
জামালপুরের মেলান্দহে একটি সেতুর অভাবে দুর্ভোগ পোহাচ্ছেন ১৫ গ্রামের প্রায় ৩০ থেকে ৩৫ হাজার মানুষ। ছয় বছর ধরে ভাঙা অবস্থায় পড়ে আছে আলাইনদীর ওপর নির্মিত খালেক মেম্বারের সেতুটি। সংস্কার বা পুনর্নির্মাণ না হওয়ায় জীবনের ঝুঁকি নিয়ে তিনটি গাছের ওপর দিয়ে নদী পারাপার হতে হচ্ছে স্থানীয়দের।
প্রতিদিন এই বিপজ্জনক পথ পাড়ি দিচ্ছেন শিক্ষার্থী, কৃষক, শ্রমজীবী মানুষসহ নানা শ্রেণি-পেশার মানুষ। সবচেয়ে বেশি বিপাকে পড়ছেন অসুস্থ রোগী ও প্রসূতি নারীরা। স্থানীয়দের উদ্যোগে কয়েক দফা মেরামতের চেষ্টা করা হলেও স্থায়ী সমাধান মেলেনি। ফলে দীর্ঘদিনের এই দুর্ভোগ থেকে মুক্তি পেতে দ্রুত সেতুটি পুনর্নির্মাণের দাবি জানিয়েছেন ভুক্তভোগীরা।
মেলান্দহ উপজেলার কুলিয়া ইউনিয়নের বারেকের মোড় থেকে পুগলী পাড় গ্রামে যাওয়ার পথে আলাইনদীর ওপর সেতুটির অবস্থান। ১৯৯৮ সালে নির্মিত সেতুটি একসময় ছিল আশপাশের গ্রামের মানুষের যাতায়াতের অন্যতম ভরসা। কিন্তু প্রায় ছয় বছর আগে সেতুটি ভেঙে যাওয়ার পর থেকেই বদলে গেছে এলাকার যোগাযোগব্যবস্থা। সময়ের সঙ্গে ভোগান্তি কমার পরিবর্তে বেড়েছে মানুষের দুর্ভোগ আর দুর্ঘটনার আশঙ্কা।
পঁচাবলা, সাদিপাটি, পুগলী, তেঘরিয়া, সিঁড়িঘাটসহ অন্তত ১৫টি গ্রামের মানুষের যাতায়াতের গুরুত্বপূর্ণ পথ এটি। সেতুটি অকেজো হয়ে পড়ায় স্বাভাবিক চলাচল ব্যাহত হচ্ছে। একসময় যে পথে সহজেই নদী পার হওয়া যেত, এখন সেখানে প্রতিটি পদক্ষেপে নিতে হচ্ছে দুর্ঘটনার ঝুঁকি।
সেতুর বিভিন্ন অংশ ধসে গেছে। কোথাও তৈরি হয়েছে বিপজ্জনক ফাঁক, আবার কোথাও দেবে গেছে সেতুর অংশবিশেষ। নিরাপদে চলাচলের কোনো ব্যবস্থা না থাকায় স্থানীয়রা নিজেদের উদ্যোগে সেতুর ওপর তিনটি গাছ ফেলে তৈরি করেছেন অস্থায়ী পারাপারের পথ। সেই গাছের ওপর দিয়েই কোনোমতে নদী পার হচ্ছেন মানুষ।
কিন্তু গাছের ওপর দিয়ে নদী পারাপার কতটা বিপজ্জনক, তা বলার অপেক্ষা রাখে না। সামান্য অসতর্কতা কিংবা পা পিছলে গেলেই ঘটে যেতে পারে বড় ধরনের দুর্ঘটনা। বিশেষ করে শিশু, বয়স্ক ও শারীরিকভাবে অসুস্থ মানুষের জন্য এই পথ পাড়ি দেওয়া অত্যন্ত ঝুঁকিপূর্ণ।
স্থানীয়রা জানান, সেতুটি ভেঙে যাওয়ার পর একাধিকবার নিজেদের উদ্যোগে চাঁদা তুলে মেরামতের চেষ্টা করেছেন তাঁরা। কিন্তু স্থায়ী সংস্কারের ব্যবস্থা না থাকায় অল্প সময়ের মধ্যেই আবার নষ্ট হয়ে যায় মেরামতের অংশ। বারবার ব্যক্তিগত উদ্যোগে সমস্যার সমাধান করতে গিয়ে একদিকে যেমন অর্থ ব্যয় হচ্ছে, অন্যদিকে স্থায়ী সমাধান না পাওয়ায় হতাশা বাড়ছে এলাকাবাসীর।
ভাঙা সেতুর কারণে সবচেয়ে বেশি দুর্ভোগের শিকার হচ্ছেন শিক্ষার্থীরা। প্রতিদিন স্কুল-কলেজে যাতায়াত করতে গিয়ে তাদের পাড়ি দিতে হচ্ছে বিপজ্জনক এই পথ। গাছের ওপর ভারসাম্য রেখে নদী পার হওয়ার সময় যেকোনো মুহূর্তে দুর্ঘটনার আশঙ্কা থাকে। ফলে সন্তানদের নিরাপদে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে পৌঁছানো নিয়ে উদ্বিগ্ন থাকেন অভিভাবকেরা।
