
সংগৃহীত ছবি
রাজবাড়ীর মাঠে মাঠে এখন পুরোদমে শুরু হয়েছে আগাম জাতের ‘মুড়িকাটা’ পেঁয়াজ রোপণের ব্যস্ততা। স্বল্প সময়ে ফসল ঘরে তোলার আশা নিয়ে জমি প্রস্তুত ও পেঁয়াজ রোপণে ব্যস্ত সময় পার করছেন চাষিরা। তবে উৎপাদন খরচ বৃদ্ধি, কৃত্রিম সার সংকট এবং ন্যায্যমূল্য পাওয়া নিয়ে তীব্র দুশ্চিন্তায় রয়েছেন তারা। অন্যদিকে, কৃষি বিভাগ জানিয়েছে—আবহাওয়া অনুকূলে থাকলে উৎপাদন লক্ষ্যমাত্রা অর্জিত হবে এবং বাজারে এর ইতিবাচক প্রভাব পড়বে।
অক্টোবরের প্রথম সপ্তাহ থেকে শুরু হওয়া মুড়িকাটা পেঁয়াজের রোপণ কাজ শেষে আগামী ডিসেম্বরেই ফসল ঘরে তোলার আশা করছেন কৃষকরা। কম সময়ে উৎপাদন সম্ভব হওয়ায় এ পেঁয়াজ চাষে কৃষকদের আগ্রহ সবসময়ই বেশি থাকে। তবে বিগত বছরগুলোর অভিজ্ঞতার আলোকে অনেকে খরচের তুলনায় ন্যায্যমূল্য না পাওয়ার আশঙ্কা প্রকাশ করছেন।
সরেজমিনে রাজবাড়ীর বিভিন্ন মাঠ ঘুরে দেখা গেছে, কৃষকদের কেউ জমি প্রস্তুত করছেন, আবার কেউ সারি সারি করে রোপণ করছেন পেঁয়াজ। পরিবারের সদস্যদের পাশাপাশি অতিরিক্ত শ্রমিক নিয়েও চলছে এই কর্মযজ্ঞ।
জেলা কৃষি বিভাগ সূত্রে জানা যায়, দেশের মোট পেঁয়াজ উৎপাদনের প্রায় ১৪ শতাংশই হয় রাজবাড়ী জেলায়। এখানে মূলত হালি ও মুড়িকাটা—এই দুই ধরনের পেঁয়াজের আবাদ হয়ে থাকে। চলতি মৌসুমে জেলায় মোট ৬ হাজার ১৩ হেক্টর জমিতে মুড়িকাটা পেঁয়াজ আবাদের লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়েছে।
খরচের হিসেব ও কৃষকদের আক্ষেপ: কালুখালী উপজেলার হরিনবাড়িয়া চরের কৃষক সমসের হোসেন পেঁয়াজ চাষের খরচের হিসাব দিয়ে বলেন, “এক বিঘা জমিতে পেঁয়াজ চাষ করতে প্রায় ৫২ হাজার টাকা খরচ হয়। এর মধ্যে জমি চাষে ৩ হাজার, সারে ১০ হাজার, ১০ মণ বীজে ২২ হাজার, রোপণের শ্রমিক খরচ ৬ হাজার , সেচে ৩ হাজার, কীটনাশকে ৫ হাজার এবং নিড়ানিতে ৩ হাজার টাকা ব্যয় হয়। যাঁদের নিজস্ব জমি আছে, তাঁদের এই খরচ হলেও যাঁদের জমি লিজ নিতে হয়, তাঁদের আরও অতিরিক্ত ২৫ থেকে ৩০ হাজার টাকা যোগ করতে হয়।”
পাশেই পেঁয়াজ রোপণরত খলিল মন্ডল আক্ষেপ করে বলেন, “অনেক খরচ করে পেঁয়াজ লাগাই, কিন্তু সঠিক দাম পাই না। প্রতি বছরই লোকসান গুনতে হয়। বিঘাপ্রতি ফলন ভালো হলে ৭০ থেকে ৮০ মণ পেঁয়াজ পাওয়া সম্ভব। তবে শেষ পর্যন্ত বাজারে কী দাম পাব, তার ওপরই লাভ-লোকসানের হিসাব নির্ভর করে।”
সার সংকট নিয়ে ক্ষোভ: হরিনবাড়িয়া চারের কৃষক আবেদ মোল্লা জানান, গত বছর মুড়িকাটা পেঁয়াজ প্রতি মণ ১ হাজার থেকে ১ হাজার ২০০ টাকায় বিক্রি হয়েছিল। অথচ প্রতি মণ উৎপাদনে খরচই পড়েছিল ১ হাজার টাকার বেশি। সেবার কোনো রকমে খরচ উঠে এলেও লাভ হয়নি। এবার সার, বীজ ও শ্রমিকের দাম বেড়ে যাওয়ায় উৎপাদন খরচ আরও অনেক বাড়বে। ফলে দাম ১ হাজার টাকা হলে কৃষকদের বড় লোকসানে পড়তে হবে।
কাসেম মন্ডল, হাসেম আলী মোল্লার মতো একাধিক কৃষকের অভিযোগ, বাজারে গেলে প্রয়োজনের সময় সার পাওয়া যাচ্ছে না। ডিলাররা কৃত্রিম সংকট তৈরি করে বেশি দামে সার বিক্রি করছেন। কৃষি অফিসে অভিযোগ করেও এর প্রতিকার মিলছে না বলে দাবি করেন তারা। বাজারে যেন সহজে ও সরকার নির্ধারিত মূল্যে সার পাওয়া যায়, সে জন্য সরকারের জরুরি হস্তক্ষেপ কামনা করেছেন তারা।
কৃষি বিভাগের বক্তব্য: সার সংকটের অভিযোগ পুরোপুরি অস্বীকার করে রাজবাড়ী জেলা কৃষি অফিসের প্রশিক্ষণ অফিসার গোলাম রাসূল বলেন, “কৃষকেরা যেন সময়মতো সার পান, সে জন্য নিয়মিত সার সরবরাহ করা হচ্ছে। বর্তমানে জেলায় সারের কোনো সংকট নেই। এ ছাড়া কৃষি বিভাগ সবসময় কৃষকদের খোঁজখবর রাখছে এবং নিয়মিত কৃষিপরামর্শ দিয়ে যাচ্ছে।”
তিনি আরও বলেন, আবহাওয়া অনুকূলে থাকলে চলতি মৌসুমে মুড়িকাটা পেঁয়াজের নির্ধারিত উৎপাদন লক্ষ্যমাত্রা সফলভাবে অর্জিত হবে এবং কৃষকরা লাভবান হবেন বলে আশা করা যাচ্ছে।