
সৌদি-হুতি সংঘাত: বাড়ছে আঞ্চলিক যুদ্ধের শঙ্কা
সৌদি আরব ও ইয়েমেনের ইরান-সমর্থিত হুতি বিদ্রোহীদের মধ্যে চলমান সংঘাত ক্রমেই তীব্র হচ্ছে। সাম্প্রতিক সময়ে সৌদি আরবের বিমানবন্দর ও গুরুত্বপূর্ণ জ্বালানি স্থাপনায় একের পর এক হামলার ঘটনায় বেসামরিক নাগরিকদের প্রাণহানি ঘটেছে। নিরাপত্তাঝুঁকির কারণে বিশ্বখ্যাত তেল কোম্পানি সৌদি আরামকোর প্রধান কার্যালয় থেকে কর্মীদের সরিয়ে নেওয়ার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। একই সঙ্গে সৌদি আরবে অবস্থানরত অপ্রয়োজনীয় মার্কিন কূটনৈতিক কর্মীদের দেশটি ছাড়ার নির্দেশ দিয়েছে যুক্তরাষ্ট্র। অন্যদিকে, মধ্যপ্রাচ্যের বিভিন্ন দেশের সামরিক সহায়তা বৃদ্ধি পাওয়ায় সংঘাতটি আঞ্চলিক যুদ্ধে রূপ নেওয়ার আশঙ্কা বাড়ছে।
সৌদি আরবের ধাহরানে অবস্থিত সৌদি আরামকোর প্রধান কার্যালয়ে কর্মরত অবশিষ্ট কর্মীদের পরবর্তী নির্দেশ না দেওয়া পর্যন্ত সেখান থেকে সরে গিয়ে দূর থেকে কাজ করার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। গত সপ্তাহে আরামকোর বিশাল কমপ্লেক্সে হুতি বিদ্রোহীদের হামলার পর থেকেই অনেক অপ্রয়োজনীয় কর্মী বাসা থেকে কাজ করছিলেন। সর্বশেষ এই সিদ্ধান্তে কমপ্লেক্সটির নিরাপত্তা পরিস্থিতি নিয়ে উদ্বেগ আরও বেড়েছে।
সৌদি কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে, আরামকোর অপারেশনস সেন্টারের পাশে অবস্থিত একটি ভবনে সরাসরি হামলা হয়েছে। এতে ভবনটির ব্যাপক ক্ষয়ক্ষতি হয়েছে বলে জানিয়েছেন প্রত্যক্ষদর্শী কর্মীরা। তবে কর্মীদের সরিয়ে নেওয়ার কার্যক্রমের আওতায় ধাহরানের ওই কমপ্লেক্সের আবাসিক এলাকা অন্তর্ভুক্ত ছিল না। কতজন কর্মী এই সিদ্ধান্তের ফলে প্রভাবিত হয়েছেন, তা এখনো প্রকাশ করা হয়নি।
এদিকে, দাম্মাম বিমানবন্দর ও শায়বাহ তেলক্ষেত্রেও হামলার ঘটনা ঘটেছে। বুধবার রাতে দাম্মামের কিং ফাহাদ আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে হুতি হামলায় দুজন নিহত হয়েছেন। তাঁদের মধ্যে একজন ভারতীয় নাগরিক এবং অন্যজন সৌদি আরবের বাসিন্দা। এ ঘটনায় আটজন গুরুতর আহত হন। আহতদের মধ্যে দুজন ভারতীয়, দুজন ইয়েমেনি, দুজন বাংলাদেশি, একজন নেপালি ও একজন সৌদি নাগরিক রয়েছেন।
ঘটনার পর সৌদি আরবের বেসামরিক বিমান চলাচল কর্তৃপক্ষ দ্রুত পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনে এবং বিমানবন্দরে বিমান চলাচল স্বাভাবিক করে। এ মাসে সৌদি আরবের বিভিন্ন বিমানবন্দরে হামলায় মোট প্রাণহানির সংখ্যা ২২ জনে পৌঁছেছে বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে। এর আগে ধারাবাহিক হামলার কারণে রাজধানী রিয়াদের আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরও কয়েক দিনের জন্য বন্ধ রাখতে হয়েছিল।
সৌদি আরামকোর শায়বাহ তেলক্ষেত্র লক্ষ্য করে ধেয়ে আসা একটি হুতি ড্রোন বিমান প্রতিরক্ষা ব্যবস্থার মাধ্যমে ধ্বংস করা হয়। তবে ড্রোনটির ধ্বংসাবশেষ নিচে পড়ে দুজনের মৃত্যু হয়। নিহত ব্যক্তিদের একজন ফিলিপিনো এবং অন্যজন নেপালি নাগরিক। এ ঘটনায় একজন ভারতীয় ও একজন পাকিস্তানি নাগরিক আহত হন।
সৌদি কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে, আকাশে ড্রোনটি ধ্বংস করা হলেও এর ধ্বংসাবশেষ তেলক্ষেত্রের বাইরে অবস্থানরত একটি ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানের গাড়িতে পড়ে। এতে মূল তেলক্ষেত্রের কার্যক্রমে কোনো প্রভাব পড়েনি। তবে ঘটনাটি গুরুত্বপূর্ণ জ্বালানি স্থাপনার আশপাশে কর্মরত সাধারণ মানুষের নিরাপত্তা নিয়ে নতুন করে উদ্বেগ তৈরি করেছে।
