
পৃষ্ঠপোষকতার অভাবসহ নানা সংকটে স্থবির হয়ে পড়েছে পাবনার সাংস্কৃতিক চর্চা
পাবনায় সাংস্কৃতিক চর্চার বর্তমান পরিস্থিতি খুবই শোচনীয়। পাবনায় দিন দিন কমে যাচ্ছে সাংস্কৃতিক চর্চা। বিনোদনের ব্যবস্থার সংকট তীব্র আকার ধারণ করেছে। বিনোদনমূলক অনুষ্ঠান ও সাংস্কৃতিক চর্চা এখন আর আগের মতো নিয়মিত আয়োজন করা হচ্ছে না। পাবনা জেলা শিল্পকলা একাডেমি, বীর মুক্তিযোদ্ধা রফিকুল ইসলাম বকুল স্বাধীনতা চত্বর ও বনমালী শিল্পকলা কেন্দ্র কার্যকর থাকলেও তার সংখ্যা দিন দিন কমে যাচ্ছে।
পাবনার বিভিন্ন সাংস্কৃতিক ব্যক্তির সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, পাবনার জনপ্রিয় সাংস্কৃতিক সংগঠন পাবনা ড্রামা সার্কেল, গণমঞ্চ নাট্য সম্প্রদায়, পাবনা থিয়েটার ৭৭, দর্পণ নাট্যগোষ্ঠী, অনুশীলন আশি, গণশিল্পী সংস্থা, ইছামতি থিয়েটার, পাঠশালা সাংস্কৃতিক সংঘ, পথ সাহিত্য সংসদ, এটিউন ব্যান্ড, সমন্বিত যাত্রা ইউনিট, উচ্চারণ নিকেতন, সুচিত্রা সেন স্মৃতি সংরক্ষণ পরিষদ, জন্মভূমি বহুমুখী বাউল সংগঠন, সম্মিলিত বাউল, উদীচী শিল্পী গোষ্ঠী, অচিন মানুষ গানের দল, বাংলাদেশ কবিতা সংসদ, ঝংকার শিল্পী গোষ্ঠী, চিকনাই থিয়েটার চাটমোহর, সতীর্থ থিয়েটার ঈশ্বরদী, চলনবিল লালন একাডেমি ভাঙ্গুড়া, মায়ের দোয়া বাউল সংগঠন চাটমোহর, নৃত্যাঞ্চল, একতারা বাউল দল আটঘরিয়া, প্রয়াস, চাটমোহর সাংস্কৃতিক একাডেমি ও মধুমতী শিল্পী গোষ্ঠী আতাইকুলা উল্লেখযোগ্য। এসব সাংস্কৃতিক সংগঠন আর্থিক সংকটসহ নানা সমস্যায় জর্জরিত।
দেশের রাজনৈতিক অস্থিরতা, বর্তমান তরুণ প্রজন্মের ছেলে-মেয়েদের সাংস্কৃতিক অঙ্গনের প্রতি অনাগ্রহ, সাংস্কৃতিক সংগঠনগুলোর আর্থিক সংকট, পৃষ্ঠপোষকতার অভাব, বিনোদনমূলক অনুষ্ঠানের জন্য পর্যাপ্ত সুযোগ-সুবিধার অভাব এবং স্মার্টফোনের প্রতি আসক্তিকে এর জন্য বেশি দায়ী বলে মনে করেন পাবনার বিভিন্ন সাংস্কৃতিক সংগঠনের কর্মী ও নেতারা।
আবৃত্তিশিল্পী ও থিয়েটারকর্মী সামুন সাব্বির স্বদেশ প্রতিদিনকে বলেন, সারাদেশেই সাংস্কৃতিক চর্চায় ভাটা পড়েছে। এর বিভিন্ন কারণ রয়েছে। সামাজিক, রাজনৈতিকসহ নানা সংকটে এমন হয়েছে। পাবনাতেও একই অবস্থা। আবার সাংস্কৃতিক চর্চার কেন্দ্রবিন্দু বীর মুক্তিযোদ্ধা রফিকুল ইসলাম বকুল পৌর মিলনায়তনের মাঠের ভাড়া কয়েক বছর আগে পৌর কর্তৃপক্ষ অজানা কারণে বাড়িয়ে দেওয়ায় ছোট-বড় সংগঠনগুলো সহজে তাদের কার্যক্রম পরিচালনা করতে বাধাগ্রস্ত হচ্ছে। সবার দাবি, এই মাঠটি অন্তত সামাজিক ও সাংস্কৃতিক কর্মকাণ্ডের জন্য সহনীয় পর্যায়ে ভাড়া নির্ধারণ করা উচিত।
