পেতে হলে চাই ব্যক্তি পর্যায়ে সচেতনতা এবং বৈজ্ঞানিক উপায়ে প্রতিরোধমূলক ব্যবস্থা গ্রহণ প্রয়োজন। দূষিত বাতাস আমাদের শরীরের উপর নানা রকম ক্ষতিকর প্রভাব ফেলতে পারে। যা তাৎক্ষণিক ও দীর্ঘমেয়াদে উভয়ভাবেই দেখা দিতে পারে।
দূষিত বাতাসের কারণে যা যা হতে পারে-
শ্বাসতন্ত্রের সমস্যাঃ ১. হাঁপানি (Asthma) বেড়ে যাওয়া
২. ক্রনিক ব্রঙ্কাইটিস
৩. শ্বাসকষ্ট হওয়া
৪. কাশি ও গলা চুলকানো
৫. ফুসফুসের কার্যক্ষমতা হ্রাস পাওয়া
৬. চোখের সমস্যা:
৭. চোখে জ্বালাপোড়া
৮. চোখ লাল হওয়া
চর্মরোগঃ
১. অ্যালার্জির প্রকোপ বাড়া
হৃদরোগঃ
১. উচ্চ রক্তচাপ
২. হৃদস্পন্দনের অসামঞ্জস্যতা
৩. হৃদরোগের ঝুঁকি বৃদ্ধি
স্নায়ুতন্ত্রের ক্ষতিঃ১. দীর্ঘমেয়াদে স্মৃতিভ্রংশ বা নিউরোলোজিক্যাল সমস্যার আশঙ্কা
২. শিশুদের মস্তিষ্কের বিকাশে বাধা
ক্যানসারের ঝুঁকিঃ১. দীর্ঘদিন দূষিত বাতাসে বসবাস করলে ফুসফুস ক্যানসারের ঝুঁকি বাড়ে
২. কার্সিনোজেনিক (ক্যানসার সৃষ্টিকারী) পদার্থ বাতাসে মিশে যেতে পারে
অন্তঃসত্ত্বা নারীদের জন্য ঝুঁকিঃ১. গর্ভপাতের ঝুঁকি বাড়ানো
২. নবজাতকের ওজন কম হওয়া
৩. শিশুর শারীরিক ও মানসিক বিকাশে সমস্যা
মানসিক স্বাস্থ্যে প্রভাবঃ১. বিষণ্ণতা ও উদ্বেগ বাড়তে পারে
২. ঘুমের সমস্যা হতে পারে
বিশেষজ্ঞদের মতে, কিছু সহজ কিন্তু কার্যকর অভ্যাস গড়ে তুললেই নিজের ও পরিবারের স্বাস্থ্যের উপর বায়ুদূষণের প্রভাব অনেকটাই কমানো সম্ভব।
গুণগত মানসম্পন্ন মাস্ক ব্যবহার করুনঃ
বাইরের দূষিত বাতাস থেকে সুরক্ষার জন্য শুধুমাত্র কাপড়ের মাস্ক যথেষ্ট নয়। তাই N95 বা N99 ধরনের মাস্ক ব্যবহার করাই অধিক নিরাপদ, কারণ এগুলো বাতাসে থাকা সূক্ষ্ম কণাগুলোকেও আটকে দিতে পারে।
বাতাস বিশুদ্ধ রাখার প্রযুক্তি ব্যবহার করুনঃঘরের ভেতরে বিশুদ্ধ বাতাস নিশ্চিত করতে HEPA ফিল্টারযুক্ত এয়ার পিউরিফায়ার ব্যবহার করা যেতে পারে। বিশেষত যেসব ঘরে শিশু, বয়স্ক বা শ্বাসকষ্টের রোগী রয়েছে, তাদের জন্য এটি খুবই কার্যকর।
ধূমপান পুরোপুরি বন্ধ করুনঃঘরের পরিবেশ দূষণমুক্ত রাখতে হলে ধূমপান পরিহার করা অত্যন্ত জরুরি। ধূমপানের ফলে নিঃসৃত বিষাক্ত গ্যাস শিশুসহ অন্য সদস্যদের জন্য স্বাস্থ্যঝুঁকি তৈরি করে।
দূষণ উৎপন্ন করে এমন জিনিসের ব্যবহার কমানঃমশার কয়েল, সুগন্ধি মোমবাতি ও কেমিকেলযুক্ত এয়ার ফ্রেশনার থেকেও ক্ষতিকর কণা বাতাসে ছড়িয়ে পড়ে। এসব পণ্য ব্যবহারে যতটা সম্ভব সতর্কতা অবলম্বন করতে হবে।
সবুজ গাছ লাগিয়ে প্রাকৃতিকভাবে বায়ু বিশুদ্ধ করুনঃ
ঘরের কোণায় মানিপ্লান্ট, অ্যালোভেরা বা স্নেক প্ল্যান্টের মতো গাছ রাখলে তা বাতাস থেকে দূষণ শোষণ করতে পারে এবং পরিবেশে অক্সিজেন সরবরাহ বাড়ায়।
দেহের রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা বাড়াতে হবেঃ
পর্যাপ্ত বিশ্রাম, পুষ্টিকর খাবার এবং পরিমিত পানি পান শরীরকে দূষণের প্রভাব মোকাবিলায় সহায়তা করে।
প্রতিদিনের বায়ুর মান পর্যবেক্ষণ করুনঃ Air Quality Index (AQI) অ্যাপ বা ওয়েবসাইট ব্যবহার করে প্রতিদিনের বায়ুমানের খবর রাখুন। বায়ুদূষণের মাত্রা বেশি থাকলে ঘরের বাইরে যাওয়া থেকে বিরত থাকাই ভালো।
শারীরিক অস্বস্তি দেখা দিলে দ্রুত ব্যবস্থা নিনঃ
দূষণের প্রভাবে চোখে জ্বালাপোড়া, মাথাব্যথা, ক্লান্তি, শ্বাসকষ্ট কিংবা হাঁপানির উপসর্গ বাড়লে অবিলম্বে চিকিৎসকের শরণাপন্ন হতে হবে।
বাতাসকে এক দিনে বিশুদ্ধ করা সম্ভব নয়, তবে নিজেকে রক্ষা করার উপায় এখন আমাদের হাতের মুঠোয়। প্রযুক্তি, সচেতনতা এবং সামান্য জীবনধারার পরিবর্তনের মাধ্যমেই আমরা গড়ে তুলতে পারি নিরাপদ ও স্বাস্থ্যসম্মত পরিবেশ।
স্বদেশ প্রতিদিন/আইজেপি