সৌদি আরবের ঘনবসতিপূর্ণ এলাকাগুলোতেও হুতি হামলার আশঙ্কা বাড়ছে। রিয়াদ ও মদিনা অঞ্চলের আকাশে ড্রোন হামলার খবর পাওয়া গেছে। একই সঙ্গে পূর্বাঞ্চলীয় প্রদেশে একাধিক সামরিক অনুপ্রবেশের চেষ্টা প্রতিহত করার কথা জানিয়েছে সৌদি নেতৃত্বাধীন যৌথ সামরিক জোট।
মদিনায় সম্ভাব্য হামলার চেষ্টা নিয়ে খবর প্রকাশিত হলেও শহরটির পবিত্র স্থানগুলোতে কোনো হামলার ঘটনা ঘটেনি। অন্যদিকে, মদিনামুখী ড্রোন পাঠানোর অভিযোগ অস্বীকার করেছে ইয়েমেনের হুতি বিদ্রোহীরা। সৌদি আরবের বিভিন্ন অঞ্চলে হামলার আশঙ্কা বাড়তে থাকায় শহর, বিমানবন্দর, বিদ্যুৎকেন্দ্র ও জ্বালানি অবকাঠামোর নিরাপত্তা নিশ্চিত করা দেশটির প্রতিরক্ষা বাহিনীর জন্য বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে উঠেছে।
নিরাপত্তা পরিস্থিতির অবনতির প্রভাব পড়েছে আন্তর্জাতিক কূটনৈতিক সম্পর্কেও। সৌদি আরবে নিযুক্ত মার্কিন দূতাবাসের অপ্রয়োজনীয় সরকারি কর্মী ও তাঁদের পরিবারের সদস্যদের দেশটি ছেড়ে যাওয়ার নির্দেশ দিয়েছে ওয়াশিংটন।
মার্কিন পররাষ্ট্র দপ্তর জানিয়েছে, বেসামরিক বিমানবন্দর ও গুরুত্বপূর্ণ রাষ্ট্রীয় অবকাঠামোতে ধারাবাহিক হুতি হামলার কারণে ভ্রমণব্যবস্থা বিঘ্নিত হচ্ছে এবং বেসামরিক নাগরিকদের প্রাণহানি ঘটছে। এ পরিস্থিতি বিবেচনায় নিয়ে কর্মীদের সরিয়ে নেওয়ার সিদ্ধান্ত হয়েছে।
রয়টার্সের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, পরিস্থিতির অবনতি হলে মধ্যপ্রাচ্যের অন্যান্য উপসাগরীয় দেশে অবস্থিত মার্কিন কূটনৈতিক মিশনগুলোর কর্মীদের পরিবারের সদস্যদেরও সরিয়ে নেওয়ার বিষয়টি বিবেচনা করা হতে পারে। তবে যুক্তরাষ্ট্রের পররাষ্ট্র দপ্তর জানিয়েছে, আপাতত সৌদি আরবে কর্মরত কর্মকর্তাদের জন্যই বাধ্যতামূলকভাবে দেশত্যাগের নির্দেশ জারি করা হয়েছে।
এদিকে, সৌদি আরবকে সামরিক সহায়তা বাড়িয়েছে যুক্তরাজ্য। সৌদি আকাশসীমায় নজরদারি এবং ড্রোন ও ক্ষেপণাস্ত্র প্রতিহত করার কাজে সহায়তার জন্য রয়্যাল এয়ার ফোর্সের টাইফুন যুদ্ধবিমান দিয়ে টহলের ব্যবস্থা করা হয়েছে। একইভাবে সৌদি আরবের আঞ্চলিক নিরাপত্তা রক্ষায় পূর্ণ সমর্থন জানিয়েছে মিসর।
অন্যদিকে, সৌদি জ্বালানি অবকাঠামোতে হামলার পাশাপাশি লোহিত সাগরের গুরুত্বপূর্ণ সমুদ্রপথে নৌ-অবরোধের হুমকি দিয়েছে হুতি বিদ্রোহীরা। এমন পরিস্থিতিতে সৌদি আরবের জন্য নিজস্ব ভূখণ্ড ও সার্বভৌমত্ব রক্ষার পাশাপাশি বিমান চলাচল, অপরিশোধিত তেল রপ্তানি এবং বৈশ্বিক বাণিজ্যের স্বাভাবিক গতি বজায় রাখা কঠিন হয়ে পড়েছে।
বিশ্লেষকদের মতে, সৌদি আরবের ভৌগোলিক সীমানার অনেক দূর পর্যন্ত হামলা চালানোর সক্ষমতা প্রদর্শন করছে হুতি বিদ্রোহীরা। এতে দেশটির অর্থনীতি ও গুরুত্বপূর্ণ অবকাঠামোর নিরাপত্তা নিয়ে উদ্বেগ বাড়ছে। অন্যদিকে, যুক্তরাষ্ট্রসহ পশ্চিমা দেশগুলোর সামরিক উপস্থিতি ও সহায়তা সংঘাতকে আরও জটিল করে তুলতে পারে।
দীর্ঘদিনের কূটনৈতিক প্রচেষ্টা সত্ত্বেও ইয়েমেন সংঘাতের স্থায়ী সমাধান এখনো নিশ্চিত হয়নি। এর সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্র, ইসরায়েল ও ইরানের মধ্যে চলমান আঞ্চলিক উত্তেজনা পরিস্থিতিকে আরও জটিল করে তুলছে। ফলে সৌদি আরব ও হুতি বিদ্রোহীদের মধ্যকার সংঘাত বৃহত্তর আঞ্চলিক যুদ্ধে রূপ নিতে পারে বলে আশঙ্কা তৈরি হয়েছে।
স্বদেশ প্রতিদিন/এফএইচ