সম্মিলিত সাংস্কৃতিক জোটের সাধারণ সম্পাদক মীর ফজলুল করিম বাচ্চু স্বদেশ প্রতিদিনকে বলেন, আধুনিকতার নামে প্রযুক্তিগত যে ধারা চলছে, তাতে তরুণ প্রজন্ম আসক্ত হয়ে পড়ছে। এ কারণে নতুন করে আর সাংস্কৃতিক কর্মী তৈরি হচ্ছে না। যারা আছেন, তারাও পৃষ্ঠপোষকতার অভাবে কাজ করতে পারছেন না। এ ক্ষেত্রে আমাদের সাংস্কৃতিক আন্দোলন বেগবান করার পাশাপাশি সরকারি-বেসরকারিভাবে পর্যাপ্ত সহযোগিতা থাকতে হবে।
বিশিষ্ট নাট্যকার, নির্দেশক ও পাঠশালা সাংস্কৃতিক সংঘের সভাপতি স্বদেশ প্রতিদিনকে বলেন, মূল সমস্যা হলো, সমাজ প্রযুক্তিনির্ভর হয়ে গেছে। ফলে যারা সংস্কৃতির সঙ্গে জড়িত হওয়ার কথা, সেই বড় একটি প্রজন্ম মোবাইল ও প্রযুক্তিতে আসক্ত হয়ে পড়েছে। বলতে গেলে, পুরো প্রজন্ম সংস্কৃতিবিমুখ। ফলে নাটক, যাত্রা, নাচ, গান—যাই বলি না কেন, এসব ক্ষেত্রে নতুনদের সংখ্যা খুবই কম। পরবর্তী প্রজন্ম তৈরি না হওয়ায় এটি একটি বড় বাধা।
পাশাপাশি সংগঠন বা সাংস্কৃতিক কর্মকাণ্ড বেগবান করতে অর্থের প্রয়োজন, সেই সহযোগিতা এখন তলানিতে। যত সামান্য যা পাওয়া যায়, তা দিয়ে ঊর্ধ্বগতির বাজারে চলা মুশকিল। আবার সাংস্কৃতিক সচেতনতা তৈরিতে রাজনৈতিক প্রভাব রয়েছে। দেশের সামগ্রিক রাজনৈতিক পরিস্থিতি সাংস্কৃতিক সংগঠনগুলোর সঙ্গে সাংঘর্ষিক রূপরেখা তৈরি করেছে। একটি দেশের রাজনৈতিক পরিস্থিতির সঙ্গে দেশের অর্থনীতি তথা কৃষ্টি-সংস্কৃতি জড়িত। সেই পরিস্থিতি থেকে আমরা মুক্ত হতে পারলেই সংস্কৃতি বেগবান হবে, সঙ্গে সাংস্কৃতিক মঞ্চও তার সেই যৌবন ফিরে পাবে বলে মনে করি।
পাবনা সম্মিলিত সাংস্কৃতিক জোটের সভাপতি ফরিদুল ইসলাম খোকন স্বদেশ প্রতিদিনকে বলেন, একটি নাটক করতে দীর্ঘ সময় লাগে। সেই ধৈর্য ও সময় বর্তমান তরুণ প্রজন্মের নেই। এ ছাড়া নাটকের অর্থের জোগানদাতারাও আগের মতো নেই। রাজনৈতিক প্রতিকূল পরিবেশের কারণে মঞ্চনাটক বা নাটক মঞ্চায়ন এবং অন্যান্য সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান আয়োজন করাও প্রধান সমস্যা। সরকারের সংস্কৃতিবিষয়ক মন্ত্রণালয় যদি এ বিষয়ে পর্যাপ্ত অর্থের ব্যবস্থা করত, তাহলে হয়তো পাবনার সাংস্কৃতিক অঙ্গন কিছুটা আবার আগের অবস্থায় ফিরে আসত।