স্থানীয়দের অভিযোগ, সেতুটি ভেঙে যাওয়ায় শুধু যাতায়াতই ব্যাহত হচ্ছে না, সামাজিক জীবনেও এর নেতিবাচক প্রভাব পড়ছে। আত্মীয়স্বজনের বাড়িতে যাওয়া, পারিবারিক অনুষ্ঠান কিংবা বিয়ে-শাদির মতো সামাজিক আয়োজনেও নানা সমস্যার মুখে পড়তে হচ্ছে তাঁদের। যোগাযোগব্যবস্থার এই সংকট যেন বিচ্ছিন্ন করে রেখেছে আশপাশের গ্রামগুলোকেও।
রোগী ও প্রসূতি নারীদের নিয়ে বাড়ছে উদ্বেগ
যোগাযোগব্যবস্থার এই দুরবস্থা সবচেয়ে ভয়াবহ হয়ে ওঠে জরুরি চিকিৎসার প্রয়োজন হলে। অসুস্থ রোগীকে চিকিৎসাকেন্দ্রে নেওয়া কিংবা অন্তঃসত্ত্বা নারীকে দ্রুত হাসপাতালে পৌঁছানো পরিবারের জন্য বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়ায়। স্বাভাবিক চলাচলের পথ না থাকায় জরুরি মুহূর্তে সময়মতো গন্তব্যে পৌঁছানো নিয়েও তৈরি হয় অনিশ্চয়তা।
পঁচাবহলা কমিউনিটি ক্লিনিকের সিএইচসিপি মো. মাহবুব আলম বলেন, মানুষের মৌলিক প্রয়োজনের সঙ্গে সরাসরি জড়িত এমন একটি সেতু দীর্ঘদিন অচল পড়ে থাকা দুঃখজনক। এই এলাকার বিশেষ করে প্রসূতি রোগীদের সেবা নিয়ে চরম বিপাকে পড়তে হচ্ছে। সেতুর অভাবে চিকিৎসা নিতে পারছে না এই এলাকার রোগীরা।
স্থানীয়দের অভিযোগ, গুরুত্বপূর্ণ এই সেতুটি দীর্ঘদিন ধরে ভাঙা অবস্থায় পড়ে থাকলেও এখন পর্যন্ত স্থায়ী সমাধান হয়নি। অথচ সেতুটি সচল থাকলে অন্তত ১৫ গ্রামের মানুষের যাতায়াত সহজ হতো। শিক্ষার্থী, রোগী, কৃষক ও সাধারণ মানুষের দৈনন্দিন চলাচলে ফিরত স্বস্তি।
সমাজসেবক মো. তৌহিদুল ইসলাম রঞ্জুসহ এলাকাবাসীর প্রত্যাশা, সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ দ্রুত সেতুটি পুনর্নির্মাণে উদ্যোগ নেবে। তাঁদের দাবি, সাময়িক মেরামত নয়, প্রয়োজন টেকসই সমাধান, যাতে ভবিষ্যতে আর এমন দুর্ভোগে পড়তে না হয় এই অঞ্চলের মানুষকে।
এ বিষয়ে মেলান্দহ উপজেলা স্থানীয় সরকার প্রকৌশল অধিদপ্তরের প্রকৌশলী মশিউর রহমান জানিয়েছেন, গণমাধ্যমের মাধ্যমে তিনি সেতুটির বিষয়ে জানতে পেরেছেন। দ্রুত সময়ের মধ্যে সেতুটি নিয়ে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে বলে আশ্বাস দিয়েছেন তিনি।
এলাকাবাসীর প্রত্যাশা, সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের আশ্বাস যেন কেবল কথার মধ্যে সীমাবদ্ধ না থাকে। দ্রুত সেতুটি পুনর্নির্মাণের উদ্যোগ নেওয়া হলে দীর্ঘদিনের দুর্ভোগ থেকে মুক্তি পাবেন ১৫ গ্রামের হাজারো মানুষ। নিরাপদ যোগাযোগব্যবস্থা ফিরে পাবে একটি জনপদ, আর গাছের ওপর দিয়ে মরণঝুঁকি নিয়ে নদী পারাপারের এই দৃশ্যেরও অবসান ঘটবে।
স্বদেশ প্রতিদিন/এফএইচ