
যশোর সদর উপজেলার কাজীপুর মোবারককাটির বাসিন্দা সৈয়দ আকরাম হোসেনের স্ত্রী ফারহানা ইয়াসমিন। একজন গৃহিণী থেকে নিজের আগ্রহ, শ্রম ও অধ্যবসায়ের মাধ্যমে তিনি আজ একজন সফল নারী উদ্যোক্তা। তাঁর সবচেয়ে বড় পরিচয়—ছাদ কৃষির একজন নিবেদিতপ্রাণ উদ্যোক্তা।
বছরের পর বছর ধরে ছাদ কৃষির সঙ্গে যুক্ত থেকে তিনি গড়ে তুলেছেন একটি ব্যতিক্রমী ছাদবাগান। বর্তমানে তাঁর ছাদে রয়েছে ৭০০-এর বেশি বিভিন্ন প্রজাতির গাছ। শুধু সৌন্দর্যের জন্য নয়, পরিবারের পুষ্টির চাহিদা পূরণ এবং বাড়তি উৎপাদন বিক্রির লক্ষ্যেও তিনি এখানে সারা বছর বিভিন্ন ধরনের শাকসবজি চাষ করেন।
ফারহানা ইয়াসমিনের ছাদবাগানে রয়েছে ওল, হলুদ, আদা, পেঁয়াজ, রসুন, আলু, কচু, কচুর মুখি, কাঁচা মরিচ, বেগুনসহ নানা ধরনের সবজি। ছাদের মাচাজুড়ে শোভা পাচ্ছে লাউ ও কুমড়ার লতাপাতা। পাশাপাশি রয়েছে বিভিন্ন প্রজাতির শাক এবং বারোমাসি সজিনা।
শুধু সবজি নয়, এই ছাদবাগানে রয়েছে নানা ধরনের শোভাবর্ধক গাছ, বিভিন্ন প্রজাতির ফলের গাছ এবং কিছু বিলুপ্তপ্রায় বা দুর্লভ ফলের গাছও। এর মধ্যে রয়েছে মেওয়া ও মিষ্টি তেঁতুলের মতো ব্যতিক্রমী ফল। ছাদজুড়ে রয়েছে শতাধিক ফুলের গাছ, যা পুরো বাগানটিকে আরও নান্দনিক করে তুলেছে।
ফারহানা ইয়াসমিনের উদ্যোগ শুধু উদ্ভিদ চাষেই সীমাবদ্ধ নয়। ছাদের এক পাশে ছোট পরিসরে গড়ে তুলেছেন একটি মুরগির খামার। সেখানে দেশি মুরগি ও টাইগার মুরগি মিলিয়ে রয়েছে প্রায় ৫০টি মুরগি। বাড়ির নিচে ছোট একটি হাউজে তিনি শিং ও কৈ মাছও চাষ করছেন।
তাঁর এই উদ্যোগের অন্যতম বিশেষত্ব হলো—তিনি ছাদ কৃষিকে শুধু শখ হিসেবে দেখেননি; বরং এটিকে পরিবারের প্রয়োজন মেটানোর পাশাপাশি আয় ও উদ্যোক্তা হওয়ার একটি মাধ্যম হিসেবে গড়ে তুলেছেন। ছাদে উৎপাদিত বিভিন্ন সবজি পরিবারের চাহিদা মেটানোর পর অতিরিক্ত অংশ বাইরেও বিক্রি করেন তিনি।
ছাদ কৃষিতে তাঁর এই অবদানের স্বীকৃতিও মিলেছে বিভিন্ন সময়ে। ২০১৮ সালে ছাদ কৃষিতে জাতীয় পুরস্কার অর্জন করেন ফারহানা ইয়াসমিন। এরপর ২০২০ সালে তিনি জয়িতা পুরস্কার লাভ করেন। এ ছাড়া ছাদ কৃষি ও নারী উদ্যোক্তা হিসেবে তিনি বিভিন্ন সময়ে আরও অনেক পুরস্কার ও সম্মাননা পেয়েছেন।
তবে ফারহানা ইয়াসমিনের সাফল্যের গল্প শুধু তাঁর নিজের মধ্যেই সীমাবদ্ধ নয়। নিজের দুই মেয়েকেও তিনি ছোটবেলা থেকেই স্বাবলম্বী হওয়ার স্বপ্ন দেখিয়েছেন এবং উদ্যোক্তা হিসেবে গড়ে তুলেছেন।
তাঁর বড় মেয়ে ফারজানা ইয়াসমিন বৃষ্টি নিজেও একজন নারী উদ্যোক্তা। তিনি বৃষ্টি স্কিল ডেভেলপমেন্ট ল্যাব (ইঝউখ)-এর ঋড়ঁহফবৎ ঈযধরৎসধহ হিসেবে কাজ করছেন। দক্ষতা উন্নয়ন ও প্রশিক্ষণের মাধ্যমে মানুষের কর্মসংস্থানের সুযোগ তৈরিতে কাজ করছেন তিনি।
ছোট মেয়ে আফসানা ইয়াসমিনও একজন নারী উদ্যোক্তা হিসেবে নিজের পরিচয় তৈরি করেছেন।
ফারহানা ইয়াসমিনের পরিবার যেন একটি ছোট্ট উদ্যোক্তা পরিবার—যেখানে মায়ের ছাদ কৃষির স্বপ্ন থেকে দুই মেয়ের উদ্যোক্তা হয়ে ওঠার পথ তৈরি হয়েছে।
তাঁর ছাদবাগান এখন শুধু একটি পরিবারের সবজির চাহিদা পূরণের জায়গা নয়; এটি পরিবেশবান্ধব জীবনযাপন, নিরাপদ খাদ্য উৎপাদন, পারিবারিক পুষ্টি এবং নারী উদ্যোক্তা তৈরির একটি অনুপ্রেরণার গল্প। সীমিত জায়গাকেও কাজে লাগিয়ে কীভাবে একটি পরিবার নিজেদের খাদ্যচাহিদা পূরণের পাশাপাশি আয় করতে পারে, ফারহানা ইয়াসমিনের ছাদ কৃষি তারই একটি বাস্তব উদাহরণ।
স্বদেশ প্রতিদিন/এফএইচ