
চাঁপাইনবাবগঞ্জ জেলাজুড়ে রাসায়নিক সারের তীব্র সংকট দেখা দিয়েছে বলে অভিযোগ উঠেছে। আসন্ন রবি শস্য চাষে সার নিয়ে হাজার হাজার কৃষকের মধ্যে হতাশা ও উদ্বেগ দেখা দিয়েছে। বিশেষ করে ডিএপি সার নিয়ে হতাশায় ভুগছেন কৃষকেরা। সারের জন্য ডিলার পয়েন্টগুলোতে ঘটছে একের পর এক অপ্রীতিকর ঘটনা।
কৃষকদের অভিযোগ, সার ডিলারদের যোগসাজশে সিন্ডিকেটের মাধ্যমে রাসায়নিক সারের কৃত্রিম সংকট তৈরি করা হচ্ছে। খুচরা বাজারে বেশি দামে সার বিক্রি করা হচ্ছে। সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ বলছে, কৃষকদের আগাম সার মজুত রাখার প্রবণতা থেকে এ সমস্যার সৃষ্টি হয়েছে। সার সংকট নেই এবং কোনো সিন্ডিকেটও নেই।
চাঁপাইনবাবগঞ্জ জেলার পাঁচটি উপজেলায় খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, সব উপজেলাতেই রাসায়নিক সারের ব্যাপক সংকট দেখা দিয়েছে।
সম্প্রতি চাঁপাইনবাবগঞ্জের সদর, নাচোল, গোমস্তাপুর, ভোলাহাট ও শিবগঞ্জ উপজেলায় রাসায়নিক সারের জন্য কৃষকদের বিক্ষোভ ও মারামারির মতো অপ্রীতিকর ঘটনা ঘটছে। গোমস্তাপুরে সার না পেয়ে উপজেলা চত্বরে বিক্ষোভ এবং ভোলাহাটে লাইনে দাঁড়ানো নিয়ে হাতাহাতির ঘটনা ঘটেছে বলে জানা গেছে। সদর উপজেলার দেবীনগর বোর্ডপাড়া এলাকায় ডিলার পয়েন্টে দীর্ঘ সময় অপেক্ষার পরও পর্যাপ্ত সার না পাওয়ায় ক্ষুব্ধ কৃষকদের সঙ্গে দায়িত্বপ্রাপ্ত উপসহকারী কৃষি কর্মকর্তার বাগ্বিতণ্ডা ও ধস্তাধস্তির ঘটনা ঘটে।
শিবগঞ্জ উপজেলার বিভিন্ন ইউনিয়ন ঘুরে কৃষকদের সঙ্গে কথা বলে সার নিয়ে এক ভয়াবহ চিত্র পাওয়া গেছে। রোববার (১১ অক্টোবর) মনাকষা বাজারে সার ডিলার আকবর আলীর ভাই নজরুল ইসলামের সারের গোডাউনের সামনে সহস্রাধিক কৃষক সারের জন্য অপেক্ষা করছেন।
তারাপুর এলাকা থেকে আসা শামীম জানান, “আমি গতকাল রাত থেকে রোববার দুপুর পর্যন্ত অপেক্ষা করে এ পর্যন্ত সার পাইনি। এ মৌসুমে আমি ২০ বিঘা জমি চাষ করছি। এতে ডিএপি সার লাগবে কমপক্ষে চার বস্তা। এখন পর্যন্ত এক বস্তাও পাইনি।”
পারচৌকা গ্রামের কৃষক মো. তাহসান বলেন, “আমি অসুস্থ মানুষ হয়েও গতরাত দুইটা থেকে অপেক্ষা করছি। ভিড়ে আমার আইডি কার্ডটিও জমা দিতে পারিনি। চার বিঘা সরিষা ও দুই বিঘা ভুট্টা চাষ করছি। ডিএপি সার লাগবে কমপক্ষে দুই বস্তা।”
সাহাপাড়ার কৃষক আব্দুস সালাম জানান, “তিন ভাগের এক ভাগ ডিএপি সার গোপনে বেশি দামে ডিলার ও কৃষি কর্মকর্তারা যোগসাজশ করে বাইরে বিক্রি করে দিচ্ছেন। আর আমরা হয়রানির শিকার হচ্ছি।”
একই গ্রামের কৃষক সাজেমান বলেন, “আমি অনেক চেষ্টা করেও সরকারি গোডাউন থেকে সার না পেয়ে বাইরের দোকান থেকে ১ হাজার ৮০০ টাকা দিয়ে এক বস্তা ডিএপি সার কিনেছি।”
কয়েকটি গোপন সূত্রে জানা গেছে, ডিএপি সারের সরকারি দর হলো ১ হাজার ৫০ টাকা। কিন্তু গোডাউনের ম্যানেজার ও ডিলাররা গোপনে ১ হাজার ২০০ টাকা বস্তা দরে বিক্রি করে দিচ্ছেন। বাইরের দোকানদাররা ডিএপি সার বস্তাপ্রতি ১ হাজার ৭০০ থেকে ১ হাজার ৮০০ টাকা দরে বিক্রি করছেন।
শিবগঞ্জ উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা মো. নয়ন মিয়া বলেন, “কোনো সার সংকট নেই। কোনো সিন্ডিকেট নেই। সার নিয়ে কোনো দুর্নীতিও হচ্ছে না। সার সংকটের গুজবের কারণে কৃষকেরা আগাম সার মজুত রাখতে বিশৃঙ্খলা ঘটাচ্ছেন। আমরা বিশৃঙ্খলা এড়াতে পুলিশ, আনসার ও গ্রাম পুলিশ মোতায়েন করেছি। শিবগঞ্জে ২৩ জন ডিলার রয়েছেন। তাঁদের ম্যানেজারের মাধ্যমে সঠিকভাবে সার বিতরণ করা হচ্ছে।”
তিনি আরও জানান, রবি শস্য মৌসুমে ডিএপি ৭৬০ মেট্রিক টন, এমওপি ৩০০ মেট্রিক টন, টিএসপি ২২৫ মেট্রিক টন ও ইউরিয়া ৫০০ মেট্রিক টন বরাদ্দ দেওয়া হয়েছে। কোনো সার সংকট হবে না।
তিনি আরও জানান, ম্যানেজার বা অন্য কেউ কোনো ধরনের সিন্ডিকেট তৈরি করতে পারবেন না। কারণ, গোডাউন থেকে সারের বস্তা দেওয়ার সময় গণনা করে দেওয়া হয়। ডিলারদের গোডাউনে পৌঁছানোর পর আবারও বস্তা গণনা করা হয়। বিতরণের সময় প্রতিটি গোডাউনে এক বা দুজন করে উপসহকারী কৃষি কর্মকর্তার উপস্থিতিতে আবারও গণনা করে বিতরণ শুরু করা হয়।
স্বদেশ প্রতিদিন/এফএইচ