আবার সাংস্কৃতিক চর্চার কেন্দ্রবিন্দু বীর মুক্তিযোদ্ধা রফিকুল ইসলাম বকুল পৌর মিলনায়তনের মাঠের ভাড়া কয়েক বছর আগে পৌর কর্তৃপক্ষ অজানা কারণে বাড়িয়ে দেওয়ায় ছোট-বড় সংগঠনগুলো সহজে তাদের কার্যক্রম পরিচালনা করতে বাধাগ্রস্ত হচ্ছে। সবার দাবি, এই মাঠটি অন্তত সামাজিক ও সাংস্কৃতিক কর্মকাণ্ডের জন্য সহনীয় পর্যায়ে ভাড়া নির্ধারণ করা উচিত।
জেলা শিল্পকলা একাডেমি, পাবনার জেলা কালচারাল অফিসার মারুফা মঞ্জুরী খান সৌমী বলেন, পাবনা জেলায় সত্তরের দশক থেকে সাংস্কৃতিক চর্চার জোয়ার ছিল। তাতে এখন অনেকটাই ভাটা পড়েছে। তবে আমরা বিশ্বাস করি, আমাদের সংস্কৃতি স্বমহিমায় ফিরে আসবে।
জেলার স্বনামধন্য সাংস্কৃতিক সংগঠনগুলোর এখন নিয়মিত কোনো সাংস্কৃতিক চর্চা নেই।
পাবনায় জেলা শিল্পকলা একাডেমি মিলনায়তন ও বনমালী শিল্পকলা কেন্দ্র মিলনায়তন রয়েছে নাটক মঞ্চায়নসহ বিভিন্ন সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান আয়োজনের জন্য। জেলা শিল্পকলা একাডেমি মিলনায়তনের ভাড়া এখন নাট্যদল ও সাংস্কৃতিক সংগঠনের জন্য অনেক কমিয়ে আনা হয়েছে। মিলনায়তনের বিদ্যুৎ বিল ও রক্ষণাবেক্ষণ ব্যয় বাবদ যা প্রয়োজন হয়, সাংস্কৃতিক দলগুলোর জন্য মিলনায়তন ভাড়া তার চেয়েও অনেক কম নির্ধারণ করা হয়েছে। সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ আর্থিক ঘাটতি।
সরকারিভাবে সংস্কৃতিবিষয়ক মন্ত্রণালয় থেকে বার্ষিক একটি এককালীন অনুদান সক্রিয় সংগঠনগুলো পেয়ে থাকে। তবে বছরব্যাপী কার্যক্রম পরিচালনা বা কার্যালয় ভাড়া দেওয়ার ব্যয় আরও অনেক বেশি হয়ে থাকে। পূর্বে ব্যক্তিগত বা প্রাতিষ্ঠানিক পর্যায়ে প্রচুর পৃষ্ঠপোষকতা দেখা যেত। বর্তমানে এটি পাওয়া খুবই দুরূহ।
শিশু-কিশোর-তরুণদের প্রবল ডিভাইস আসক্তি ও কোচিংনির্ভর লেখাপড়ার প্রবণতাও একটি অন্যতম কারণ। নিয়মিত মহড়া করার জন্য আগ্রহী সদস্য এখন খুব কম পাওয়া যায়।
তিনি আরও বলেন, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলোতে প্রশিক্ষণ কর্মশালা পরিচালনা ও নিয়মিত সাংস্কৃতিক আয়োজন করা হলে শিশু-কিশোর-তরুণদের মধ্যে আগ্রহ বাড়ানো সম্ভব। থিয়েটার দল ও কর্মীদের সরকারি অনুদানের পাশাপাশি স্থানীয় শিল্পানুরাগী ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠানের পৃষ্ঠপোষকতা করা খুব জরুরি। পাবনা জেলায় একটি সাংস্কৃতিক কমপ্লেক্স অত্যন্ত জরুরি, যেখানে সংগঠনগুলো নামমাত্র ভাড়ায় কার্যালয় পরিচালনা করতে পারবেন ও সাংস্কৃতিক চর্চা করতে পারবেন।
স্বদেশ প্রতিদিন/এফএইচ