
বাবা-মায়ের জমিতে বাড়ি নির্মাণ করে ছেলের সচ্ছল জীবনযাপন। অন্যদিকে, স্বামীর মৃত্যুর পর মেয়ের বাড়িতে আশ্রিত হয়ে জরাজীর্ণ ঘরে মানবেতর জীবন কাটাচ্ছেন ৮০ বছর বয়সী বৃদ্ধা মা মমেনা বেগম। জমি লিখে না দেওয়াকে কেন্দ্র করে প্রায় ১৪ বছর আগে তাঁকে ও তাঁর স্বামীকে বাড়ি থেকে বের করে দেওয়ার অভিযোগ উঠেছে ছেলে মোখলেছুর রহমানের বিরুদ্ধে। তিনি কুড়িগ্রামের রাজারহাট উপজেলার রাজমাল্লীরহাট সিদ্দিকীয়া ফাজিল মাদ্রাসার ভারপ্রাপ্ত অধ্যক্ষ।
মমেনা বেগমের অভিযোগ, বাবা-মায়ের কাছ থেকে পাওয়া জমিতে বাড়ি নির্মাণ করেও আরও জমি লিখে দেওয়ার দাবি করেন তাঁর ছেলে। সেই দাবি পূরণ না হওয়ায় তাঁকে ও তাঁর স্বামী আব্দুস সাত্তারকে বাড়ি থেকে বের করে দেওয়া হয়। এরপর থেকে তাঁরা মেয়ে খাদিজা বেগমের বাড়িতে আশ্রয় নেন। একই উপজেলার রাজমাল্লীরহাট মিস্ত্রীপাড়া গ্রামে মেয়ের বাড়িতেই চার বছর আগে মারা যান আব্দুস সাত্তার।
মমেনার অভিযোগ, বাবার মৃত্যুর খবর পেয়েও ছেলে জানাজা ও দাফনে অংশ নেননি। এমনকি স্বামীর মরদেহ নিজেদের বসতভিটায় দাফন করার ইচ্ছাও পূরণ হয়নি তাঁর।
বর্তমানে মেয়ের সঙ্গে কাঁথা সেলাই করে কোনোমতে দিন কাটছে মমেনা বেগমের। যে ঘরে তিনি থাকেন, তার চাল ও বেড়ার বিভিন্ন স্থানে অসংখ্য ফুটো। দিনের আলোয় ঘরে সূর্যের আলো ঢোকে, রাতে দেখা যায় চাঁদের আলো। বৃষ্টি হলে ভিজে যায় বিছানা-বালিশ। জীবনের শেষ সময়ে এসে এমন দুরবস্থায় দিন কাটাতে হচ্ছে তাঁকে।
অন্যদিকে, স্থানীয়দের অভিযোগ, বাবা-মায়ের রেখে যাওয়া জমিতে নির্মিত বাড়িতে সচ্ছল জীবনযাপন করছেন মোখলেছুর রহমান। বৃদ্ধা মায়ের ভরণপোষণ ও খোঁজখবর নেওয়ার ক্ষেত্রেও তাঁর উদাসীনতার অভিযোগ রয়েছে। এ ঘটনায় স্থানীয়দের মধ্যে ক্ষোভ ও সমালোচনা দেখা দিয়েছে।
স্থানীয় বাসিন্দা ফারুক মিয়া বলেন, মোখলেছুর রহমানের বাবা মেয়ের বাড়িতে মারা গেলেও তিনি জানাজা ও দাফনে অংশ নেননি বলে স্থানীয়রা জানিয়েছেন। তাঁর অভিযোগ, বৃদ্ধা মাও এখন মেয়ের বাড়িতে কষ্টে দিন কাটাচ্ছেন। ছেলে তাঁর খোঁজখবর নেন না কিংবা আর্থিক সহায়তা করেন না। বরং বাবার রেখে যাওয়া জমিজমা একাই ভোগদখল করছেন।
স্থানীয় বাসিন্দা সৈয়দ আলী বলেন, বাবার মৃত্যুর খবর পেয়েও মোখলেছুর রহমান দাফনে যাননি বলে তিনি শুনেছেন। তিনি বলেন, “শিক্ষিত হলেই মানুষ হওয়া যায় না। মায়ের প্রতি এমন আচরণ অত্যন্ত অমানবিক।”
আরেক স্থানীয় বাসিন্দা আব্দুর রশিদ বলেন, মোখলেছুর রহমানের মা-বাবা দীর্ঘদিন মেয়ের বাড়িতে আশ্রিত ছিলেন। সেখানেই তাঁর বাবা মারা যান। বর্তমানে বৃদ্ধা মা একই বাড়িতে কষ্টে দিন কাটাচ্ছেন। তাঁর অভিযোগ, মাকে বাড়ি থেকে বের করে দেওয়ার পর আর তাঁর খোঁজখবর রাখেননি ছেলে।
অভিযোগের বিষয়ে বক্তব্য জানতে রাজমাল্লীরহাট সিদ্দিকীয়া ফাজিল মাদ্রাসা ও মোখলেছুর রহমানের বাড়িতে গিয়ে তাঁকে পাওয়া যায়নি। পরে মুঠোফোনে যোগাযোগ করা হলে তিনি সাংবাদিকের সঙ্গে উত্তেজিত হয়ে কথা বলেন বলে অভিযোগ রয়েছে। পরবর্তী সময়ে বক্তব্য দেবেন বলে জানালেও একাধিকবার ফোন করা সত্ত্বেও তিনি সাড়া দেননি। ফলে এ বিষয়ে তাঁর বক্তব্য জানা সম্ভব হয়নি।
উমর মজিদ ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান আহসানুল কবির আদিল বলেন, বাবা-মায়ের সেবা করা প্রতিটি সন্তানের দায়িত্ব ও কর্তব্য। একজন শিক্ষক যদি ১৪ বছর আগে নিজের বাবা-মাকে বাড়ি থেকে বের করে দিয়ে থাকেন, তাহলে বিষয়টি অত্যন্ত দুঃখজনক। এ বিষয়ে তাঁর কাছে অভিযোগ এলে তিনি তা মীমাংসার উদ্যোগ নিতেন বলে জানান।
কুড়িগ্রামের আইনজীবী অ্যাডভোকেট আহসান হাবিব নিলু বলেন, সমাজে পারিবারিক বন্ধন ও বৃদ্ধ বাবা-মায়ের প্রতি সন্তানের দায়িত্ব পালনের ক্ষেত্রে অবক্ষয় দেখা যাচ্ছে। বাবা-মায়ের ভরণপোষণ নিশ্চিত করতে সরকার ২০১৩ সালে পিতা-মাতার ভরণ-পোষণ আইন প্রণয়ন করেছে। এ আইনে নির্ধারিত শর্তে দায়িত্ব পালনে ব্যর্থতার জন্য শাস্তির বিধান রয়েছে।
বৃদ্ধ বয়সে সন্তানদের স্নেহ, আশ্রয় ও যত্ন পাওয়ার কথা বাবা-মায়ের। অথচ মমেনা বেগমের জীবনের শেষ সময়ে এমন দুরবস্থার অভিযোগ স্থানীয়দের মধ্যে মানবিক দায়িত্ববোধ ও পারিবারিক মূল্যবোধ নিয়ে নতুন করে প্রশ্ন তুলেছে।
স্বদেশ প্রতিদিন/এফএইচ